প্রথমেই স্কাউটদের ছোট একটা দলকে এয়ারস্ট্রিপে পাঠিয়ে দিল মেক, ওরা যাতে অ্যামবুশের মধ্যে না পড়ে। তারপর আগাচায় ঢাকা ট্রেইল ধরে এক লাইনে রওনা হলো মূল দল। এক মাইলও এগুনি, মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিল কাস্তে আকৃতির চাঁদ। তারপর একটা দুটো করে তারাও দেখা গেল। রাতের কালো আকাশের গায়ে সুগার মিলের চিমনিটা চিনতে পারলো ওরা।
কোনো অঘটন ছাড়াই রাত তিনটের দিকে এয়ারস্ট্রিপে পৌঁছল ওরা। ইতোমধ্যে চাঁদ ডুবে গেছে। ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতর অ্যামুনিশন ক্রেটগুলো সাজিয়ে রাখা হলো, পাহারায় থাকলে কয়েকজন গেরিলা। রোয়েন আর টিসে আহত গেরিলাদের দেখাশোনা করছে।
মেকের মেডিকেল কিটটা সাংঘাতিক কাজে লাগলো। ছোট্ট একটা আগুন জ্বালা হয়েছে, পর্দার ভেতর, তারই আভায় আহতদের সেবা করছে ওরা। এক পাশে সরে এসে রেডিওর এরিয়াল লম্বা করলো নিকোলাস, রেডিও নাইরোবি ধরে চাকা-চাকার গান শুনলো কিছুক্ষণ। আগেও শুনেছে, মেয়েটার গলা ওর ভালোই লাগে। তবে একটু পরই রেডিও বন্ধ করে দিল, ব্যাটারি অপচয় করতে চায় না। গাছের গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বুজল নিকোলাস, ভোর হওয়ার আগে একটু ঘুমিয়ে নিতে চায়। কিন্তু ঘুম এলো না-বেঈমানীর আভাস পেয়ে বড় বেশি রেগে আছে ও।
*
বিগ ডলি! সাড়া দাও, বিগ ডলি! আমি ফারাও তোমাকে ডাকছি। আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছ? সূর্য ওঠার এক ঘণ্টা আগে রেডিওর সাহায্যে ডাকাডাকি শুরু করছে নিকোলাস।
তারপর মেককে বলল, জেনিকে আমি চিনি, সময়ের হিসেব করেই রওনা হবেন, যাতে খুব ভোরে ল্যান্ড করতে পারেন এখানে।
যদি আদৌ রওনা হন আর কি, মেকের গলায় সংশয়।
জেনি? ওঁকে তুমি চেনো না, তাই এ-কথা বলছ। জেনি কখনোই হতাশ করেন নি আমাকে। মাইক্রোফোনের বোতামে চাপ দিয়ে আবার ডাকলো নিকোলাস, বিগ ডলি! বিগ ডলি। সাড়া দাও!
হঠাৎ দাঁড়াতে শুরু করলো রোয়েন, বলল, ইঞ্জিনের আওয়াজ পাচ্ছি আমি। শুনুন!
নিকোলাস ও মেক ঝেপের আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে উত্তর আকাশের দিকে তাকালো।
ওটা হারকিউলিস নয়, হঠাৎ বলল নিকোলাস, বিস্মিত দেখালো ওকে। ঘুরে দক্ষিণে তাকালো, নদীর দিকে। তাছাড়া, শব্দটা আসছে উল্টোদিক থেকে।
ঠিক, সায় দিল মেক।
সিঙ্গেল ইঞ্জিনের আওয়াজ। রোরের শব্দও পাচ্ছি। আমি।
পেগাসাস হেলিকপ্টার! বলল নিকোলাস। হামলা করতে আসছে।
তবে না, আওয়াজটা ক্রমশ দূরে মিলিয়ে গেল। ঢিল পড়লো নিকোলাসের পেশীতে। ওরা আমাদের দেখতে পায় নি। বোটগুলো লুকিয়ে রাখার লাভ হয়েছে।
ঝোঁপের আগালে ফিরে এলো ওরা। রেডিওটা আমার অন করলো নিকোলাস। কিন্তু জেনি বাদেনহোর্সটের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশ মিনিট পর জেট রেঞ্জারের ফিরে আসার আওয়াজ পেল ওরা। খানিকক্ষণ কান পেতে সোনার পর নিকোলাস বলল, ফিরে যাচ্ছে আবার। কিন্তু দশ মিনিট পর আবার ভেসে এলো রোরের শব্দ।
নগু কিছু একটা করছে ওদিকে, বলল মেক, চেহারায় অস্বস্তি।
কি? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।
হয়তো বোটগুলো দেখতে পেয়েছে, বলল মেক। হামলা করার আগে আরো লোকজন এনে জড়ো করছে। ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে কান পাতলো সে। খানিক পর ফিরে এলো নিকোলাসের পাশে। নিকোলাস রেডিওতে কথা বলছে।
তুমি ডাকতে থাকো। আমি যাই, গেরিলাদের সাবধান করে দিই।
পরবর্তী তিন ঘণ্টা নীলনদের উপর দিয়ে বারবার আসা-যাওয়া করলো পেগাসাসের জেট রেঞ্জার হেলিকপ্টার। তবে নতুন কিছু ঘটছে না। রোনের আওয়াজে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ওরা, শব্দটা হলে রেডিও থেকে এক-আধবার শুধু মুখ তুলছে নিকোলাস। তারপর হঠাৎ জ্যান্ত হয়ে উঠলো রেডিও, জেনি বাদেনহোর্সটের গলা ভেসে এলো। ফারাও! বিগ ডলি বলছি। আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছ?
সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল নিকোলাস, আমি ফারাও। মিষ্টি মিষ্টি কথা শোনাও, বিগ ডলি।
পৌঁছতে আরো এক ঘণ্টা ত্রিশ মিনিট লাগবে, জেনি বাদেনহোর্সটেরই গলা, কোনো সন্দেহ নেই।
মাইক্রোফোন রেখে দিয়ে রোয়েন আর টিসের দিকে তাকালো নিকোলাস। জেনি রওয়া হয়ে গেয়েছেন, ওঁ….
মুখের হাসি দপ করে নিভে গেল, নদীর দিক থেকে ভেসে এলো একে ফরটিসেভেনের বিরতিহীন গর্জন। কয়েক সেকেন্ড পর দুটো গ্রেনেডও বিস্ফোরিত হলো। গুঙিয়ে উঠলো নিকোলাস, সর্বনাশ! নগু হামলা করেছে।
কোনো চিন্তা করবেন না, জবাব দিল জেনি। আপনি মুকুট পরে থাকুন, মনিব আমার। আমি ঠিকই পৌঁছব, আগুন থেকে তুলেও নিব আপনাদের।
পরবর্তী আধ ঘণ্টা নদীর কিনারা বরাবর গোলাগুলির আওয়াজ ক্রমশ বাড়লো, একে-ফরটিসেভেনের শব্দ মুহূর্তের জন্যও থামছে না। ধীরে ধীরে কাছে সরে আসছে যুদ্ধটা। পরিষ্কার বোঝা গেল, ছড়িয়ে থাকা গেরিলারা পিছু হটছে। বিশ মিনিট পরপর ব্রেনের আওয়াজও পেল ওরা, প্রতিবার আরো সৈন্য এনে নিজের শক্তি বাড়িয়ে নিচ্ছে কর্নেল নগু।
এয়ারস্ট্রিপের কাছাকাছি ঝোঁপের ভেতর সুস্থ ও সমর্থ পুরুষ বলতে শুধু নিকোলাস আর ড্যানিয়েল, বাকি সবাই যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গেছে। ক্রেটগুলো গুরুত্ব অনুসারে নতুন করে সাজালো ওরা দু জন, প্লেন ল্যান্ড করলে তাড়াহুড়ো করে লোড করা হবে। যুদ্ধক্ষেত্রের চারটা মডেল প্রথমে ভোলা হবে প্লেনে। তারপর ডেথ-মাস্ক আর টাইটার পুতুল আছে যে ক্রেটে, সেটা। তৃতীয় দফায় তোলা হবে তিনটি মুকুট-লাল, সাদা আর নীল ক্রাউন। এ তিনটের দাম সম্ভবত বাকি সমস্ত ট্রেজারের চেয়েও বেশি। কাজটা শেষ করে আহত গেরিলাদের সঙ্গে কথা বলল নিকোলাস, প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে। সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ দিল, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো আত্মত্যাগের জন্য। ওদেরকে প্লেনে ওঠার প্রস্তাব দিল নিকোলাস, এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে যেখানে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়।
