হ্যাঁ, এ অংশটুকু আমার মনে আছে। মেমনন আর টাইটা বন্দি শিলুক ক্রীতদাসদের সঙ্গে আলোচনা করে, তাদের পরামর্শেই নদীর বাম বাহু ধরে এগোয়–এ বাহুটাকেই আমরা নীল নদ বলে জানি।
মাথা ঝাঁকিয়ে আবার শুরু করলো রোয়েন, পুবদিকে চলে এলো ওরা এবং বাধা পেল ভীতিকর পাহাড়ে, এতো উঁচু যে নীল দুর্গ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত বইতে যা পড়েছেন স্ক্রোলের সঙ্গে মেলে, কিন্তু এখানে এসে, খোলা বইয়ের পাতায় টোকা দিল, ডুরেঈদের হেঁয়ালিপনা শুরু হলো। তিনি যে ফুটহিল বা পর্বতশ্রেণীর পাদদেশে দাঁড়ানো পাহাড়ের বর্ণনা দিয়েছেন…।
বাধা দিল নিকোলাস, পড়ার সময়ই ভেবেছি, বর্ণনায় ভুল আছে। ইথিওপিয়ান হাইল্যান্ডের যে জায়গা থেকে নীল নদ বেরিয়েছে সেখানে কোনো ফুটহিল বা ফুটহিলস নেই। অসংখ্য পর্বতের একটা স্তূপ হিসেবে কল্পনা করতে হবে জায়গাটাকে, শুধু পশ্চিমে খাড়া ও বন্ধুর উতরাই বা ঢাল আছে। বর্ণনাটা যে-ই দিক, নীল নদের কোর্স তার জানা নেই।
যেন মনে হচ্ছে আপনি জানেন? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন, শুনে হেসে উঠলো নিকোলাস।
কম বয়সে বোকার মতো সাহস করে মানুষ, আমিও এক আধবার করেছিলাম, বলল নিকোলাস। সবাইকে চমকে দেওয়ার জন্য লেক টানা থেকে ভাটির দিকে সুদানের রোজিরেস ড্যাম পর্যন্ত বোট নিয়ে গিয়েছিলাম অ্যাবে গিরিখাদের তলা দিয়ে। অ্যাবে হলো নীল নদের ইথিওপিয়ান নাম।
কিন্তু কেন আপনি…
আগে কেউ যেতে পারে নি, তাই। মেজর চেসম্যান, ব্রিটিশ কনসাল, ১৯৩২ সালে চেষ্টা করতে গিয়ে প্রায় মারাই পড়েছিলেন। ভেবেছিলাম অভিযানটা সফল হলে একটা বই লিখব, তা থেকে এতো বেশি রয়্যালটি পাব যে সারাজীবন আর কাজ করতে হবে না, মনের ফুর্তিতে দুনিয়াটা চষে বেড়াব। অ্যাবে নদীর পুরোটা কোর্স আমি স্টাডি করেছি, শুধু ম্যাপ দেখে নয়। একটা সেসনা ১৮০ ভাড়া করি, খাদের উপর দিয়ে উড়ে যাই, লেক টানা থেকে ড্যাম পর্যন্ত ৫০০ মাইল। আমার তখন ২১ বছর বয়স, সাংঘাতিক ডানপিটে।
কী ঘটেছিল? রোয়েন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। ডুরেঈদ এ সম্পর্কে কিছু বলে যায় নি, তবে রোয়েন জানে ঠিক এ ধরনের একটা অ্যাডভেঞ্চারেই ওদেরকে বেরুতে হবে।
স্যান্ডহার্সট কলেজ পড়ি তখন। ক্রিসমাসের ছুটিতে এ কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই, বলল নিকোলাস। সব মিলিয়ে আটজন ছিলাম আমরা। গিরিখাদের নিচের পানিকে এক কথায় হিংস্র বলব। মাত্র দু দিন টিকেছিলাম। দুনিয়ার বুকে নরকতুল্য যে কয়টা জায়গা আছে, ওই গিরিখাদ তার মধ্যে একটা। অ্যারিজোনার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গভীর ও এবড়োখেবড়ো ওটা। পাঁচশো মাইলের মধ্যে বিশ মাইল পেরুতে না পেরুতেই ভেঙে চুরমার করে দেয় আমাদের সব কয়টা কাইয়্যাক। সমস্ত ইকুইপমেন্ট ছেড়ে আসতে বাধ্য হই আমরা, সভ্য জগতে আবার ফেরার জন্য খাদের দেয়াল বেয়ে উপরে উঠতে হয়েছিল।
চেহারা ম্লান হয়ে গেল, বিষণ্ণ সুরে বলল আবার, দুই বন্ধুকে হারাই আমরা। ববি পামার নদীতে ডুবে যায়, টিম মার্শাল পাহাড় থেকে পড়ে যায়। এমন কি আমরা ওদের লাশও খুঁজে পাই নি।
নীল নদের ওই খাদে আর কেউ নেভিগেট করতে পেরেছে? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন, দুঃখজনক স্মৃতি থেকে নিকোলাসের মনটা ফেরাতে চাইছে।
হ্যাঁ। আরো কয়েক বছর পর ফিরে যাই আমি। দ্বিতীয়বার লীডার হিসেবে নয়, অফিশিয়াল ব্রিটিশ আর্মড ফোর্সেস এক্সপিডিশন-এর জুনিয়র মেম্বার হিসেবে। নদীটাকে বশ মানাতে আর্মি, নেভী আর এয়ারফোর্সের সাহায্য নিতে হয়েছিল।
রোয়েনের এ মুহূর্তের অনুভূতি সশ্রদ্ধ বিস্ময়। নিকোলাস আক্ষরিক অর্থেই অ্যাবেতে নৌকো বেয়েছে। এ যেনো নিয়তিই ওর কাছে টেনে এনেছে নিকোলাসকে। ডুরেঈদ ঠিক কথাই বলে গেছেন। এ কাজের জন্য সব দিক থেকে উপযুক্ত লোক নিকোলাস ছাড়া আর বোধহয় নেই কেউ। তাহলে গিরিখাদটার স্বভাব-চরিত্র ভালোই জানেন আপনি। ভেরি গুড। এবার আপনাকে আমি সপ্তম স্ক্রোলে টাইটা যা বলে গেছে সে সম্পর্কে একটা ধারণা দেব। দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, স্ক্রোলের এ অংশের কিছুটা নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে ফাঁকগুলো পূরণ করতে হয়েছে। অনুমানের উপর নির্ভর করে। আপনাকে বলতে হবে, আপনার জানার সঙ্গে বর্ণনাটুকু মেলে কিনা।
দেখা যাক।
বন্ধুর উতরাই বা ঢাল সম্পর্কে আপনি যে বর্ণনা দিচ্ছেন, টাইটার বর্ণনার সঙ্গে সেটা মেলে–খাড়া একটা পাঁচিল, ওই পাঁচিল থেকেই বেরিয়ে এসেছে নদীটা। ওরা ওদের চ্যারিয়ট ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, ক্যানিয়নের খাড়া ও এবড়োথেবড়ো এলাকায় ওগুলো চলছিল না। ভারবাহী ঘোড়া নিয়ে হাঁটা শুরু করে ওরা। কিছুক্ষণের মধ্যে খাদটা এতো গভীর আর বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কয়েকটা ঘোড়া নিচে পড়ে যায়। ওই সময় প্রাচীন একটা পথ অনুসরণ করছিল ওরা, পাহাড়ী ছাগলের আসা-যাওয়ায় তৈরি। ঘোড়াগুলো নদীতে পড়ে গেলেও, প্রিন্স মেমননের নির্দেশে সামনে এগুতে থাকে ওরা।
জায়গাটা আমি কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছি। সত্যি ভীতিকর।
এরপর টাইটা কয়েকটা বাধার কথা লিখেছে, তার ভাষায় সেগুলো ধাপ।
আমি ও ডুরেঈদ সিদ্ধান্তে আসতে পারি নি ওগুলো আসলে কী। তবে সবচেয়ে
গ্রহণযোগ্য অনুমান, ওগুলো আসলে জলপ্রপাত।
