টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো নিকোলাস, কাগজের অনেকগুলো বান্ডিল পড়ে রয়েছে উপরে, সেগুলোর ভেতর থেকে একটা ফটোগ্রাফ তুলে নিল। ব্রিটিশ আর্মড ফোর্সের এক্সপিডিশনের সময় এ ছবিটা তুলি আমি। খাদের ভেতর জলপ্রপাতগুলো কী রকম, সে সম্পর্কে একটা ধারণা করতে পারবেন।
সাদা-কালো ছবি, দু পাশে আকাশে ছোঁয়া পাহাড়-প্রাচীর দেখা যাচ্ছে, নিচে অর্ধনগ্ন ক্ষুদে কিছু মূর্তি ও বোট, তাদের উপর আকাশ থেকে নেমে আসছে বিপুল জলরাশি। রোমহর্ষক একটা দৃশ্য। আমার কোনো আইডিয়া ছিল না! এরকম দেখতে! হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলো রোয়েন।
জায়গাটা কি রকম দুর্গম আর নির্জন, ছবি দেখে আপনি ধারণা করতে পারবেন না, বলল নিকোলাস। একজন ফটোগ্রাফারের দৃষ্টিতে, ওখানে দাঁড়াবার এমন একটা জায়গা নেই যেখান থেকে খাদ বা জলপ্রপাতের সমস্ত বৈশিষ্ট্য ক্যামেরায় বন্দি করা যায়। তবে এটুকু অন্তত বুঝতে পারবেন যে উজানের দিকে পায়ে হেঁটে আসা মিশরীয় একদল অভিযাত্রীকে কীভাবে থামিয়ে দেবে ওই জলপ্রপাত। সাধারণত জলপ্রপাতের পাশে কোনো না কোনো ধরনের পথ তৈরি হয়, হাতি বা অন্য কোনো বন্য প্রাণী আসা-যাওয়া করায়। তবে, এ ধরনের জলপ্রপাতকে পাশ কাটানোর মতো কোনো পথ বা উপায় থাকে না।
মাথা ঝাঁকাল রোয়েন। আমরা তাহলে একমত হলাম একটা জলপ্রপাতই আরো সামনে এগুতে বাধা দেয় ওদেরকে পশ্চিম দিক থেকে যেতে দ্বিতীয় জলপ্রপাতটা।
স্যাটেলাইট ফটোয় নদীর কোর্স পয়েন্টার দিয়ে অনুসরণ করলো নিকোলাস, সেন্ট্রাল সুদানের গাঢ় গোঁজ আকৃতির রোজিরেস ড্রাম থেকে। সীমান্তের ইথিওপিয়ান দিকটায় বন্ধুর উতরাই বা ঢল আরো উঁচু হয়েছে, মূল গিরিখাদ শুরু হয়েছে ওখান থেকেই। ওদিকে কোনো রাস্তা বা শহর নেই, বহুদূর উজানের দিকে শুধু দুটো ব্রিজ আছে। পাঁচশো মাইলের মধ্যে কিছুই নেই, আছে নীল নদের খরস্রোত প্রবাহ আর ভয়ালদর্শন কালো ব্যাসল্ট শিলা। খাদের গভীরে প্রধান জলপ্রপাতগুলো স্যাটেলাইট ফটোয় চিহ্নিত করে রেখেছি আমি। পয়েন্টার তুলে সেগুলো দেখালো নিকোলাস, লাল মার্কার পেন দিয়ে তৈরি বৃত্তের ভেতর প্রতিটি।
রোয়েন গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে ও দেখছে।
এখানে দ্বিতীয় জলপ্রপাত, সুদানিজ বর্ডার থেকে একশো বিশ মাইল উজানে। তবে আমাদেরকে আরো অনেক ফ্যাক্টর বিবেচনায় রাখতে হবে। যেমন, টাইটা ওদিকে গেছে আজ থেকে চার হাজার বছর আগে, ইতোমধ্যে নদী তার কোর্স বদলে থাকতে পারে।
কিন্তু ক্যানিয়নটা চার হাজার ফুট গভীর, ওটার ভেতর থেকে নদী পালাবে কী করে? রোয়েনের প্রশ্নের মধ্যে প্রতিবাদের সুর।
নীল নদ যতই বেয়াড়া হোক।
ঠিক, কিন্তু নদীর তলা যে বদলেছে এটা নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া যায়। বন্যার মরশুমে প্রবাহের বিপুলতা ও শক্তি ব্যাখ্যা করা যায়, এমন ভাষার উপর আমার দখল নেই। সাইড ওয়ালের বিশ মিটার পর্যন্ত ফুলে ওঠে নদী, ছোটে ঘণ্টায় দশ নট গতিতে।
নদীর ওই ভরা মাসে আপনি দাঁড় টেনেছেন? রোয়েনের গলায় সন্দেহ।
আরে না, বন্যার মরশুমে না। ওই সময় কিছুই ওখানে টিকবে না।
ছবিটার দিকে এক মিনিট চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো ওরা, সমস্ত আক্রোশ নিয়ে ফুলে-ফেঁপে থাকা বিপুল জলরাশির আস্ফালন কল্পনা করতে গিয়ে আতঙ্ক অনুভব করছে।
তারপর নিকোলাসকে মনে করিয়ে দিল রোয়েন দ্বিতীয় জলপ্রপাত।
সেটা এখানে, উপনদীগুলোর একটা যেখানে অ্যাবের মূল প্রবাহে এসে মিলিত হয়েছে। ওটার নাম ডানডেরা নদী, বারোশো ফুট অলটিচ্যুড পর্যন্ত উঠে এসেছে, চোক রেঞ্জের সানসাই পাহাড় চূড়ার নিচে, গিরিখাদের একশো মাইল উত্তরে।
আপনার মনে আছে, ঠিক কোনো স্পটে ওটা অ্যাবের প্রবাহে মিলিত হয়েছে?
সে অনেক বছর আগে কথা। তাছাড়া, ওই খাদের তলায় প্রায় এক মাস ছিলাম তো, অসংখ্য দুঃস্বপ্নের মধ্যে নির্দিষ্ট একটাকে স্মরণ করা মুশকিল। মাইলের পর মাইল একঘেয়ে পাহাড়-প্রাচীর আর দেয়ালের বন-জঙ্গল স্মৃতিগুলোকে ঝাপসা করে দিয়েছে। প্রচণ্ড গরম আর পোকা-মাকড়ের অত্যাচারে আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। বিরতিহীন বৈঠা চালাবার কথা মনে আছে, আর কানে এখনো লেগে আছে পানির অন্তহীন গর্জন। তবে অ্যাবে আর ডানডেরার মিলিত হওয়ার জায়গাটা দুটো কারণে মনে আছে আমার।
ইয়েস? ব্যগ্র ভঙ্গিতে সামনের দিকে ঝুঁকলো রোয়েন, কিন্তু নিকোলাস মাথা নাড়লো।
ওখানে আমরা একজনকে হারাই। দ্বিতীয় অভিযানের একমাত্র বলি। রশি ছিঁড়ে যায়, একশো ফুট নিচে পড়ে যায় বেচারা। পাথরের একটা স্তূপের উপর পিঠে দিয়ে পড়ে।
দুঃখিত। আর কী কারণ?
ওখানে কপটিক খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের একটা মঠ আছে, পাথরের অবয়বে তৈরি, নদীর সারফেস থেকে চারশো ফুট উপরে।
গিরিখাদের ওই গভীরে? অবিশ্বাসে ভুরু কোঁচকাল রোয়েন। ওখানে তারা মঠ বানাতে গেল কেন?
ইথিওপিয়া সবচেয়ে পুরানো খ্রিস্টান দেশগুলোর মধ্যে একটা। দেশটায় নয় হাজারেরও বেশি চার্চ আর মঠ আছে। দুর্গম পাহাড়ে, পৌঁছনো যায় না এমন মাঠের সংখ্যা অনেক। ডানডেরা নদীর উপর এ মঠটা সেন্ট ফুমেনটিয়াস-এর সমাধি ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত। তৃতীয় শতাব্দী তিনি ইথিওপিয়ায় খ্রিশ্চানিটির পত্তন করেছিলেন, বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্টেনটিনোপোলের কাছ থেকে। কথিত আছে, লোহিত সাগরের তীরে এসে তার জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেলে আকসুম পৌঁছেন তিনি, ওখানেই ইজানা সাম্রাজ্য পাল্টে দেন।
