আহতদের মধ্যে থেকে সাতজন ওর প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলো, কমান্ডার মেককে ছেড়ে কোথাও তারা যাবে না। বাকি সবাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হলো, বিশেষ করে টিসের যুক্তি এড়াতে না পেরে। যারা প্লেনে উঠবে তাদেরকে এয়রস্ট্রিপের আরো কাছাকাছি তুলে আনা হলো। ক্রেটগুলো আগেই সরিয়ে আনা হয়েছে।
আপনি কী করবেন? টিসেকে জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। আপনিও কি আমাদের সঙ্গে আসছেন? পুরোপুরি সুস্থ এখনো আপনাকে বলা যায় না।
হেসে উঠলো টিসে। যতোক্ষণ দু পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব, আপনারা আমাকে মেকের পাশেই দেখতে পাবেন।
আপনি কী জানেন, নিজের ভাগের শেয়ার মেক আমাকে নিয়ে যেতে বলেছে? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। অতিরিক্ত বোঝা সঙ্গে নিতে রাজি নয়?
জানব না কেন। মেক আমার সঙ্গে আলোচনা করেছে। এখানে যুদ্ধ চালাতে হলে আমাদের টাকা দরকার।
নিজের অজান্তেই ঝট করে মাথাটা নিচু করে নিল টিসে, অকস্মাৎ একটা বিস্ফোরণ ঘটার পরপরই। ঝোঁপের কিনারা থেকে ধুলোর লম্বা একটা স্তম্ভ আকাশের দিকে খাড়া হলো। বাতাসে শিস কেটে ওদের মাথার উপর দিয়ে ছুটে গেল শ্যাপনেল। সুইট মেরি! কী ওটা? আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে টিসের চেহারা।
দু ইঞ্চি মর্টার, বলল নিকোলাস। নড়েনি ও, আড়াল পাবারও চেষ্টা করে নি। যতো গর্জে ততো বর্ষে না।নগু শেষবার কপ্টারে করে ওগুলো এনেছে বলে মনে হয়।
হারকিউলিস এখানে পৌঁছচ্ছে কখন?
জেনিকে ডেকে জিজ্ঞেস করছি। রেডিওর উপর ঝুঁকলো নিকোলাস।
রোয়েন আর টিসে পরস্পরের হাত ধরে ফিসফিস শুরু করলো। টিসে বলল, আপনারা, ইংরেজরা সবাই এতো চালু নাকি?
আমাকে জিজ্ঞেস করো না। আমি মূলত মিশরীয়। এবং আতঙ্কিতও বটে। সহজ হেসে টিসের কাঁধ জড়িয়ে ধরলো রোয়েন। আমি তোমাকে মিস করব, হে নারী সূর্য!
হ্যাঁ। আশা করি, এর পরের বার ভালো পরিবেশে দেখা হবে।
তাই কামনা করি।
মাইক্রোফোনে কথা বলছে নিকোলাস, বিগ ডলি, দিস ইজ নিকোলাস। আপনার পজিশন জানান।
ফারাও, আমরা বিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাব। আপনারা কী চিনে বাদাম ভাজছেন, নাকি আমি মর্টারের আওয়াজ শুনছি?
এতো যার রসবোধ, তার মঞ্চে থাকা উচিত ছিল, বলল নিকোলাস। শত্ররা এয়ারস্ট্রিপের দক্ষিণ প্রান্ত দখল করে নিয়েছে। আপনাকে উত্তর দিক থেকে আসতে হবে। বাতাস বইছে পশ্চিম দিক থেকে, গতি পাঁচ নট।
ধন্যবাদ, স্যার। প্যাসেঞ্জার আর কার্গো সম্পর্কে বলুন।
প্যাসেঞ্জার ছয় আর তিন নয়জন। ক্রেটের সংখ্যা বাহান্ন, প্রায় দেড় টন ওজন।
এতো কম লোক আর কার্গোর জন্য আসতে বলেছেন আমাকে? জেনি হেসে উঠলো।
বিগ ডলি, সাবধান। এলাকায় আরেকটা এয়ারক্রাফট আছে। জেট রেঞ্জার হেলিকপ্টার। সবুজ আর লাল। মতিগতি সুবিধের নয়, তবে আন আর্মড।
রজার, ফারাও। শেষ একবার যোগাযোগ করব।
রেডিও ছেড়ে আহত গেরিলাদের কাছে চলে এলো নিকোলাস, এখানে রোয়েন আর টিসেও রয়েছে। প্লেন আসতে আর বেশি দেরি নেই, গোলাগুলির আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠলো ওর গলা। শুধু এক কাপ চা খাওয়ার সময় আছে।
বলতে হলো না, নিজেই চা বানাতে বসে গেল ড্যানিয়েল।
হাতে চায়ের কাপ, রোয়েন হঠাৎ বলল, আপনার হারকিউলিস পৌঁছে গেছে, ইঞ্জিনের আওয়াজ পাচ্ছি আমি।
পাঁচ মিনিট পর ল্যান্ড করতে যাচ্ছি, ফারাও, জবাব দিল জেনি।
লম্বা এয়ারস্ট্রিপের দিকে তাকালো নিকোলাস। মেকের গেরিলারা পিছু হটছে এখনো, কাঁটাঝেপের ভেতর ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে, পিছু হটার সময়ও অনবরত গুলি করছে তারা। কর্নেল নগু খুব জোরে তাড়া করেছে।
তাড়াতাড়ি, জেনি, তাড়াতাড়ি, বিড়বিড় করছে নিকোলাস। তবে রোয়েন আর টিসের দিকে ফেরার আগে চেহারায় হাসি ফুটিয়ে তুললাম। কাপে আস্তে ধীরে চুমুক দিন, ব্যস্ত হবার কিছু নেই।
গোলাগুলির চেয়ে প্লেনের আওয়াজ বেড়ে গেছে। তারপর হঠাৎ ওটাকে দেখা গেল। এতো নিচু দিয়ে আসছে, মনে হলো কাঁটাগাছগুলোয় ঘষা খাবে। দুই ডানা এতো বড়, আগাছায় চাপা পড়ে সরু হয়ে থাকা এয়ারস্ট্রিপের দুই প্রান্ত ছুঁই ছুঁই করছে। জমিন স্পর্শ করলো প্লেন, ধুলোর মেঘ পাক খেতে শুরু করলো পেছনে, ইঞ্জিন রিভার্স করে দিল পাইলট।
ঝোঁপগুলোকে পাম কাটিয়ে এগুলো হারকিউলিস, ককপিট থেকে ওদেরকে দেখতে পেয়ে হাত নাড়লো জেনি। স্পীড যথেষ্ট কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফুটব্রেক আর রাডার বার-এর উপর দাঁড়িয়ে পড়েছে সে। ঘুরে যাচ্ছে প্লেন, স্ট্রিপ ধরে ফিরে আসছে ওদের দিকে, কাছাকাছি আসার আগেই লোডিং র্যাম্প খুলে গেল।
খোলা হ্যাঁচওয়েতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফ্রেড, জেনি বাদেনহোর্সটের ছেলে। লাফ দিয়ে নিচে নামলো সে, আহত লোকগুলোকে স্ট্রেচারে তুলতে সাহায্য করলো নিকোলাস আর ড্যানিয়েলকে। র্যাম্প বেয়ে ওদেরকে তুলতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগলো। তার পরই শুরু হয়ে গেল অ্যামুনিশন ক্রেট লোড করার কাজ। ওদের সঙ্গে রোয়েনও হাত লাগালো কাজে, হালকা ক্রেটগুলো একাই বয়ে নিয়ে এলো। একটা ক্রেটও ফেলে যেতে রাজি নয় ও।
দাঁড়ানো হারকিউলিসের দেড়শো গজ দূরে বিস্ফোরিত হলো একটা মর্টার। দ্বিতীয় শেলটা পড়লো মাত্র একশো গজ দূরে।
ক্রেট কাঁধে ছুটছে নিকোলাস, চিৎকার করে বলল, রেঞ্জিং শট!
ওরা আমাদেরকে সাইটে পেয়ে গেছে, ফ্রেডও চেঁচাচ্ছে। এক্ষুনি কেটে পড়তে হয়। বাকি কার্গো তোলার সময় নেই। লেটস গো! গো….গো…গো….!
