ইয়র্কে, মায়ের গ্রামের বাড়িতে লেকচার তৈরি করার জন্য স্লাইড আর নোটগুলো সাজাতে কয়েকটা দিন ব্যয় করলো রোয়েন। রোজ বিকেলে পোষা কুকুর ম্যাজিককে নিয়ে গ্রামের পথে হাওয়া খেতে বেরোয় ও। মেয়ে অভয় দিলেও, একা ওকে কোথাও যেতে দেন না জর্জিনা, তিনিও সঙ্গে থাকেন।
কুয়েনটন পার্ক চেনো তুমি? বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে একদিন জানতে চাইলো রোয়েন, মায়ের কাছে।
বেশ ভালো চিনি, উৎসুক জর্জিনা বলেন। ম্যাজিক আর আমি বছরে কম করে হলেও পাঁচ কি ছয় সিজন যাই ওখানে। দারুণ জায়গা। অনেক বুনো হাঁসের দলের দেখা মেলে। শিকারের জন্য এর চেয়ে ভালো আর হয় না। ইংল্যান্ডের সেরা পেশাদার শুটাররা যান ওখানে, পাখি শিকারে।
নিকোলাস হারপার–ওটার মালিক, ওনার সাথে পরিচয় আছে তোমার?
এমনি দেখেছি আর কি। পরিচয় নেই। জর্জিনা উত্তরে বলেন। ওর বাপের সঙ্গে জানাশোনা ছিল বিয়ের আগে। ভালো নাচতো ব্যাটা। সবসময় যে ড্যান্স ফ্লোরে নাচত–তাও নয়!
রোয়েন স্তম্ভিত।
মা!
হুম। বেশ দুরন্ত ছিলাম কিন্তু!
তুমি আর ম্যাজিক আবার কুয়েনটন পার্কে যাবে কবে?
এই তো, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে।
আমি যেতে পারি?
নিশ্চই। একজন বিটার পেলে তো ওরা বর্তে যায়। লাঞ্চ, বিয়ারের বোতল সব ওরাই দেয়। হঠাৎ থেমে পরে মেয়ের চোখে তাকালেন জর্জিনা। কী ব্যাপার বল তো?
শুনেছি বিখ্যাত ঈজিপশিয়ান কালেকশন আছে ওদের। একটু দেখতে চাই।
পাবলিকের জন্য ভোলা নয়। নিকোলাস বেশ রুক্ষ মানুষ, সবসময় আড়ালে থাকতে চান। নিমন্ত্রীত অতিথি ছাড়া কারো প্রবেশাধিকার নেই যাদুঘরে।
তুমি পারবে নাকি, আমার জন্য একটা নিমন্ত্রণপত্র যোগাড় করে দিতে?
মাথা নাড়েন জর্জিনা।
আমি না। কিন্তু প্রফেসর ডিক্সনের সঙ্গে নিকোলাসের ভালো খাতির। ওকে বলে দেখতে পারি।
*
দশ দিন পর প্রফেসর ডিক্সনের সঙ্গে দেখা হলো রোয়েনের। মায়ের গাড়ি নিয়ে লীডস-এ গেল সে। কক্ষভর্তি বই, কাগজ আর আর্টিফ্যাক্ট আনমনা করে তুললাম রোয়েনকে। দুরেঈদের মৃত্যুর খবরে দারুণ অবাক হলেন ডিক্সন, অবশ্য খুব দ্রুতই বিষয়টা পরিবর্তন করে ফেললেন তিনি। লেকচারের জন্য ওর প্রস্তুতি নিয়ে খুঁটিনাটি জানতে চাইলেন।
চলে আসার কিছুক্ষণ আগে কুয়েনটন পার্কের কথা বলল রোয়েন। সাথে সাথেই সাড়া দিলেন প্রফেসর।
তুমি এখনো ওখানে যাও নি? অবাক হলাম। দারুণ কালেকশন। একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কুয়েনটন পরিবারের সংগ্রহশালা সত্যি দেখার মতো। আগামি বৃহস্পতিবার এস্টেটে শিকারে যাচ্ছি আমি, তখন নিকোলাসের সঙ্গে কথা বলে দেখবো এখন। ও অবশ্য অনেকটা পাল্টে গেছে। বেচারার উপর দিয়ে বেশ ঝড়-ঝাপ্টা গিয়েছে। মোটর দুর্ঘটনায় স্ত্রী আর দুই মেয়ে হারিয়েছে গত বছর। নিকোলাস নিজেই চালাচ্ছিল তখন।
তো, তোমার লেকচারের অপেক্ষায় থাকলাম। মনে হয়, একশোরও বেশি শ্রোতা পাবে। ইয়র্ক শায়ার পোস্ট থেকে একজন রিপোর্টারও যোগাড় করেছি আমি। তোমার ইন্টারভিউ নিতে চায়। বলা যায়, আমাদের ডিপার্টমেন্টের জন্য সেরা পাবলিসিটি। দুই এক ঘণ্টা আগে এসো, ওদের সঙ্গে কিছু সময় কথা বলে নিও। .
আপনার সাথে এর আগেই আমার দেখা হবে, স্যার। রোয়েন জানায় বৃদ্ধকে। মা আর ম্যাজিককে নিয়ে কুয়েনটন পার্কে যাচ্ছি আমরা বৃহস্পতিবারে। বিটারের চাকরি পেয়েছি ওইদিন!
ঠিক আছে। তোমাকে খুঁজবো। ভালো থেকো।
বিদায় নেয় রোয়েন।
*
দারুণ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল উত্তর থেকে। ঘন মেঘমালা, ধূসর, ভারী, যেনো পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে আছে। মায়ের দেওয়া জ্যাকেটের নিচে তিনপ্রস্থ কাপড় পরেছে রোয়েন। কিন্তু কাঁপুনি থামাতে পারছে না। এক সারিতে সমস্ত বিটারেরা এগুচ্ছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। পা দুটো কবেই বরফ হয়ে গেছে! নীলের উপত্যকার আর্দ্র-বাতাস রোয়েনের রক্ত পাতলা করে দিয়েছে।
আজকের দিনের শেষ ড্রাইভের জন্য প্রধান বিটার, জর্জিনাকে লাইনের সামনের দিকে নিয়ে এসেছেন। ওদের কাজ হবে, গুলিবিদ্ধ পাখি বা বুনোহাঁসগুলোকে সংগ্রহ করা।
দিনের শেষভাগে সবচেয়ে উত্তেজনাকর হাই লার্চে চলছে অভিযান। পাহাড়ের গা থেকে পাখিগুলো তাড়িয়ে আনার জন্য প্রচুর বিটার চাই এখানে, বিশাল ভূখণ্ড ছড়িয়ে আছে চারপাশে। তাড়া খেয়ে পাখির দল এসে পরবে উপত্যকায় তৈরি থাকা শিকারীর বন্দুকের সামনে।
বুনোহাঁস আর পাখিদের প্রতি এ বড়ো অন্যায় ব্যবহার, রোয়েন ভাবে। জর্জিনা তাকে জানিয়েছেন, যতো উঁচু দিয়ে উড়ে যাবে ওরা, যতোই কঠিন হবে শিকার, ততো বেশি খুশি শিকারীরা।
জানিস, একদিনের শুটিং-এর জন্য কতো টাকা খরচ করে এরা? জর্জিনা বলেছিলেন। এক আজকের দিনেই ১৪ হাজার পাউন্ড আয় হবে এস্টেটের। এ সিজনে বিশদিন চলবে শিকার। এবার হিসেব করে দেখ, কতো টাকার মামলা! এস্টেটের সিংহভাগ অর্থই আসে শুটিং থেকে। শুধু শুধু অবসর সময় কাটানোর চেয়ে কুকুর নিয়ে দৌড়ে আমার মতো লোকাল মানুষ কিছু পয়সা রোজগার করছে খারাপ কী?
অবশ্য, বিটারের কাজে এখন আর কোনো আমোদ পাচ্ছে না রোয়েন। ঢালু পথে হাঁটা বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে, একবার তো পরেই গিয়েছিল। গায়ে-হাতে মাটি মাখামাখি, ক্লান্তিতে একেবারে নুয়ে গেছে সে। হাতের লাঠির উপর ভর দিয়ে এগুচ্ছে। কিন্তু তার মা মোটেও ক্লান্ত নয়, চোখ চকচক করছে তার।
