অ্যাবে গিরিখাদে জলপ্রপাতের কোনো অভাব নেই, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল নিকোলাস।
এ অংশটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। টাইটা বলছে, খাদের ভেতর দিয়ে বিশ দিন এগোবার পর তারা দ্বিতীয় ধাপ-এর সামনে পড়লো। এখানেই প্রিন্স মেমনন তার মৃত বাবার মেসেজ পায়, স্বপ্নের ভেতর–মামোস তার ছেলেকে জানান, এ জায়গাতেই তাকে সমাহিত করা হোক। টাইটা বলছে, এরপর তারা আর এগোয় নি। আমরা যদি নিশ্চিতভাবে জানতে পারি কিসে তারা বাধা পেয়েছিল, তাহলে খাদের কতটা ভেতরে তারা ঢুকতে পেরেছিল তার একটা নিখুঁত হিসেবে বেরিয়ে আসবে।
ম্যাপ আর পাহাড়ের স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফ দরকার, বলল নিকোলাস। আরো দরকার আমার এক্সপিডিশন নোট ও ডায়েরি। রেফারেন্স লাইব্রেরি আপ-টু-ডেট করে রাখে ও, স্যাটেলাইট ফটো পেতে অসুবিধে হবে না।
আমার দাদার বাপ, তিনিও ইথিওপিয়ায় শিকার করতে গিয়েছিলেন গত শতকে ১৮৯০-এর দিকে ডেবরা মারকোস-এ নীল নদ পেরিয়েছিলেন তিনি। হয়তো তার নোটও আমাদের কাজে লাগবে। চেয়ার ছেড়ে আড়মোড়া ভাঙলো নিকোলাস।
কার পার্কে রাখা পুরোনো সবুজ ল্যান্ড রোভার পর্যন্ত রোয়েনের সাথে হেঁটে গেল। গাড়িতে চড়ে ইঞ্জিন চালু করলো রোয়েন, জানালো দিয়ে নিক বলল, আমার মনে হয়, আপনি এখানে, হলে থাকলে ভালো করতেন। এখান থেকে ব্রান্ডসবারী পর্যন্ত কম করে হলে তিনঘণ্টা লাগে যেতে আসতে। আফ্রিকা যাওয়ার আগে প্রচুর কাজ আমাদের।
আপনার সঙ্গে এখানে থাকছি, লোকে কী বলবে?
লোকে কী ভাবলো না ভাবলো–ওটা কোনোদিনও পাত্তা দিই নি আমি, বলল নিক। কাল কখন দেখা হচ্ছে?
ইয়র্কে একজন ডাক্তার দেখাতে হবে আমাকে। হাতের সেলাই কাটার সময় হয়ে এসেছে। এগারোটার আগে আসতে পারবো বলে মনে হয় না। জানালা দিয়ে হাত নেড়ে, গাড়ি ছেড়ে দিল রোয়েন।
বাতাসে এলোমেলো অবাধ্য চুল ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখের উপর। গাঢ় চুলের নারী বরাবরই নিকোলাসকে আকৃষ্ট করে। ওর স্ত্রী, রোসেলিনেরও ওই পুবদেশীয় ধাঁচ ছিল চেহারায়। তুলনা চলে আসায় মনে মনে অপরাধী বোধ হতে লাগলো নিকোলাসের। কিন্তু রোয়েনকে ভুলে থাকা বেশ কঠিন।
রোসেলিনের মৃত্যুর পর এ. প্রথম কোনো নারী ওকে নাড়া দিতে পেরেছে। মেয়েটার মিশ্র রক্ত ওর মনে দোলা দিয়েছে। কিছুটা রক্ষণশীল, আবার একই সঙ্গে আধুনিকাও, চমৎকার রসবোধসম্পন্না নারী রোয়েন। এমন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেছে, যা নিকোলাসের কাছে আরাধ্য। সাধারণত পুবের মেয়েরা এমন হয় না, নিজেদের নিয়ে অল্পতেই সন্তুষ্ট হয় তারা। কিন্তু এ ললনা ভিন্ন ধাতের, বুঝতে বাকি নেই নিকোলাসের।
২. ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট
ফোনে আগেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে, পরিচিত ডাক্তারের কাছে রোয়েনকে নিয়ে যাচ্ছেন জর্জিনা, ওর হাতের সেলাই কাটতে হবে। ব্রেকফাস্ট সেরেই নিজেদের কটেজ থেকে বেরিয়ে পড়লো মা ও মেয়ে, সঙ্গে কুকুরটাও রয়েছে।
গ্রামের রাস্তায় বাঁক ঘোরার সময় রোয়েন বিরাট একটা ট্রাক দেখতে পেল, পোস্ট অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তবে ওটাকে নিয়ে আর কিছু ভাবল না। গ্রাম ছেড়ে ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে আসার পর কুয়াশা দেখতে পেল ওরা, কোথাও কোথাও বেশ গাঢ়, ত্রিশ গজের বেশি দৃষ্টি চলে। জর্জিনা জোরে গাড়ি চালাতে অভ্যস্ত, কুয়াশা থাকলেও গ্রাহ্য করছেন না। ল্যান্ড রোভার ফুল স্পীডে ছুটছে। তবে পুরানো হওয়ায় গাড়িটা সম্ভবত ঘণ্টায় ষাট মাইলের বেশি ছুটতে পারে না, আন্দাজ করলো রোয়েন।
পেছনের রাস্তা চেক করার জন্য ঘাড় ফেরাল ও দেখতে পেল সেই ট্রাকটা ওদের পেছনে রয়েছে। নিচের দিকে কুয়াশা জমে থাকায় ট্রাকের শুধু ক্যাব দেখা যাচ্ছে। রোয়েন তাকিয়ে রয়েছে, হঠাৎ পুরো ট্রাকটাই কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেল। ঘাড় সোজা করে মায়ের সাথে কথা বললো রোয়েন।
তুমি কী সত্যি একটা লেবার গভর্নমেন্ট চাও? মাথা নাড়লো ও।
আমি চাই থেচার ফিরে আসুক।
সীটে একটু সরে বসে পেছনের জানালো দিয়ে আবার তাকালো রোয়েন। ট্রাকটা এখনো ওদের পেছনে কুয়াশার মধ্যে ভেসে রয়েছে। আগের চেয়ে অনেক কাছাকাছি চলে আসায় এখন ল্যান্ড রোভারের নীলচে ধোয়াও খেতে হচ্ছে ড্রাইভারকে। হঠাৎ সেটার গতি আরো বাড়লো। মামি, ট্রাকটা বোধহয় তোমাকে পাশ কাটাতে চাইছে, মৃদু গলায় বলল ও।
ওদের রিয়্যার বাম্পার থেকে ট্রাকের প্রকাণ্ড বনেট মাত্র বিশ ফুট দূরে। ট্রাকের রেডিয়েটর ক্রোম লোগগা দিয়ে সাজানো, ক্যাপিটাল লেটারে পাশাপাশি তিনটে শব্দ–এমএএন। লোগোটা ল্যান্ড রোভারের ক্যাব-এর চেয়ে বেশি লম্বা, কাজেই রোয়েন যেখানে বসে আছে সেখান থেকে ড্রাইভারের চেহারা দেখা যাচ্ছে না।
সবাই আমাকে পাশ কাটাতে চায়, অভিযোগ করলেন জর্জিনা। সংক্ষেপে এটাই আমার জীবনকাহিনী। জেদের বশে সরু রাস্তার মাঝখানটা দখল করে রাখলেন তিনি।
আবার পেছন দিকে তাকালো রোয়েন। একটু একটু করে আরো কাছে চলে আসছে ট্রাক। পেছনের জানালো পুরোপুরি ঢেকে দিল ওটা। ক্লাচ ছেড়ে দিয়ে দৈত্যাকৃতি ইঞ্জিনের আবর্তন বাড়াল ড্রাইভার, ভীতিকর গর্জন শোনা গেল। পথ ছাড়লে ভালো করবে, মাকে বলল রোয়েন। লোকটা মনে হচ্ছে রেগে গেছে।
অপেক্ষা করুক, ঠোঁটের এক কোণ থেকে কথা বলছেন জর্জিনা, আরেক কোণে সিগারেট ঝুলছে। ধৈর্য একটা সদগুণ। তাছাড়া, এখানে ওকে পথ ছাড়া সম্ভব নয়। সামনে সরু একটা পাথুরে ব্রিজ আছে। এদিকের রাস্তা-ঘাট খুব ভালো চিনি আমি।
