পাশে বসে মায়ের কাঁধ দুটো একহাতে জড়িয়ে ধরল রোয়েন। মাকে আগে কখনো কাঁদতে দেখে নি ও। আদরের হাত বুলিয়ে জননীকে সান্ত্বনা দিতে চাইছে, কিন্তু জর্জিনার বিলাপধ্বনি থামছে না।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে বলতে পারবে না রোয়েন। তবে এক সময় বাঁকা হয়ে থাকা মায়ের অবশ পা দেখে আঁতকে উঠলো, সেই সঙ্গে ভাবল কাজটা শেষ করার জন্য ট্রাক ড্রাইভার আবার ফিরে আসতে পারে। ক্রল করে ঢালের মাথায়, সেখান থেকে রাস্তার মাঝখানে চলে এলো রোয়েন, ব্রিজে উঠে আসা প্রথম গাড়িটাকে থামাবে।
*
এগারোটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট, দু ঘণ্টা পর বেলা একটার দিকে উদ্বিগ্ন নিকোলাস ইয়র্ক পুলিশকে ফোন করলো। ভাগ্য ভালো যে ল্যান্ড রোভারের লাইসেন্স প্লেটটা গত রোববারে লক্ষ্য করেছিল। পুলিশ স্টেশনের মহিলা কনস্টেবল কমপিউটর চেক করে জানালো, দুঃখিত, স্যার। ল্যান্ড রোভারটা আজ সকালে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। ড্রাইভার ও প্যাসেঞ্জার ইয়র্ক হসপিটালে…
হাসপাতালে পৌঁছতে চল্লিশ মিনিট লাগলো। রোয়েনকে পাওয়া গেল মেয়েদের সার্জিকাল ওয়ার্ডে, মায়ের বেডের পাশে বসে আছে। অ্যানেসথেটিকের প্রভাব এখনো কাটে নি, জর্জিনা সচেতন নন। নিকোলাসকে দেখে মুখ তুলে তাকালো রোয়েন। আপনি সুস্থ তো? কী ঘটল?
মা… মায়ের পা ভেঙে গেছে। সার্জেনকে বাধ্য হয়ে উরুতে একটা পিন আটকাতে হয়েছে।
আপনি কেমন আছেন?
এখানে সেখানে কেটে-ছিড়ে গেছে। সিরিয়াস কিছু না।
কীভাবে ঘটল?
একটা ট্রাক… ঠেলে রাস্তা থেকে ফেলে দিল আমাদেরকে। পুরো ঘটনাটা বর্ণনা করলো রোয়েন।
পরিষ্কার মেরে ফেলার চেষ্টা, বলল নিকোলাস। বিচলিত হওয়া ওর স্বভাব নয়, চেহারায় কাঠিন্য ফুটে উঠলো পুলিশকে জানিয়েছেন?
আরো সকালে পুলিশকে রিপোর্ট করা হয়েছিল ট্রাকটা চুরি গেছে–ঘটনাটা ঘটার অনেক আগে। লিটেল শেফ কাফের সামনে থেমেছিল ড্রাইভার, তখন। লোকটা জার্মান, ইংরেজি জানে না।
এবার নিয়ে ওরা তিনবার আপনাকে খুন করার চেষ্টা করলো, বলল নিকোলাস। কাজেই আপনার নিরাপত্তার দিকটা এখন আমাকে দেখতে হবে।
হাসপাতালের ওয়েটিং রুপে এসে কাউন্টির চীফ কনস্টেবলকে ফোন করলো নিকোলাস। হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গেও ওর পরিচয় আছে।
ওয়ার্ডে ফিরে এসে দেখলো জর্জিনার জ্ঞান ফিরেছে। এখনো একটু আচ্ছন্ন বোধ করছেন তিনি, তবে কোনো রকম কষ্ট পাচ্ছেন না। নিকোলাস যেমন আয়োজন করেছে, চাকা লাগানো বেডে শুইয়ে জর্জিনাকে প্রাইভেট ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হলো। কয়েক মিনিট পর অর্থোপেডিক সার্জেন ঢুকলেন কেবিনে।
হ্যালো, নিকোলাস, এখানে তুমি কী করছ? সার্জেন বললেন। রোয়েন অবাক হয়ে ভাবছে, কত মানুষই না চেনে ওকে। জর্জিনার দিকে ফিরলেন সার্জেন, বললেন, কেমন লাগছে এখন? কিছু না, সত্যি ভাঙেনি–শুধু ফেটে গেছে। আবার আমরা জোড়া লাগিয়ে দিয়েছি, তবে আমাদের সঙ্গে অন্তত দশ দিন থাকতে হবে আপনাকে।
আপনার আপত্তি আমি গ্রাহ্য করছি না, জর্জিনা ঘুমিয়ে পড়ার পর রোয়েনকে নিকোলাস নিজের গাড়িতে তুলে নিয়েছে, হল-এ আমার হাউজ কিপার একটা কামরা রেডি রেখেছে আপনার জন্য। পরেরবার কে, কখন আপনাকে ধরে মেরে ফেলবে, ঠিক আছে?
তর্ক করার মতো অবস্থায় নেই তখন রোয়েন। ক্লান্ত ভঙ্গিতে রেঞ্জ রোভারে উঠে বসে সে। প্রথমে তার হাতের সেলাই কেটে, কুয়েনটন পার্কের উদ্দেশ্যে চললো নিকোলাস। পৌঁছানোর সাথে সাথে রোয়েনকে বেডরুমে পাঠিয়ে দিল সে।
কুক আপনার ডিনার পাঠিয়ে দেবে। ডাক্তারের দেওয়া ঘুমের ওষুধটা খেয়ে নিয়েন। মায়ের কটেজের চাবিটা দিলে মিসেস স্ট্রিট আপনার কাপড়-চোপড় নিয়ে আসতে পারতো। এর মধ্যে, টুথব্রাশ আর নাইটগাউন যোগাড় করে রেখেছে। হাউজকিপার। আগামি সকালের আগে আর কোনো কথা নয়।
অনেক দিন পর নিজেকে নিরাপদ লাগলো রোয়েনের। ঘুমের ওষুধটা টয়লেটে ফ্লাশ করে ফেলে দিল সে।
বালিশের উপর যে নাইটড্রেসটা রাখা, লম্বা একটা লেস দেওয়া সিল্কের পোশাক ওটা। সম্ভবত, ওগুলো নিকোলাসের স্ত্রীর ছিল, চিন্তাটা ওর মনে মিশ্র একটা অনুভূতি এনে দিল।
অপরিচিত আরামদায়ক পরিবেশে কিছু সময়ের মধ্যেই ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেল রোয়েন।
*
সকাল হতে, একজন পরিচারিকা এসে দি টাইমস পত্রিকা আর এক কাপ আর্ল গ্রে টি দিয়ে গেল রোয়েনকে। কিছু সময় পর ওর হোল্ডঅলটা নিয়ে ফিরে এলো সে।
ডাইনিং রুমে আটটা ত্রিশের দিকে স্যার নিকোলাস আপনার সঙ্গে নাস্তা সারবেন। জানিয়ে গেল মেইড।
বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের নিচে দাঁড়ালো রোয়েন, সুযোগ পেয়ে ছয় ফুট লম্বা আয়নায় নিজের নগ্ন শরীরটা পরীক্ষা করে নিল। বাহুর ক্ষতটা এখনো ভেজা ভেজা, পুরোপুরি শুকায় নি, ঊরু আর পাঁজরের এক পাশে গাঢ় দাগ ফুটে আছে, কার অ্যাক্সিডেন্টের অবদান। হাঁটুর নিচেও এক ইঞ্চি লম্বা একটা সরু দাগ, চামড়া উঠে গেছে। কাপড়-চোপড় পাল্টে ডাইনিং রুমে আসার পথে খেয়াল করলো, একটু খোঁড়াচ্ছে।
ডাইনিং রুমের দোরগোড়ায় এসে রোয়েন দেখলো নিকোলাস পত্রিকা পড়ছে। হাতছানি দিয়ে ওকে ডেকে টেবিলের নাস্তার দিকে ইঙ্গিত করলো সে। চেয়ারে বসে, ডিম পোঁচে চামচের ঘা দিয়ে শুরু করলো রোয়েন।
ভালো ঘুম হলো? উত্তরের অপেক্ষা না করে বলে চলে নিকোলাস, পুলিশকে ফোন করেছিলাম। ওরা এমএএন ট্রাকটা খুঁজে পেয়েছে, হারোগেটের কাছে। পরিত্যক্ত ওটা। যদিও তদন্ত চলছে, তবে পুলিশ খুব একটা আশাবাদী নয়। ঘাগু লোকের পাল্লায় পড়েছি আমরা।
