মদ্দাটা মাটি ছুঁতে উল্লাসের ধ্বনি বের হলো তাড়য়াদের মুখ থেকে। এমনকি অন্য শিকারীরা সবাই সমস্বরে স্বীকার গেল দারুণ শর্ট, স্যার!
রোয়েন অবশ্য এ উল্লাসে যোগ দেয় নি, কিন্তু ওর শরীরের হিমঠাণ্ডা কেটে গেছে। একটু হলেও প্রভাবিত হয়েছে সে। ডুরেঈদের কথা ঠিক প্রথম দর্শনেই ভদ্রলোক তার প্রত্যাশা পূরণ করেছেন।
শেষ চলন শেষ হতে প্রায় অন্ধকার হয়ে এলো চারদিক। ক্লান্ত বিটার আর কুকুরগুলোকে তুলে নেওয়ার জন্য একটা ট্রাক এসে দাঁড়ালো জঙ্গলের পাশে। লম্বা বেঞ্চে বসলো সবাই কৃতজ্ঞচিত্তে। সিগারেট ধরিয়ে সবার সাথে গল্পে মেতে উঠলেন জর্জিনা।
এমন কঠিন একটা দিন শেষ হতে মনের গভীর কোথাও আনন্দ বোধ করছে। রোয়েন। ক্লান্ত, শিথিল কিন্তু আশ্চর্যরকম তৃপ্ত ও। অন্তত এক দিনের জন্য হলেও স্ক্রোল, ডুরেঈদের হত্যা আর অদেখা শত্রুদের নিয়ে ভাবে নি সে।
ঢাল বেয়ে পাহাড়ের নিচে নেমে এলো ট্রাক, এক পাশে সরে গিয়ে পথ করে দিল পেছনে আসা সবুজ রেঞ্জরোভারের। দুটো বাহন যখন পাশাপাশি, জানালো দিয়ে তাকিয়ে সরাসরি নিকোলাস কুয়েনটন হারপারের চোখে তাকালো রোয়েন। এস্টেটের গাড়ির চালকের আসনে বসে সে।
প্রথমবারের মতো কাছ থেকে লোকটাকে দেখছে রোয়েন। বয়সে তরুণ অবাক বিস্ময়ে সে ভাবে। ডুরেঈদের বয়সি কাউকে আশা করেছিল মনে মনে। সম্ভবত চল্লিশ পেরোয় নি বয়স। ট্যান করা চামড়া, বহু ঝড়-বঞা সহ্য করেছে বোঝা যায়। মোটা দ্রুর নিচে গভীর সবুজ অন্তর্ভেদি চোখ। ঠোঁটে এক টুকরো হাসি, চওড়া মুখে তবু বিষাদের ছাপ। রোয়েনের মনে পড়লো, প্রফেসর ডিক্সন কি বলেছিলেন ওকে। তাহলে পৃথিবীতে একা আমি শোকসন্তপ্ত নই!
ওর চোখে চোখ রাখলো নিকোলাস। ভাব পাল্টে যাচ্ছে ভদ্রলোকের মুখের টের পায় রোয়েন। সুন্দরী নারীর উপস্থিতিতে কার না হয়! কিন্তু মনের গভীরে শান্তি বোধ করলো না রোয়েন। ডুরেঈদের নৃশংস মৃত্যু ওর স্মৃতিতে এখনো অম্লান। সেই সাথে ব্যথাতুর। চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকালো ও। পাশ কাটিয়ে চললো রেঞ্জ রোভার।
*
লীডস ইউনিভার্সিটিতে লেকচারটা ভালোই দিল রোয়েন। ওর বাচনভঙ্গি চমৎকার, নিজের সাবজেক্টের উপর ভালো দখল আছে। রানী লসট্রিসের সমাধি খোঁড়া ও স্ক্রোল আবিষ্কারের বর্ণনা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলো শ্রোতাদের। তাদের অনেকেই বইটা পড়েছে, ফলে স্বভাবতই প্রশ্নোত্তর পূর্বে জানতে চাওয়া হলো কাহিনীর কতটুকু সত্য। এ পর্যায়ে খুব সাবধানে কথা বলতে হলো রোয়েনকে, লেখকের নিন্দা করা থেকে সযত্নে বিরত থাকলো ও।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর জর্জিনা আর রোয়েনকে ডিনার খাওয়ালেন প্রফেসর ডিক্সন। ডিনার পরিবেশনের আগে ওয়াইন দিয়ে গেল ওয়েটার। রোয়েন খাবে না শুনে বিস্মিত হলেন প্রফেসর, তারপর ক্ষমা প্রার্থনার সুরে বললেন, তুমি কী ধর্মান্তরিত হয়েছ? মানে মুসলমান হয়েছ?
হেসে ফেলে রোয়েন। বলল, আমি কপ্ট। তবে মদ না খাবার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। টেস্টটা আমার ভালো লাগে না।
আমার লাগে, বলে ওয়াইন ভর্তি গ্লাসটা ঠোঁটে তুললেন জর্জিনা।
হয়তো ওয়াইনের প্রভাবেই, নিজের জীবনের বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে বিস্তারিত বলে গেলেন ডিক্সন। কফির সময় রোয়েনের দিকে ফিরলেন তিনি।
ও, ভুলেই গেছি, হঠাৎ বললেন প্রফেসর। এই সপ্তাহের যে কোনো একদিন সন্ধ্যেয় কুয়েনটন পার্কে তোমার ভিজিট নিশ্চিত করেছি আমি। নিকোলাসের পি. এ, মিস স্ট্রিটকে ফোন করলে ও তোমার সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবে।
*
কুয়েনটন পার্কে যাওয়ার পথটা রোয়েনের পরিচিত। কয়দিন আগে জর্জিনার সঙ্গে এসেছিল। কিন্তু এবারে ল্যান্ড রোভারে সে একা। বিশাল প্রধান ফটক কাস্ট আয়রনে তৈরি। তার একটু সামনে গেলে তিন চারটে রাস্তা চলে গেছে, প্রতিটির সামনে সাইনবোর্ড পথ নির্দেশ করছে।
যাদুঘরে যাওয়ার পথটা চলে গেছে হরিণ-পার্কের মাঝখান দিয়ে। নির্ভিক উৎসুক চোখে ইতিউতি ঘুরে ফিরছে হরিণের পাল। কুয়াশাচ্ছন্ন বাতাসের ফাঁক গলে বিশাল বাড়িটা এক আধবার দেখতে পারছে রোয়েন। প্রফেসর ডিক্সনের দেওয়া গাইডবুক পড়ে সে জেনেছে, ১৬৯৩ সালে প্রখ্যাত স্থপতি স্যার ক্রিস্টোফার রেন এর নকশা করেছিলেন। ষাট বছর পর ব্রাউন সাহেব তৈরি করেছেন বাগানটা। অসাধারণ বললে আসলে কম বলা হবে, এমনই সৌন্দর্য এর।
কপার বিচ গাছের সারির মাঝে মূল বাড়ি থেকে আধ মাইল মতো দূরে যাদুঘরের অবস্থান। বোঝাই যায়, বহুবার মেরামত করা হয়েছে বাংলোটা। দরজার কাছেই অপেক্ষাই ছিলেন মিসেস স্ট্রিট, রোয়েনকে স্বাগত জানিয়ে ভিতরে ডেকে নিলেন তিনি। ধূসর চুলের মধ্যবয়স্কা মহিলা। সোমবারে বিকেলে আপনার লেকচারে আমি ছিলাম। দারুণ হয়েছে! একটা গাইডবুক আছে মিউজিয়ামের, আমার মনে হয়, এর সংগ্রহে আপনি মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। বিশ বছর হয়ে গেল এখানে চাকরি করছি। আজ একা আপনিই ভিজিটর। নিজের মতো করে ঘুরে দেখুন, পাঁচটার আগে এখান থেকে যাচ্ছি না আমি। গলিপথের শেষ মাথায় আমার অফিস, প্রয়োজন হলে ওখানে পাবেন আমাকে।
আফ্রিকান স্তন্যপায়ী প্রাণীর ডিসপ্লে দেখে প্রথমেই মুগ্ধ হলো রোয়েন। আলোচ্য মহাদেশের সমস্ত প্রাণীই আছে সেখানে। রূপালি-ধূসর পুরুষ গরিলা থেকে শুরু করে সব রকমের বানর, কলোবাস।
