আকাশ মেঘে ঢাকা পড়ে যাওয়ায় ওদের উপর দ্রুত নেমে এলো আফ্রিকান রাত্রি। ঘনায়মান সন্ধ্যায় কোনো রকম সতর্ক হওয়ার সুযোগ না দিয়ে আরেকটা বিপদ লাফ দিয়ে পড়লো ওদের উপর। এক মুহূর্ত আগে নদীর মর্পণ বিস্তৃতি ধরে দ্রুতগতিতে ছুটছিল বোট, পর মুহূর্তে ওদের সামনে উন্মুক্ত হলো পানি, নদী ওদেরকে শূন্যে ছুঁড়ে দিল। তারপর মনে হলো অনন্তকাল ধরে খসে পড়ছে ওরা, অথচ পতনটা ত্রিশ ফুটের বেশি নয়। জলপ্রপাতের নিচে পড়ে ডুবে গেল ওরা, বোট, কার্গো আর আরোহী জট পাকিয়ে একাকার। নদী এখানে স্রোতবিহীন, বিরাট একটা জায়গা জুড়ে ফুঁসছে, আবার বিপুল বেগে ধাবিত হওয়ার জন্য এক করছে যেনো সমস্ত শক্তি।
একটা বোট উল্টো হয়ে ভাসছে। বাকি বোটগুলোর আরোহিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়ে দ্রুত বৈঠা চালিয়ে ছুটে গেল সেদিকে। পানি থেকে তুলে নিল ডুবন্ত আরোহিদের, উদ্ধার করলো ভাসমান বৈঠা আর ইকুইপমেন্ট। সবার মিলিত চেষ্টায় বোটটাকেও সোজা করা সম্ভব হলো। ইতোমধ্যে গিরিখাদ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেছে।
ক্রেটগুলো গুনতে হয়, নির্দেশ দিল নিকোলাস। কয়টা হারালাম?
খানিকপর ড্যানিয়েলের চিৎকার শুনে নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে হলো নিকোলাসের। সব মিলিয়ে তেরোটা ক্রেট! কোনো বাক্সই পানিতে পড়ে নি, কৃতিত্বটা আসলে কার্গো নেটের। তবে সবাই ওরা সাংঘাতিক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, ভেজা শরীরে কাঁপছে। এ অন্ধকারে এগোনোর চেস্টা আত্মহত্যা করতে চাওয়ার নামান্তর। কাছাকাছি বোটের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে মেকের চোখে তাকালো নিকোলাস।
মেক বলল, পাহাড়ের ওদিকটার একটা ভাজে পানি খানিকটা শান্ত। হ্রদের লেজের নিকটা হাত তুলে দেখালো সে। রাত কাটানোর জন্য কার্নিস পাওয়া যেতে পারে।
ঠিক ভাঁজ নয়, পাহাড়ের গায়ে সরু একটা ফাটল দেখলো ওরা। ফাটলটার মুখেই অ্যাবস্ট্রাক্ট শিল্পকর্মের মতো উদ্ভট আকৃতির একটা গাছ, বেশ অনেকগুলো শাখা, তবে একটাতেও কোনো পাতা নেই। ওটায় বোটের রশি বাঁধল ওরা। রশির দৈর্ঘ্য কমবেশি রাখা হলো, ফলে বোটগুলো পাশাপাশি বেসে থাকছে। গরম খাবার বা পানীয় কল্পনাও করা যায় না, বেয়নেটের ডগা দিয়ে টিনের কৌটা খুলে শুকনো কিছু খাবার মুখে দিয়ে সন্তষ্ট থাকতে হলো।
নিজের বোট থেকে লাফ দিয়ে নিকোলাসের বোটে চলে এলো মেক, বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে কথা বলল কানে কানে। এই মাত্র রোল কল করলাম। জলপ্রপাত থেকে পড়ার সময় আরো একজনকে হারিয়েছি আমরা। এখন আর তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
লীডার হিসেবে আমি বোধহয় ভালো করছি না, বলল নিকোলাস। কাল সকাল থেকে তুমি সামনে থাকবে।
তুমি দায়ী নও। নিকোলাসের কাঁধে চাপ দিল মেক। এরচেয়ে ভাল করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। দায়ী আসলে শেষ ওয়াটারফলটা… থেমে গেল সে, দু জনই ওরা অন্ধকারে কান পেতে জলপ্রপাতের গর্জন শুনছে।
কতদূর এলাম আমরা? জানতে চাইলো নিকোলাস। আর কতদূর যেতে হবে?
বলা প্রায় অসম্ভব, তবে আমার ধারণা অর্ধেক দূরত্ব পেরিয়ে এসেছি। কাল দুপুরের মধ্যে সীমান্তে পৌঁছে যাব।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর মেক জিজ্ঞেস করলো, ক তারিখ আজ?
ভুলে গেছি। রোলেক্সটা চোখের সামনে তুলে আলোকিত ডায়ালে তাকালো নিকোলাস। গুড গড! আজ ত্রিশ তারিখ!
তোমার পিক-আপ এয়ারক্রাফট পরশু রোজিরেস এয়ারস্ট্রিপে পৌঁছবে, মনে করিয়ে দিল মেক।
হ্যাঁ, পয়লা এপ্রিলে, বলল নিকোলাস। আমরা সময় মতো পৌঁছতে পারব তো?
উত্তরটা তোমার কাছ থেকে চাই আমি, বলল মেক, কিন্তু হাসছে না।
তোমার পাইলট কতটুকু বিশ্বস্ত? পৌঁছতে দেরি করার আশঙ্কা কতটুকু?
জেনি প্রফেশন্যাল, পৌঁছতে কখনোই দেরি করেন না, জোর দিয়ে বলল নিকোলাস। আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। খানিক পর জিজ্ঞেস করলো, রোজিরেস পৌঁছে তোমাকে যদি ট্রেজারের ভাগ দিয়ে দিই, ওগুলো নিয়ে কী করবে তুমি? একটা ক্রেটে জুতোর ডগা ঠেকালো নিকোলাস। সঙ্গে করে নিয়ে যাবে?
তোমাদেরকে প্লেনে তুলে দেওয়ার পর কর্নেল নগুকে পেছনে ফেলার জন্য আরো কিছুদূর ছুটতে হবে আমাদের, কাজেই অতিরিক্ত বোঝা বইতে রাজি নই। আমার ভাগ তোমার সঙ্গে থাকবে। বিক্রিও করবে তুমি এখানে যুদ্ধ চালাবার জন্য নগদ টাকা দরকার আমার।
তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?
বিশ্বাস না করলে বন্ধু কিসের!
বন্ধুদের ঠকানো সবচেয়ে সহজ-ওরা বেঈমানী আশা করে না, বলল নিকোলাস, শুনে ওর কাঁধে হালকা ঘুসি মারলো মেক।
খানিকটা ঘুমিয়ে নাও। কাল হয়তো বিকেল পর্যন্ত একটানা বৈঠা চালাতে হবে। বোটের উপর দাঁড়ালো মেক। লাফ দিয়ে পাশের বোটে চলে গেল। টিসেতার জন্য অপেক্ষা করছে ওখানে।
রোয়েনের দিকে ঝুঁকে হাত বাড়াল নিকোলাস। টেনে এনে ওর দুই হাঁটুর মাঝখানে বসাল, রোয়েন বাধা না দিয়ে হেলান দিল ওর বুকে, ভেজা কাপড়ে একটু একটু কাঁপছে। খানিক পর কাঁপুনিটা বন্ধ হয়ে গেল। রোয়েন ফিসফিস করে বলল, দেখা যাচ্ছে আপনি একটা হটওয়াটার বটল।
আমাকে খুব কাছে সবসময় থাকতে দেওয়ার এটা একটা মস্ত সুবিধে, নিঃশব্দে হাসছে নিকোলাস, রোয়েনের মাথায় আদর করে হাত বুলাচ্ছে। জবাবে রোয়েন আর কিছু বলল না, তবে নিতম্ব ঘষে আরো একটা কাছে সরে এলো। আরো খানিক পর ঢিল পড়লো ওর পেশীতে, ঘুমিয়ে পড়লো নিকোলাসের বুকে মাথা রেখে।
