এই শেষ ল্যাপ, রোয়েন। বললেন জর্জিনা।
নিজের দুরবস্থায় লজ্জা পেল রোয়েন। লাঠি ফেলে, এক লাফে একটা ডোবা অতিক্রম করতে চাইলো সে। হিসেবের গড়মিল, এক হাঁটু কাদাপানিতে মুখ থুবড়ে পড়লো।
হেসে ফেললেন জর্জিনা। সামনে এগিয়ে গিয়ে এক হাতে টেনে তুললেন মেয়েকে। ধড়মড় উঠলো রোয়েন। ওদিকে প্রধান বিটার চিৎকার করছেন, বামে থেমে দাঁড়াও সবাই!
থমকে দাঁড়ালো লাইন। একজন বিটারে কাজ হলো ঝোঁপ-ঝাড়ে বসে থাকা বুনোহাঁস, পাখির দলকে ধীরে সুস্থে, একটি দুটির দলে করে উড়তে বাধ্য করা, এক ঝকে নয়। এতে করে প্রথম দুই ব্যারেল ফায়ার করার পর অপর বন্দুক তৈরি করে নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় পায় শিকারী। কতো চমৎকারভাবে অপেক্ষারত শিকারীর বন্দুকের সামনে পাখি পাঠাতে পারে–এরই ভিত্তিতে নির্ণীত হয় একজন কীপারের মূল্য।
বুক ভরে শ্বাস টেনে চারদিকে তাকায় রোয়েন। ঝোঁপের ফাঁক গলে উপত্যকা দেখতে পারছে সে। গত সপ্তাহের তুষারপাতে পাহাড়ের পাদদেশের কিছুটা ঘেঁসো জমিন সাদা হয়ে গেছে। ওখানে, নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষায় আছে শিকারীরা।
সবাই অধীর অপেক্ষায় আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে, কখন দেখা দেয়। বুনোহাঁস।
নিকোলাস কোনজন, মা? রোয়েন শুধোয় মা-কে। শিকারীদের শেষ সারির দিকে, দেখান জর্জিনা।
ও, লম্বা ভদ্রলোক?
খড়খড় করে ওঠে ওয়াকি টকি। কীপার সবাইকে নতুন নির্দেশ দিচ্ছেন। ধীরে বামে ঘোরো। আস্তে আস্তে ঝোপে বাড়ি দাও। বাধ্যগতের মতো হাতের লাঠি দিয়ে বাড়ি মারতে থাকে বিটারেরা।
সামনে এগোন এবারে। এক ঝাঁক উড়ে গেলে থেমে দাঁড়াবেন।
ধীরে, নিরাসক্তভাবে বাতাসে ডানা মেলে বুনোহাঁসের দল।
জর্জিনা, ম্যাজিক–সবাই খুব খুশি। নিঃশব্দ হাসিতে ফেটে পড়েছে যেনো ম্যাজিক, এ কাজের জন্যই তো ওর জন্ম! তাড়া দেওয়া ওর ভারী পছন্দ।
ম্যাজিকের তাড়া খেয়ে উড়ে যায় একদল বুনোহাঁস। মেয়ে হাঁসটা সামনে, পুরুষটা পেছনে। দারুণ রাজকীয় অবয়ব তার। রক্তবর্ণ আর সবুজের মিশেল লেজটা সিনামন আর কালো রঙে সাজানো, ভীষণ লম্বা।
উড়ে যেতে যেতে ধূসর আকাশের গায়ে কর্কশ কণ্ঠে ডেকে উঠে হাঁসটা। এমন। সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়ে রোয়েন।
দ্যাখ, দ্যাখ, কেমন সুন্দর উড়ে যায়! উত্তেজনায় খসখসে হয়ে গেছে জর্জিনার গলা। দিনের সেরা জোড়া! বাজি রাখলাম, কোনো বন্দুক ওদের নাগাল পাবে না!
ওই তো উড়ে যাচ্ছে ওরা, মুক্ত, স্বাধীন। এখনই চলে যাবে পাহাড় পেরিয়ে। কিন্তু হঠাৎ এক পশলা গরম হাওয়া টেনে উপত্যকার দিকে নিয়ে যায় হাঁস। দম্পতিকে।
বিটারের সারি এ সময়ের অপেক্ষায় ছিল। এর জন্যই যতো কষ্ট। উড়ে গিয়ে বন্দুক ফাঁকি দিতে পারলে সবচেয়ে খুশি হয় বিটারেরা।
বাতাসে মুচড়ে উড়ছে এখনো জোড়া হাঁস। নিজে থেকেই থমকে দাঁড়িয়েছে তাড়ুয়ারা।
ওদিকে, উপত্যকার তলায় বসে থাকা শিকারীদের বন্দুকের নল ঊর্ধ্বমুখী হয়। সর্বোচ্চ গতিসীমায় পৌঁছে গেছে বুনোহাঁসের জোড়া, উত্তেজনায় অধীর শিকারীরা। ছো মারার ভঙ্গিতে এবারে নিচে নামতে শুরু করেছে।
যে কোনো বিচারেই সুকঠিন একটা টার্গেট ওরা। বারো বোর শর্টগানের আওতার শেষ সীমানায় ঝরে পড়তে থাকা বুনো হাঁসে লাগানো চাট্টিখানি কথা নয়। সবচেয়ে সেরা শর্ট হয়তো একটাকে পেতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে দুটো? মনে হয় না।
এক পাউন্ড বাজী ধরলাম! জর্জিনা বলে ওঠেন। দুটোই বেঁচে যাবে! কেউ অবশ্য তার সাথে বাজী লাগতে এলো না।
ধীরে, একপাশে ঠেলে দিচ্ছে বাতাস, পাখিজোড়াকে। দূরের কোণায় সরে যাচ্ছে ওরা। নড়ছে বন্দুকের নল, রোয়েন দেখতে পারছে ওর অবস্থান থেকে। এবারে, একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো শিকারীরা কিছুটা সহজ অবস্থানে চলে গেছে টার্গেট।
সারির সবচেয়ে শেষের শিকারী দাঁড়িয়ে আছে গতিপথে।
আপনার শর্ট, স্যার, কিছুটা পরিহাসের সুরে এক বন্দুকধারী বলল লম্বা শিকারীকে। নিজের অজান্তেই দম আটকে ফেললো রোয়েন। অবয়বে কী এক প্রতীক্ষা!
যেনো হাঁস জোড়ার আগমন সম্পর্কে সচেতন নয় নিকোলাস হারপার। শর্টগান হাতের ভাঁজে আটকে শিথিল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে, দীর্ঘ শরীর স্থির।
মাদী হসটা যখন তার অবস্থান থেকে ষাট ডিগ্রী মতো কোণে রয়েছে, প্রথমবারের মতো নড়ে উঠলো নিকোলাস। সহজাত ভঙ্গিতে শর্টগান ঘুরিয়ে বাতাসে বৃত্ত কাটলো, বৃত্ত পূর্ণ হওয়ার আগেই চিবুকে যখন ঠেকলো বন্দুকের বাট; গুলি করলো সে।
দূরত্বের কারণে শব্দটা দেরিতে পেল রোয়েন। বন্দুকের আঁকি, নলের সামনে থেকে ওড়া ম্লান নীল ধোয়া তার নজড়ে এলো আগে। অস্ত্র নামিয়ে রাখলো নিকোলাস। মাথা নিচু করে হঠাৎই ধরিত্রীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো মাদী হাঁসটা। কোনো পালক ছড়িয়ে পড়লো না বাতাসে, সরাসরি মাথায় লেগেছে গুলি। এ সময় আবারো গুলির শব্দ পেল রোয়েন।
ততক্ষণে সরাসরি নিকোলাসের মাথায় উপরে চলে এসেছে মদ্দাটা। এবারে, পিঠ সামান্য বাঁকিয়ে গুলি ছুঁড়লো সে, লম্বা শরীর বেঁকে গেছে। আবারো, গর্জে উঠলো বন্দুক।
একইসঙ্গে সন্তুষ্টি আর নিরাশা নিয়ে রোয়েন ভাবলো, মিস হয়েছে গুলিটা, নিজের মতো করে তখনো উড়ছে হাঁস। ওর অস্তিত্বের এক অংশ চাইছে হাঁসটা বেঁচে থাকুক, আবার আরেক অংশ চাইছে লম্বা লোকটা সফল হোক। আচমকা, পাখা ভাঁজ হয়ে এলো বুনোহাঁসের; রোয়েনের জানা নেই, ওর হৃদপিন্ডও ছিদ্র হয়ে গেছে।
