রোয়েন জানে, স্যার নিকোলাস নিজেও আফ্রিকার উপকূলে ব্রিটিশ আর্মির হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। আরবি এবং সোয়াহিলি–দু ভাষাতেই সমান দক্ষ ভদ্রলোক, একজন সৌখিন প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং প্রাণিবিজ্ঞানী। বাপ-দাদার মতো নিকোলাসও বহুবার উত্তর আফ্রিকার গহীন এলাকায় অভিযান চালিয়েছেন, সংগ্রহ করেছেন মূল্যবান নমুনা। বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়, এমন কি রয়াল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটিতে লেকচার পর্যন্ত দিয়েছেন তিনি।
নিঃসন্তান বড়ো ভাইয়ের মৃত্যুর পর পারিবারিক টাইটেল এবং কুয়েনটন পার্কের এস্টেটের মালিকানা বর্তায় নিকোলাসের উপর। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয় সে। যতোটা না এস্টেট দেখাশোনার জন্য, তার চেয়ে বেশি পারিবারিক মিউজিয়াম পরিচালনার কারণে। ১৮৮৫ সালে প্রথম ব্যারন চালু করেছিলেন ওটা। আফ্রিকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য দারুণ জনপ্রিয় এ যাদুঘর; এছাড়াও প্রাচীন মিশর এবং মধ্যপ্রাচ্যের নানা আর্টিফ্যাক্টও রয়েছে এখানে।
ডুরেঈদের কথা অনুযায়ী, উদ্দাম, ক্ষেত্রবিশেষে আইনের ভয় না করা একটা সত্তা আছে নিকোলাসের। বোঝা যায়, যাদুঘরের সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনে আইনকে কাঁচকলা দেখাতে পারেন তিনি।
গাদ্দাফির লিবিয়া থেকে দুপ্রাপ্য কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ পাচার করার সময় ডুরেঈদকে তার এজেন্ট হিসেবে কাজে লাগিয়েছিল নিকোলাস। শ্রেষ্ঠ নমুনাগুলো নিজের সংগ্রহে রেখে বাদকবাকিগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয় অভিযানের খরচা ওঠানোর জন্য।
তার আরো একটা অভিযান সম্পর্কে জানতেন দুরেঈদ। সেটাও বেআইনী কাজ। গোপনে ইরাকে ঢুকতে হয়েছিল। সাদ্দাম হোসেনেরে নাকের ডগা থেকে একজোড়া পাথুরে ব্যাসরিলীফ ফ্রীজ উদ্ধার করে আনেন তিনি। ফ্রীজ হলো স্তম্ভ বা কার্নিসের মধ্যবর্তী কারুকার্যময় অংশ। ডুরেঈদ জানিয়েছেন, জোড়ার একটা নাকি পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করা হয়েছে, এসবই কয়েক বছর আগের ঘটনা।
এখন কি নিকোলাস রাজি হবে ফারাও-এর সম্পদের অনুসন্ধানে অভিযানে যেতে? কোনো সন্দেহ নেই, ধরা পড়লে শাস্তি পেতে হবে মিশরের সম্পদ পাচারের দায়ে।
ডুরেঈদ বার বার করে বলেছেন, নিকোলাসের প্রচুর প্রভাবশালী বন্ধু-বান্ধব এবং শুভানুধ্যায়ীদের কারণেই এতো কিছু পারে সে।
সৎ ও পবিত্র থাকার একটা ঝোঁক আছে নিজের মধ্যে, রোয়েন জানে। কথাটা ভেবে আপন মনে হাসলো ও। হারপার নিকোলাস যদি ওকে সাহায্য করতে রাজি হন, সাংঘাতিক ঝুঁকি নিতে হবে তাঁকে। প্রশ্ন হলো, কোনো স্বার্থ ছাড়া কেন কেউ নিজের জীবনের উপর ঝুঁকি নেবে? তাছাড়া, যে কাজটায় তাঁর সাহায্য চাইতে যাচ্ছে, সেটাও কোনো অংশে কম বেআইনী নয়। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি নিয়েই ঘুমিয়ে পড়লো রোয়েন।
এয়ার হোস্টেস ওর ঘুম ভাঙিয়ে সিট বেল্ট বাঁধার তাগিদ দিল। ওদের প্লেন হিথরোতে ল্যান্ড করতে যাচ্ছে।
*
বিমানবন্দর থেকে মা-কে ফোন করলো রোয়েন। মা, আমি রোয়েন! তুই কোথায়? চির আমুদে স্বরে জানতে চান রোয়েনের মা।
হিথরোতে। তোমার সাথে কিছুদিন থাকবো। কোনো সমস্যা নেই তো?
শোনো মেয়ের কথা! সমস্যা আবার কী? ভর্ৎসনার সুরে বলেন মহিলা।
কোন্ রেলে আসবি?
সাতটার সময়। কিংস ক্রস ট্রেনে।
ঠিক আছে। আমি স্টেশনে আসবো তোকে নিতে। কী ঘটেছে রে? ডুরেঈদের সঙ্গে কোনো ঝগড়া-ঝাটি? আমি জানতাম–ওই লোকের বয়স তোর বাপের সমান!
বেশ কিছু সময় নীরব রইলো রোয়েন, এটা ঠিক ব্যাখ্যাদানের সময় নয়। দেখা হলে সব বলবো।
নভেম্বরের বিষণ্ণ শীতল সন্ধ্যায় প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় ছিলেন জর্জিনা লুমলি, রোয়েনের মা। পায়ের কাছে সধৈর্য বসে পোষা কুকুর ম্যাজিক। ঠিক যেনো মানিকজোড়। ট্রায়াল কাপে হোক, কিংবা অন্য সময়ে, ম্যাজিক জর্জিনার সঙ্গে থাকবেই। রোয়েনের মনে অদ্ভুত এক শান্তি বোধ হয়, যেনো বহুদিন পর বাড়ি ফিরেছে।
ওর গালে চুমু খেয়ে স্বাগত জানালেন জর্জিনা। কাদা মাখা ল্যান্ড-রোভারের দিকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন মেয়েকে।
ম্যাজিকও লেজে নেড়ে স্বাগত জানালো রোয়েনকে।
বেশ কিছুক্ষণ নীরবে গাড়ি চালানোর পর একটা সিগারেট ধরিয়ে জর্জিনা বললেন, ডুরেঈদের খবর বল।
কান্নায় ভেঙে পড়লো রোয়েন। এ ক-দিনের সমস্ত কান্না যেনো পথ খুঁজে পেল, দুঃখ শোক উথলে বের হলো ওর ভেতর থেকে। ডুরেঈদের শেষ কৃত্যানুষ্ঠানের বর্ণনা দেওয়ার সময় জর্জিনা মেয়েকে এক হাতে সান্ত্বনা দিলেন।
জর্জিনার কটেজে যতক্ষণে ফিরলো ওরা, সমস্ত শোক ভুলে একটু হালকা হয়েছে রোয়েন। মায়ের তৈরি খাবার দিয়ে বেশ আয়েশ করে ডিনার করলো দু জন। কবে শেষ এমন খাবার খেয়েছে, রোয়েন ভুলেই গিয়েছিল।
এখন কী করবে? গ্লাসে পানীয় ঢেলে দিতে দিতে জানতে চাইলেন জর্জিনা।
সত্যি করে বললে–আমি জানি না, মনে মনে রোয়েন ভাবে, মিথ্যে কথা বলতে গেলে কেনো যেনো সবাই এ কথাটাই বলে! মিউজিয়াম থেকে ছয় মাসের ছুটি পেয়েছি, প্রফেসর ডিক্সন ইউনিভার্সিটিতে একটা লেকচারের জন্য আয়োজন করে রেখেছেন। মোটামুটি এ তো।
ঠিক আছে। যতোদিন ইচ্ছে থাক না তুমি। চিরন্তন মাতৃস্নেহ ঝরে পড়লো জর্জিনার কণ্ঠ থেকে।
