যদিও কিছু কিছু নমুনা প্রায় একশ বছরের পুরোনো, তথাপি অত্যন্ত ভালো অবস্থায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, সুদক্ষ কর্মী দ্বারা পরিচালিত হয় এ যাদুঘর। বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন এ জন্য রোয়েন ভাবে। মনের গভীরে স্বীকার যায়, পাঁচ মিলিয়ন পাউন্ড, ভালো কাজেই লেগেছে।
অ্যান্টিলোপের কক্ষে গিয়ে বিস্ময়াভূত রোয়েন তার চারপাশে তাকিয়ে দেখে সংরক্ষিত প্রাণীগুলো। একটা অভাবিত সুন্দর, অ্যাঙ্গোলান প্রজাতির দুর্লভ হরিণের স্টাফ দেখে দুঃখ বোধ হয় তার। এমন সুন্দর একটা প্রাণী মেরেছে হারপার পরিবার! ভাবা যায়! পরক্ষণেই নিজেকে প্রবোধ দেয়–শিকারীর সংগ্রহ না থাকলে আজ আর কেউ দেখতে পেতো না এ প্রজাতি।
পরবর্তী হলঘরে রয়েছে হাতির সংগ্রহ। বিশাল একজোড়া আইভরির সামনে দাঁড়িয়ে থমকে যায় রোয়েন–এতো বড়ো, বিশ্বাসই হতে চায় না কোনো জীবিত জন্তুর ওগুলো। এ যেনো ডায়ানার হেলেনিক মন্দিরের থামের মতো মোটা! থেমে পরে, ক্যাটালগ কার্ডটা পড়ে দেখে রোয়েন :
আফ্রিকার হাতির দাঁত, লক্সোডোনটা আফ্রিকানা। ১৮৯৯ সালে স্যার জোনাথন কুয়েনটন হারপার কর্তৃক মৃত। বামদিকের দাঁতের ওজন ২৮৯ পাউন্ড, ডানদিকের ৩০১ পাউন্ড। বড়ো দাঁতের দৈর্ঘ্য ১১ফুট ৪ ইঞ্চি। বেড় ৩২ ইঞ্চি। একজন ইউরোপীয় শিকারী কর্তৃক সংগৃহীত সবচেয়ে বড় আইভরি।
রোয়েনের দ্বিগুণ লম্বা ওগুলো। ওর কোমরের অর্ধেক মোটা। এরপর মিশরীয় সংগ্রহের কক্ষে ঢুকে চমৎকৃত হলো রোয়েন।
কক্ষের কেন্দ্রে ওর চোখ আটকে যায়। পনেরো ফুট উঁচু মূর্তি ওটা, ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের। দেবতা ওসিরিসের মতো করে চিত্রায়িত–পালিশ করা লাল গ্রানাইট পাথরের। দেব সম্রাট তাঁর পেশীবহুল পায়ে দাঁড়িয়ে, আঁটো জামা আর স্যান্ডল পরনে। বাম হাতে যুদ্ধ-ধনুকের অবশিষ্টাংশ বহন করছেন তিনি, বাকি অংশ ভেঙে গেছে। এতো হাজার বছরে কেবল এ সামান্য ক্ষতি ছাড়া সম্পূর্ণ অক্ষত মূর্তিটা। ডান মুঠোয় রাজকীয় বর্ণমালায় লেখা একটা সীল ধারণ করে আছেন। ফারাও।
মস্তকে দীর্ঘ দ্বিমুকুট। মুখাবয়বে প্রশান্তির ছাপ।
দেখার সাথে সাথেই চিনতে পারলো রোয়েন। কেননা, কায়রো যাদুঘরের গ্রান্ড হলে এর একটা জমজ রয়েছে। অফিসে যাওয়ার পথে প্রতিদিনই দেখতো সে।
নিজের ভেতরে উথলে ওঠা রাগের অস্তিত্ব টের পায় রোয়েন। মাতৃভূমি মিশরের অত্যন্ত মূল্যবান একটা সম্পদ ওটা। অথচ তার দেশ থেকে চুরি করে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে। কারো অধিকার নেই, ওটা এখানে নিয়ে আসার। মহান নদী, নীলের তীরে এর আবাস। রাগে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যায় রোয়েন, মূর্তির নিচে খোদাই করা হায়ারোগ্লিফিক পড়ে।
রাজকীয় অক্ষরে লেখা আছে সতর্কবাণী: আমি পবিত্র রামেসিস, দ্বিতীয়, দশ হাজার রথের প্রভু। হে মিশরের শত্রু–সাবধান! আমাকে চিনে রাখো!
রোয়েন নিজে জোরে পড়ে নি বার্তাটা, কিন্তু ওর পেছন থেকে নরম, ভারী কণ্ঠে কেউ একজন পাঠ করে বাক্যগুলো, চমকে দেয় তাকে। কাউকে আসতে শুনে নি রোয়েন, পাই করে ঘুরে দাঁড়ায় ও।
নীল কার্ডিগানের পকেটে হাত গোজা ভদ্রলোকের, এক কনুইয়ে একটা ফুটো। বহুল ব্যবহৃত ডেনিম জিন্স ওভারঅল পরনে, মনোগ্রাম করা ভেলভেট কার্পেট স্লিপার পায়ে।
দুঃখিত, আপনাকে চমকে দিতে চাই নি। আলস্যভরা মার্জিত হাসলো সে, চমৎকার সাদা দাঁতের সুন্দর হাসি। এরপরেই ওকে চিনতে পারলো।
আরে, আপনি! রোয়েন ভাবে, আমাকে চিনতে পেরেছেন ভদ্রলোক! এক মুহূর্তের জন্য দেখা হয়েছিল মাত্র! পরক্ষণেই, তার দৃষ্টির কিছু একটা বিরক্ত করলো তাকে। যা হোক, হাত মেলালো রোয়েন।
নিক কুয়েনটন হারপার, নিজের পরিচয় দিলেন ভদ্রলোক। আপনি পার্সিভালো ডিক্সনের ছাত্রী, আমি জানি। আমার মনে হয়, গত বৃহস্পতিবারে শিকারে আপনাকে দেখেছি। সম্ভবত বিট করছিলেন সেদিন।
একটু সহজ হয় রোয়েন। হ্যাঁ। আমি রোয়েন আল সিমা। আমার ধারণা, আমার স্বামী ডুরেঈদ আল সিমা আপনার পরিচিত।
ডুরেঈদ! চিনবো না মানে! মরুতে বহু সময় কাটিয়েছি দু জন একসঙ্গে। দারুণ লোক। কোথায় উনি?
ও মারা গেছে।
এমন সাধাসিধা, হৃদয়হীনের মতো বলতে চায় নি রোয়েন, কিন্তু আর কোনো জবাব এলো না মাথায়।
ওহ! বলেন কি? জানতামই না! কেমন করে ঘটলো?
এইতো, সপ্তাহ তিনেক আগে। খুন।
ওহ, মাই গড! চোখে বেদনা ফুটে উঠলো নিকোলাসের। নিখাদ ভাবাবেগ। মাত্র চারমাস হলো কায়রোতে ওর সাথে ফোনে কথা হয়েছে আমার। কতো চমৎকার ছিলেন তখনো। কারা খুন করেছে, পাওয়া গেছে?
মাথা নেড়ে রুমের চারদিকে দৃষ্টি ফেরায় রোয়েন, ওর চোখের কান্না দেখতে দিতে চায় না।
আপনাদের সংগ্রহ অসাধারণ!
বিষয়ের এ হঠাৎ পরিবর্তন মেনে নেয় নিকোলাস। সব আমার দাদার কীর্তি। কায়রোতে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে কাজ করতেন উনি।
বাধা দিয়ে রোয়েন বলে ওঠে, আমি জানি। সে সময় প্রথম আর্ল ছিলেন ব্রিটিশ কনসাল জেনারেল অব ঈজিপ্ট। ১৮৮৩ থেকে ১৯০৭। আমার দেশে একনায়কত্ব চালিয়েছেন বহুদিন।
নিকোলাসের চোখের দৃষ্টি সরু হয়। পার্সিভালো বলেছিল আপনি তার সেরা ছাত্রী। কিন্তু এটা বলেনি যে, আপনার জাতীয়তাবোধ এতো প্রখর। রামেসিসের হায়ারোগ্লিফিক অনুবাদ করার জন্য আমার সাহায্য দরকার নেই তবে।
