ট্রাক ড্রাইভার এতো কাছে থেকে ইলেকট্রিক হর্ন বাজাল, কানে তালা লেগে গেল রোয়েনের। পেছনের সিটে লাফালাফি আর চিৎকার শুরু করলো ম্যাজিক।
স্টুপিড বাস্টার্ড! তিক্ত গলায় গাল দিলেন জর্জিনা। উলুকটা ভেবেছে কি? রোয়েন, ওর নাম্বার প্লেট লিখে রাখো। ইয়র্ক পুলিশকে রিপোর্ট করব আমি।
প্লেটে কাদা, পরিষ্কার পড়া যাচ্ছে না, তবে মনে হচ্ছে কন্টিনেন্টাল : রেজিস্ট্রেশন। সম্ভবত জার্মান।
যেন জর্জিনার প্রতিবাদ শুনতে পেয়েই ট্রাকের গতি সামান্য কমাল ড্রাইভার, ধীরে ধীরে দুই গাড়ির মাঝখানের দূরত্ব বিশ গজে দাঁড়ালো। ঘাড় ফিরিয়ে এখনো পেছন দিকে তাকিয়ে আছে রোয়েন।
হুঁ-হুঁ, হুন ব্যাটা ভদ্রতা শিখছে, সন্তুষ্টচিত্তে বললেন জর্জিনা। কুয়াশার ভেতর দিয়ে সামনে তাকালেন তিনি। ওই দেখা যায় ব্রিজ…
এই প্রথম ট্রাকের দেখতে পাচ্ছে রোয়েন। ড্রাইভার এমন একটা হেলমেট পরে আছে, চোখ আর নাকের ফুটো ছাড়া মুখের সবটুকুই নীল উলে ঢাকা। হেলমেটটা তার চেহারায় অশুভ আর শয়তানি একটা ভাব এনে দিয়েছে। সাবধান! সর্বনাশ! অকস্মাৎ চিৎকার শুরু করলো রোয়েন। ট্রাক সোজা আমাদের উপর উঠে আসছে! ইঞ্জিনের আওয়াজ বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে দাঁড়ালো, ওদেরকে যেনো ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সাগরের গর্জন গ্রাস করে ফেলেছে। চকচকে ইস্পাত ছাড়া এক মুহূর্ত কিছুই দেখতে পেল না রোয়েন। তারপরই ট্রাকেই সামনের অংশ ল্যান্ড রোভারের পেছনটা চুরমার করে দিল।
ধাক্কা খেয়ে সিটের পিঠে রোয়েনের অর্ধেক শরীর উঠে এলো। কোনো রকমে তাল সামলে সোজা হলো ও, দেখলো ট্রাকটা ওদেরকে শিয়ালের চোয়ালে আটকানো পাখির মতো তুলে নিয়েছে। চকচকে ক্রোম রেডিয়েটর স্টীল বুল বার দিয়ে সুরক্ষিত, বারগুলো প্রায় তুলে নিয়েছে ল্যান্ড রোভারকে, ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। সামনে।
হুইলের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছেন জর্জিনা, নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন।পারছি না! ব্রিজ… সরে যেতে চেষ্টা করো…
সেফটি বেল্টের কুইক রিলিজ বাকলে টান দিয়ে ডোর হ্যাঁন্ডেলের দিকে হাত বাড়াল রোয়েন। ব্রিজের পাথুরে পাঁচিল তীর বেগে ছুটে আসছে ওদের দিকে। রাস্তার উপর আড়াআড়ি হয়ে যাচ্ছে ল্যান্ড রোভার, পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
রোয়েনের হাতের ধাক্কায় কিছুটা খুলে গেল দরজা, কিন্তু পুরোটা খুলল না, কারণ ব্রিজ শুরু হওয়ার আগে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের দু সারি স্তম্ভের মাঝখানে পৌঁছে গেছে ল্যান্ড রোভার।
গাড়ি চ্যাপ্টা হতে শুরু করায় মা ও মেয়ে একযোগে চিৎকার দিচ্ছে, ধাক্কা খেয়ে দু জনেই ছিটকে পড়লো সামনের দিকে। পাথুরের স্তম্ভে বাড়ি খেয়ে চুরমার হয়ে গেল উইন্ডস্ক্রীন, ল্যান্ড রোভারের বডি এমব্যাঙ্কমেন্ট ধরে নেমে যাবার সময় ডিগবাজি খেতে শুরু করলো।
একটা গড়ান দিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ছিটকে বাইরে পড়লো রোয়েন। ঢালের মধ্যে পড়ায় শরীরটা স্থির থাকলো না, তা থাকলে হাড়গোড় সব গুঁড়ো হয়ে যেত। পড়ার পর গড়াতে শুরু করলো, কিনারা থেকে খসে পড়লো ব্রিজের নিচে ঠাণ্ডা হিম স্রোতের মধ্যে।
পানির নিচে মাথাটা ডুবে যাবার আগে উপরে আকাশ আর ব্রিজ দেখতে পেল রোয়েন। গর্জন তুলে বিদায় নেয়ার আগে ট্রাকটাকেও দেখতে পেল। একজোড়া বিশাল কার্গো ট্রেলার টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওটা। ট্রেলার দুটোর লম্বা বডিওঅর্ক ব্রিজের গার্ড রেলকে ছাড়িয়ে উঁচু হয়ে আছে।
দুটো ট্রেলারই গাঢ় সবুজ নাইলন তারপুলিন দিয়ে মোড়া। কাছাকাছি ট্রেলারের এক পাশে কোম্পানির লাল ট্রেডমার্ক দেখতে পেল রোয়েন, কিন্তু নামটা পড়ার সময় পাওয়া গেল না, তবে আগেই পানির নিচে তলিয়ে গেলও।
আবার যখন পানির উপর মাথা তুললাম, দেখলো ভাটির দিকে খানিকটা সরে এসেছে। তীরে উঠে এসে কাদার মধ্যে শুয়ে কাশছে রোয়েন। কাশির সঙ্গে প্রচুর পানি বেরিয়ে এলো, হালকা লাগলো শরীরটা। কোথায় আঘাত লেগেছে পরীক্ষা করছে, এ সময় উল্টে পড়া ল্যান্ড রোভারের দিক থেকে জর্জিনার যন্ত্রণাকাতর চিৎকার ভেসে এলো।
কাদা, তারপর ঘাসের উপর দিয়ে ছুটল রোয়েন। এমবেঙ্কমেন্টের গোড়ায় চিৎ হয়ে রয়েছে ল্যান্ড রোভার। বডিটা শুধু তোবড়ায় নি, ভেঙে বা ছিঁড়ে গেছে কয়েক জায়গায়। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে, তবে ফ্রন্ট হুইল এখনো ঘুরছে। মামি! মামি, তুমি কোথায়? ফুঁপিয়ে উঠলো রোয়েন। আহত পশুর মতো জর্জিনার গোঙানি থামছে না। তোবড়ানো বডি ধরে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করছে রোয়েন, গোঙানির উৎসেব দিকে এগুচ্ছে, জানে না কী দেখতে হবে।
জর্জিনা ভিজে মাটিতে বসে আছেন, ল্যান্ড রোভারের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে। পা দুটো সরাসরি সামনের দিকে সোজা করা। তবে তার বাম পা হাঁটুর কাছাকাছি মোচড় খেয়ে আছে, ফলে জুতো পরা গোড়ালি বাঁকা হয়ে কাদার দিকটা নির্দেশ করছে। সন্দেহ নেই ওই পা-টা হাঁটু বা হাঁটুর খুব কাছাকাছি ভেঙে গেছে।
গোঙানোর বা বিলাপ করার সেটা কারণ নয়। জর্জিনা বসে আছেন ম্যাজিককে কোলে নিয়ে। শোকে আকুল ভঙ্গিতে কুকুরটার উপর ঝুঁকে রয়েছেন তিনি, লাশের গায়ে হাত বুলাচ্ছেন আর দোল খাচ্ছেন, বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে আহাজারি। কুকুরটার বুক ইস্পাত আর মাটির মাঝখানে পড়ে গুঁড়িয়ে গেছে। মুখের কোণ থেকে বেরিয়ে এসেছে জিভের ডগা, গোলাপি ওই ডগা থেকে এখনো ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছে। নিজের স্কার্ফ দিয়ে তা মুছে ফেলছেন জর্জিনা।
