হাসপাতালে একবার ফোন করা দরকার।
মুখ তুললাম নিকোলাস। করা হয়েছে। দু বার। জর্জিনা ভালো আছেন। তাকে জানিয়েছি, এ সন্ধ্যায় ওকে দেখতে যাবেন আপনি।
সন্ধ্যা, এতো দেরি কেনো?
তার আগে পর্যন্ত আপনাকে আমি ব্যস্ত রাখতে চাই। আপনার কথায় এতোগুলো টাকা আর সময় খরচ করব, জানতে হবে না কিসের পেছনে ছুটছি? একটু থেমে কাজের কথা শুরু করলো নিকোলাস। মরুভূমিতে আপনাদের ভিলায় প্রথম হামলাটা হলো। আততায়ীরা জানত কী চায় তারা, জানত কোথায় খুঁজতে হবে। বেশ। এবার দ্বিতীয় হামলার প্রসঙ্গে আসি। কায়রোয় আপনার গাড়ির ভেতর হ্যান্ড গ্রেনেড ছোঁড়া হলো। সেদিন বিকেলে আপনি মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছেন, এ খবর কে জানত? মন্ত্রী ভদ্রলোক ছাড়া?
মুখভর্তি খাবার নিয়ে কিছু সময় ভাবলো রোয়েন।
ঠিক মনে নেই। সম্ভবত ডুরেঈদের সেক্রেটারিকে বলেছিলাম, আর হয়তো বলেছিলাম রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টদের একজনকে।
ভুরু কুঁচকে মাথা নাড়লো নিকোলাস। তারমানে তো মিউজিয়ামের অর্ধেক স্টাফই আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা জানত। ঠিক আছে, এবার বলুন কে জানত আপনি মিশর ত্যাগ করছেন? কাকে বলেছেন ইংল্যান্ডে এসে আপনি আপনার মায়ের কটেজে উঠবেন?
অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একজন ক্লার্ক আমার স্লাইডগুলো এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়।
তাকে আপনি জানিয়েছিলেন কোন ফ্লাইট ধরবেন?
কেন জানাব।
কাউকেই জানান নি?
না… হ্যাঁ, ইন্টারভিউয়ের সময় শুধু মিনিস্টারকে বলেছিলাম, ছুটি চাওয়ার সময়। কিন্তু তিনি… না, অসম্ভব! প্রতিবাদ করলেও রোয়েনের চেহারায় আতঙ্ক ফুটে উঠলো।
কাঁধ ঝাঁকালো নিকোলাস। দুনিয়াটা বড় বিচিত্র জায়গা, রোয়েন। আপনি আর ডুরেঈদ সপ্তম স্ক্রোলের উপর কাজ করছিলেন, এ বিষয়ে মিনিস্টার সবই জানতেন, তাই না?
বিশদ জানতেন না, তবে জানতেন আমরা কী নিয়ে ব্যস্ত।
ঠিক আছে, পরবর্তী প্রশ্ন–চা, না কফি? রোয়েনের কাপে কফি ঢাললো নিকোলাস, তারপর আবার শুরু করলো, আপনি বলেছেন সম্ভাব্য স্পনসরদের একটা তালিকা ছিল। সন্দেহভাজনদের সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য ওটা কাজে লাগতে পারে।
গেটি মিউজিয়াম, বলল রোয়েন, শুনে হাসলো নিকোলাস।
তালিকা থেকে বাদ দিন ওটা। কায়রোর রাস্তায় গ্রেনেড ফাটিয়ে বেড়ানো ওদের কাজ নয়। তালিকায় আর কে ছিল?
হের ফন শিলার।
হ্যামবুর্গ। হেভী ইন্ডাস্ট্রি। মেটাল ও অ্যালয় রিফাইনারি। বেস মিনারেল প্রোডাকশন। মাথা ঝাঁকালো নিকোলাস। তালিকার তৃতীয় লোকটা কে?
পিটার ওয়ালশ, বলল রোয়েন। টেক্সান।
আরেক বিলিওনেয়ার। ফোর্ট ওয়ার্থে বাস করেন। গোটা আমেরিকার জুড়ে ফাস্ট ফুডের ব্যবসায়, কারখানায় দশ হাজার লোক খাটে। মেইল অর্ডার রিটেইল। কালেক্টর হিসেবে রাক্ষস বলা হয় তাঁকে। আর্কিওলজিক্যাল এক্সপ্লোরেশনে অঢেল টাকা খাটান। যারা আর্টিফ্যাক্ট কালেক্টর তাদের উপর বিশেষ নজর রাখতে হয়। নিকোলাসকে। সব মিলিয়ে সংখ্যায় দুই ডজনের বেশি হবে না তারা। বিভিন্ন নিলাম অনুষ্ঠানে ঘুরে-ফিরে দেখা-সাক্ষাৎও হয়। দু জনেই এঁরা চোখ বোজা ডাকাত। পছন্দ হয়ে গেলে এঁরা তাঁদের সন্তানকেও খেয়ে ফেলতে পারেন। এঁদের পথে আপনি যদি বাধা হন, কী করবেন এঁরা? বইটা ছাপা হওয়ার পর দু জনের। কেউ ডুরেঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কিনা জানেন?
জানি না, করতেও পারেন।
ধরে নিতে হবে ডুরেঈদ কী করছিলেন ওঁরা তা জানতেন। সন্দেহের তালিকায় দু জনই থাকছেন। এবার চলুন, মিউজিয়ামে যাই। দেখা যাক, মিসেস স্ট্রিট কী ব্যবস্থা করেছেন।
নিকোলাসের স্টাডিতে ঢুকে বিস্ময়ের একটা ধাক্কা খেলো রোয়েন। সন্দেহ নেই এতো সব আয়োজন করতে হওয়ায় রাতে নিকোলাস ঘুমায় নি। কামরাটাকে মিলিটারি টাইপ হেডকোয়ার্টার বানিয়ে ফেলেছে ও। কামরার মাঝখানে বড় একটা ইজেল ও ব্ল্যাকবোর্ড দাঁড়িয়ে আছে, গায়ে একটার উপর একটা পিন দিয়ে আটকানো স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফ। কাছাকাছি এসে সেগুলো দেখলো রোয়েন, তারপর অন্যান্য জিনিসের দিকে তাকালো।
প্রথমেই দৃষ্টি কেড়ে নিল একটা লার্জ-স্কেল ম্যাপ, স্যাটেলাইট ফটোগুলোর মতো দক্ষিণ-পশ্চিম ইথিওপিয়ার একই এরিয়া কাভার করেছে। ম্যাপের পাশেই নাম-ঠিকানা, ইকুইপমেন্ট আর রসদের তালিকা–বোঝা গেল, এগুলো নিকোলাস ওর আগের আফ্রিকান অভিযানে ব্যবহার করেছে। দূরত্বের মাপজোক ও হিসাবসহ একটা শিটও দেখলো রোয়েন। অপর একটা শিটে ধারণা দেওয়া হয়েছে সম্ভাব্য খরচের, ওটাকে বাজেট শিট বলা যেতে পারে। ব্ল্যাকবোর্ডের মাথার দিকে লেখা হয়েছে–ইথিওপিয়া জেনারেল ইনফরমেশন। নিচে গায়ে গায়ে সাঁটানো টাইপ করা পাঁচটা ফুলসক্যাপ শিট। পুরো শিডিউল পড়লো না। রোয়েন, তবে নিকোলাসের প্রস্তুতির বহর দেখে মুগ্ধ হলো।
হাতে স্টিক নিয়ে বোর্ডের পাশে দাঁড়ালো নিকোলাস, ইঙ্গিতে সামনের একটা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল রোয়েনকে। ক্লাসে শৃঙ্খলা থাকতে হবে। বোর্ডে পয়েন্টারের বাড়ি মারল। আপনার প্রথম কাজ আমাকে বিশ্বাস করানো কয়েক হাজার বছর আগে মুছে যাওয়া টাইটার পায়ের ছাপ আবার আমরা অনুসরণ করতে পারব। আসুন সবচেয়ে আগে অ্যাবে গিরিখাদের জিয়োগ্রাফিকাল দিকগুলো বিবেচনা করি।
পয়েন্টার দিকে স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফে নদী কোর্স ব্যাখ্যা করলো নিকোলাস। এই সেকশন ধরে নদীটা এগিয়েছে কালো আগ্নেয় শিলায় তৈরি মালভূমি ডুবিয়ে দিয়ে। পানি থেকে ওঠা পাহাড়-প্রাচীর কোথাও কোথাও একদম খাড়া, দুদিকে চারশো থেকে পাঁচশো ফুট উঁচু। আরো কঠিন সিস্ট শিলার স্তর যেখানে, প্রবাহে সেখানে সুবিধে করতে পারে নি। কাজেই নদীর চলার পথে বিশাল আকারে বেশ কিছু ধাপ তৈরি হয়েছে। টাইটার ধাপ যে আসলে জলপ্রপাত, আপনাদের এ ধারণা সম্ভবত সত্যি।
