আপনি ওই মঠে গেছেন?
অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত ছিলাম, যাই কি করে! মঠ বলতে নদী থেকে আমরা শুধু দেখতে পেয়েছি পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে পাথর কাটা গহ্বর, আলখেল্লা পরা সন্ন্যাসীরা সারি সারি গুহার মুখে বসে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে আমাদের আত্মহত্যা করার প্রচেষ্টা লক্ষ করছিলেন। আমাদের কেউ কেউ শুভেচ্ছা জানিয়ে হাতও নাড়েন, কিন্তু পাল্টা সাড়া না পেয়ে অভিমান করেন।
কিন্তু নদীর যে ভয়ঙ্কর ছবি দিচ্ছেন, ওই স্পটে আমরা পৌঁছব কীভাবে?
এরই মধ্যে হতাশ? হাসলো নিকোলাস। দাঁড়ান, আগে ওখানকার মশককুলের সঙ্গে পরিচিত হোন। ওরা আপনাকে তুলে নেবে, উড়িয়ে নিয়ে যাবে নিজেদের আস্তানায়, তারপর সমস্ত রক্ত শুষে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলবে।
ধ্যেত, সিরিয়াস হোন। সত্যি, ওখানে যাবে কীভাবে?
সন্ন্যাসীদের খাবার যোগান দেয় গ্রামবাসীরা, ওরা বাস করে গিরিখাদের উপর হাইল্যান্ডে। পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে বুনো ছাগলের তৈরি ট্রাক আছে। ওদের কাছ থেকে জেনেছি, গিরিখাদের কিনারা থেকে ওই ট্র্যাক ধরে ওখানে নামতে তিন দিন লাগে।
পথ চিনে আপনি নামতে পারবেন?
না, তবে এ বিষয়ে মাথায় কয়েকটা আইডিয়া আছে, পরে আলোচনা করা যাবে। তার আগে প্রথম প্রশ্ন, চার হাজার বছর পর ওখানে পৌঁছে ঠিক কী পাবার আশা করব আমরা। নিকোলাসের চোখে প্রত্যাশা। এবার আপনার পালা। কনভিন্স মি। রূপোয় মাথা মোড়া পয়েন্টারটা রোয়েনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লো ও, ভাঁজ করা হাত বাঁধল বুকে।
প্রথমে আপনাকে বইটার কাছে ফিরে আসতে হবে, পয়েন্টার রেখে দিয়ে রিভার গড তুলে নিল রোয়েন। গল্পের ট্যানাস চরিত্রটির কথা আপনার মনে আছে?
রানী লসট্রিসের অধীনে মিশরীয় আর্মির কমান্ডার ছিলেন, টাইটেল ছিল মিশরের সাহসী সিংহ। হিকসস তাড়া করায় লসট্রিস বাহিনীকে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে মিশর থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।
ট্যানাস সেই সঙ্গে রানীর গোপন প্রেমিকও ছিলেন। এবং, আপনি যদি টাইটার বক্তব্য বিশ্বাস করেন, রানীর বড় ছেলে প্রিন্স মেমননের পিতাও বটে।
আরকুন নামে এক ইথিওপিয়ান রাজাকে শায়েস্তা করতে গিয়ে দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় মারা যান ট্যানাস, মমি করা তার লাশ রানীর কাছে ফিরিয়ে আনে টাইটা, গল্পের আরো খানিক অংশ স্মরণ করলো নিকোলাস।
এ থেকে আরেকটা সূত্রে চলে আসা যায়, ডুরেঈদ আর আমি বহু কষ্টে উদ্ধার করেছি।
সপ্তম স্ক্রোল থেকে? বুক থেকে হাত নামিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকলো নিকোলাস।
না কোনো স্ক্রোল থেকে নয়, রানী লসট্রিসের সমাধিতে পাওয়া দেয়াল লিপি থেকে। ব্যাগ থেকে একটা ফটোগ্রাফ বের করলো রোয়েন।
এটা সমাধিকক্ষে পাওয়া দেয়ালচিত্রের আংশিক ছবি, এনলার্জ করা। দেয়ালের ওই অংশ পরে ভেঙে পড়ে, হারিয়ে যায় চিরকালের জন্য। জারগুলো তখনই পাই আমরা। ডুরেঈদ ও আমার বিশ্বাস, টাইটা এ লিপি সম্মানজনক জায়গায় রেখেছিল এবং এটার বিশেষ তাৎপর্য আছে। সম্মানজনক জায়গা বলছি এ জন্য যে, স্ক্রোল যেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল তার ঠিক উপরেই ছিল এ লিপি।
ছবিটা নিয়ে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা করলো নিকোলাস।
হায়ারোগ্লিফিক নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে নিকোলাস, রোয়েন বলে যাচ্ছে, বইটা থেকে আপনি জেনেছেন, হেঁয়ালি করতে ভালোবাসত টাইটা, শব্দ নিয়ে কৌতুক করতে বা খেলতে পছন্দ করত। বহু জায়গায় নিজের বুদ্ধির তারিফ করেছে সে। বলেছে, সেই শ্রেষ্ঠ বাও খেলোয়াড়।
চোখ থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস সরিয়ে নিকোলাস বলল, হ্যাঁ। বাও সম্ভবত দাবারই প্রাচীন সংস্করণ। মিশর ও আফ্রিকার দক্ষিণ থেকে পাওয়া কিছু বোর্ডও আমার মিউজিয়ামে আছে।
বাও খেলা হয় রঙিন পাথর দিয়ে, প্রতিটি পাথরের আলাদা পদমর্যাদা। সে যাই হোক, আমরা জানি ধাঁধা তৈরি করার নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে উত্তর-পুরুষকে জানাবার একটা ঝোঁক ছিল টাইটার মধ্যে। নিজেকে বুদ্ধিমান বলে দাবি করার ভঙ্গিটায় কিন্তু গর্বের ভাব নেই, বরং যেনো সতর্ক করে দেওয়ার চেষ্টা। তার প্রমাণ, ফারাও-এর সমাধিতে ইচ্ছে করেই অনেক সূত্র রেখে গেছে সে। শুধু স্ক্রোলে নয়, মিউরালেও। টাইটা আমাদের বলছে, সে তার প্রিয় রানীর সমাধিতে দেয়ালচিত্রগুলো নিজের হাতে এঁকেছে বা রঙ চড়িয়েছে।
এটা ওই সূত্রগুলোর একটা বলে আপনার ধারণা? ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ফটোটার উপর টোকা দিল নিকোলাস।
পড়ন না, বলল রোয়েন। আমি তো বলি ক্ল্যাসিকাল হায়ারোগ্লিফিকস–তার দুর্বোধ্য কোডের তুলনায় কঠিন নয়।
থেমে থেমে অনুবাদ করছে নিকোলাস, রাজপুত্রের জনক, যিনি কিনা জনক নন–নীল দাতা, যে নীল তাকে খুন করেছে–হাপির সঙ্গে হাতে হাত ধরে অনন্ত কাল পাহারা দিচ্ছেন পাথুরে শেষ ইচ্ছাপত্র, যে ইচ্ছাপত্রে আভাস দেওয়া হয়েছে রাজপুত্রের জনককে কোথায় রাখা হয়েছে, যিনি কিনা জনক নন, রক্ত এবং ছাই দাতা। মাথা নাড়লো নিকোলাস, না, কোনো অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। আমি বোধহয় অনুবাদে ভুল করছি।
হতাশ হবেন না। এ তো সবে টাইটার সংস্পর্শে এলেন। এটা নিয়ে আমরা কয়েক সপ্তা মাথা ঘামিয়েছি। ধাঁধাটা ধরতে হলে রিভার গডে ফিরে যেতে হবে। মানে ট্যানাস প্রিন্স মেমননের জনক নন, তবে রানীর প্রেমিক হিসেবে তার বায়োলজিক্যাল ফাদার। মৃত্যুশয্যায় তিনি মেমননকে নীল তলোয়ার উপহার দিয়েছিলেন, এ নীল তলোয়ারের আঘাতেই তিনি গুরুতর জখম হন, আরকাউনকে শায়েস্তা করতে গিয়ে, আরকাউনের দ্বারাই। বইটায় যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা আছে।
