আমার বাবা গামাল আবদেল নাসেরের বাহিনীতে ছিলেন, বিড়বিড় করে রোয়েন। রাজা ফারুকের পুতুল সরকার ভেঙে নাসেরই মিশরে ব্রিটিশ শাসনের যবনিকা টেনে দেন। সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করেন।
ওহ হো! নিকোলাস মুচকি হাসে। দুই মেরুর লোক তবে আমরা। তবে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। আশা করি, আমি আর আপনি শত্রু নই আর!
মোটেও না, ডুরেঈদ আপনার সম্পর্কে বেশ ভালো বলতো।
আমি তাঁকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি। আবারো প্রসঙ্গ পাল্টায় নিক। রাজকীয় উশব তি, বা ছোট্ট পুতুল-এর সংগ্রহ নিয়ে আমরা বেশ গর্বিত। প্রাচীন সাম্রাজ্যের প্রত্যেক ফারাও-এর সমাধি থেকে শুরু করে টলেমি পর্যন্ত সবার আছে। চলুন আপনাকে দেখাই।
একটা দেয়াল জুড়ে সাজনো ডিসপ্লে কেস। শেলফের পর শেলফ জুড়ে শুধু পুতুল, সম্রাটের মৃত্যুর পর তার সমাধির মধ্যে একজন দাস বা ভৃত্য হিসেবে রাখা হতো ওগুলো।
চাবি দিয়ে একটা কেস খুলে সবচেয়ে সুন্দর পুতুলটা বের করে নিকোলোস। এটা হলো মায়া-র উশ তি, তুতেনখামেন, আয়ে এবং হোরেমহেব-এর শাসনামলে ভৃত্য ছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ১৩৪৩ সালে নিহত, আয়ে-এর সমাধি থেকে: সংগৃহীত।
পুতুলটা হাতে নিয়ে ওটার গায়ে অঙ্কিত হায়ারোগ্লিফিক পড়ে রোয়েন অনায়াসে। আমি মায়া-, দুই রাজ্যের কোষাধ্যক্ষ। পবিত্র ফারাও, আয়ে-এর হয়ে আমি জবাবদিহি করব। তিনি চিরজীবী হোন! ইচ্ছে করেই আরবিতে বলল রোয়েন। একটু পরীক্ষা করে দেখতে চায়। সাথে সাথেই সারলীল আরবিতে উত্তর দেয় নিকোলাস।
পার্সিভালো ডিক্সন দেখছি খাঁটি কথা বলেছেন। নির্ঘাত অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী আপনি।
পালা করে আরবি এবং ইংরেজিতে কথা বলে চললো ওরা। নিজেদের পছন্দমতো বিষয় পেয়ে আড়ষ্টতা কাটলো অনেকটা। প্রতিটি কেসের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ করে দেখলো।
যেনো প্রাচীনকালে ফিরে গেছে দু জন। এমন প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের সামনে বর্তমান সময় যেনো কোনো গুরুত্ব বহন করে না। ঘণ্টা, মিনিট কেটে যেতে থাকে। মিসেস স্ট্রিট এসে চমকে দিলেন ওদের। আমি চলে যাচ্ছি, স্যার নিকোলাস। আপনি তাহলে লক্ করে এলার্ম চালু করে দিয়েন। সিকিউরিটি গার্ডেরা ডিউটিতে চলে এসেছে।
কয়টা বাজে? বলে, নিজের কবজির রোলেক্সের দিকে তাকায় নিকোলাস। পাঁচটা চল্লিশ! আজব ব্যাপার! দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলে, আপনি যান, মিসেস স্ট্রিট। এতো সময় দেরি করিয়ে দেওয়ার জন্য দুঃখিত।
এলার্ম সেট করতে ভুলে যেয়েন না আবার, সতর্ক করে দিয়ে বলেন স্ট্রিট।
একদিনের জন্য অনেক আদেশ দিয়ে ফেলেছেন আমাকে। এখন যান তো! হেসে বলে নিকোলাস। এবারে রোয়েনের দিকে ফিরে বলে, ডুরেঈদের স্মৃতিবিজড়িত একটা জিনিস না দেখিয়ে আপনাকে ছাড়ছি না। সময় আছে তো?
রোয়েন মাথা নাড়ে। ওর হাত ধরতে এক হাত এগিয়েও কি মনে করে যেনো সরিয়ে নেয় নিক। আরব সমাজে ভদ্রমহিলাদের এমন কি ছোঁয়াও বারণ। একটু হলেও প্রভাবিত হয় রোয়েন।
ব্যক্তিগত নামাঙ্কিত একটা কক্ষে ওকে নিয়ে যায় নিকোলাস।
এটা হলো ইনার মিউজিয়াম। ব্যাখ্যাদানের ভঙ্গিতে বলে সে। বিশৃঙ্খল অবস্থার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী আগে আমার স্ত্রী সব গোছাতো, কিন্তু থেমে যায় নিকোলাস। দেরাজের উপর একটা পারিবারিক ছবির দিকে তাকায় এক পলক। নিকোলাস আর গাঢ় রঙা চুলের এক মেয়ে বসে কোনো এক পিকনিক পার্টিতে। মাথার উপরে বিস্তৃত ওকের শাখা। মায়ের মতো দেখতে দুটো ফুটফুটে মেয়ে আছে কাছেই, একজন নিকের কোলে; বড়টা ঘোড়ার দড়ি ধরে পেছনে দাঁড়িয়ে। আড়চোখে তাকিয়ে, নিকোলাসের চোখে সব হারানোর কষ্ট দেখতে পায় রোয়েন।
ভদ্রলোককে সামলে নিতে দিয়ে রুমের চারদারে চোখ বুলায় সে। বিশাল, আরামদায়ক কক্ষ–একজন পুরুষের, বোঝাই যায়। তবে তার দ্বৈত-চরিত্র যেনো প্রকাশ্য, বই-পত্রের পণ্ডিতির পাশাপাশি অভিযাত্রীর ছাপ বড়ো স্পষ্ট। বইয়ের সারির সঙ্গে রয়েছে ফিশিং রীল, শটগান, কার্টিজ, বাক্স, জ্যাকেট।
দেয়ালের ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলো চিনতে পারে রোয়েন। উনিশ শতকীয় শিল্পী ডেভিড রবার্টের আঁকা জলরঙ। আরো রয়েছে নেপোলিয়নের সঙ্গে মিশর ভ্রমণ করা শিল্পী ভিভান্ত ডেনন-এর প্রাচীন মিশরীয় স্থাপত্য চিত্র।
ফায়ারপ্লেসে কাঠখণ্ড ফেললো নিকোলাস। অর্ধেক দেয়াল ঢাকা পর্দার সামনে হাতছানি দিয়ে ডাকে রোয়েনকে। একটানে পর্দা সরিয়ে ফেলে, সন্তুষ্টির সঙ্গে জিজ্ঞেস করে, কেমন লাগলো?
দেয়ালে কারুকার্জ করা বাস-রিলিফ ফ্রিজ দেখে তাক লেগে যায় রোয়েনের। কিন্তু নিজের অনুভূতি প্রকাশ পেতে দেয় না সে।
অ্যামোরাইট বংশধারায় ষষ্ঠ রাজা, হামুরাবি, খ্রিস্টপূর্ব ১৭৮০ সালের দিকের, নিপ্রাণ স্বরে বলে রোয়েন। প্রাচীন সম্রাটের নিখুঁতভাবে খোদাই করা মূর্তি পর্যবেক্ষণ করার ছল করে আবারো বলে, আসুর-এ, সম্ভবত তার প্রাসাদের স্থান, জিগুরাত থেকে আনা। দুটো থাকার কথা। কম করে হলেও পাঁচ মিলিয়ন ডলার করে এক একটি। সম্ভবত আধুনিক মেসোপটেমিয়ার শাসক, সাদ্দাম হোসেনের কাছ থেকে দুজন নীতি বিবর্জিত লোক এগুলো চুরি করে এনেছিল। আমার জানা মতে, টেক্সাসের জনৈক পিটার ওয়ালশের কাছে এর বাকিটা আছে।
অবাক বিস্ময়ে ওর দিকে চেয়ে থাকে নিকোলাস। এরপর অট্টহাস্যে ফেটে পরে। ধুত্তোর! ডুরেঈদকে বলেছিলাম গোপন রাখতে। ব্যাটা বলে দিয়েছে। সেই প্রথম নিকোলাসকে হাসতে শুনলো রোয়েন। প্রাণখোলা, অবিচলিত হাসি।
