আমাদের বোটের কথা কর্নেল জানে না, জানে কি? নিকোলাসের চোখে কঠিন দৃষ্টি।
জানার তো কথা নয়, বলল মেক। কিন্তু আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে অনেক কথাই তার জানার কথা ছিল না, অথচ জেনে ফেলেছে। আমাদের শ্রমিকদের মধ্যে তার হয়তো কোনো ইনফর্মার ছিল। কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করলো সে, তারপর আবার বলল, কর্নেলের কাছে এখনো হেলিকপ্টার আছে, নিকোলাস। মেঘ কেটে গেলেই নদীতে আমাদেরকে দেখতে পাবে।
নদীই আমাদের একমাত্র এস্কেপ রুট। আশা করা যাক আবহাওয়ার কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।
সবগুলো বেটে বাতাস ভরার কাজ শেষ হলো। একটা বোটে তোলা হলো টিসেকে, স্ট্রেচার সহ। তারপর ধরাধরি করে বোটের কাছে নিয়ে আসা হলো আহত দু জন গেরিলাকে, বাকি সবাই হাঁটতে পারছে। কাজটা শেষ হতে আবার নিকোলাসের কাছে ফিরে এলো মেক। তোমার রেডিও দেখছি ফিরে পেয়েছ, ক্যারিয়ার স্ট্র্যাপের সঙ্গে ফাইবার গ্লাস কেসটা নিকোলাসের কাঁধে ঝুলতে দেখে বলল সে।
এটা ছাড়া বিপদ এড়ানো যাবে না, জবাব দিল নিকোলাস। মেক, তুমি টিসেরবোটে থাকো। সামনের বোটে আমি রোয়েনকে নিয়ে থাকব।
আমাকে সামনে থাকতে দিলে ভালো হত, বলল মেক।
নদী সম্পর্কে কী জানো তুমি? নিকোলাস হাসছে না। এই নদী পথে একমাত্র আমিই আসা-যাওয়া করেছি।
সে তো বহু বছর আগের কথা, বলল মেক।
তখন আরো অনভিজ্ঞ ছিলাম। মেক, তর্ক করো না। আমার পেছনে থাকবে তুমি, তোমার পেছনে ড্যানিয়েল। তোমার গেরিলাদের মধ্যে আর কেউ আছে, এ নদী সম্পর্কে ধারণা রাখে?
আমার সব লোকই ধারণা রাখে, বলে নিজের লোকদের উদ্দেশে তাঁক-ডাক শুরু করলো মেক। চারজন গেরিলা ছুটে এসে বাকি চারটে বোটে উঠে পড়লো। সবাই যার যার বোটে চড়েছে কিনা দেখে নিয়ে, সবার শেষে নিজের বোটে উঠলো নিকোলাস। ওর নির্দেশ প্রত্যেকে বৈঠা হাতে নিল, টিসে আর আহত গেরিলা দু জন। বাদে।
মেক মিছে গর্ব করে নি, গেরিলারা সত্যি সত্যি দক্ষ হাতে বৈঠা চালাচ্ছে। দেখতে না দেখতে নীলনদের মূল স্রোতে গিয়ে পড়লো সাত বোটের ছোট্ট বহরটা।
প্রতিটি বোটে ষোলোজন লোকের জায়গা হবার কথা, সে তুলনায় লোক বা কার্গো কমই তোলা হয়েছে। কোনো বোটেই নয়জনের বেশি লোক নেই। তবে গুপ্তধন ভর্তি ক্রেটগুলো কম ভারী নয়।
সামনে বিপজ্জনক পানি, রোয়েনকে গম্ভীর সুরে বলল নিকোলাস। সেই সুদান সীমান্ত পর্যন্ত। বোটের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ও, হাতে হাল, সামনেটা ভালো করে দেখে নিচ্ছে। ওর পায়ের কাছে খুঁড়ি মেরে বসে রয়েছে রোয়েন, ঝুলে আছে একটা সেফটি স্ট্র্যাপ ধরে।
জলপ্রপাতের নিচে জোরালো স্রোতটাকে আড়াআড়িভাবে পেরিয়ে এলো ওরা, সরু একটা ফাঁক বরাবর বহরটাকে এক লাইন নিয়ে এলো, ওই পথে পশ্চিম দিকে ছুটছে নদী। আকাশের দিকে তাকালো ও, দেখলো পানি ভর্তি কালো মেঘ খুব নিচে নেমে এসেছে যেনো পাহাড়-প্রাচীনের চূড়াগুলোকে ছুঁয়ে দেবে।
ভাগ্য বোধহয় আমাদেরকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রোয়েনকে বলল ও। এই আবহাওয়ায় হেলিকপ্টার নিয়ে বের হলেও ওরা আমাদেরকে খুঁজে পাবে না।
হাতে বাধা রোলেক্সের দিকে তাকালো নিকোলাস, পানির ছিটা লেগে ঝাপসা হয়ে আছে কাঁচ। সন্ধ্যে হতে আরো দু ঘণ্টা। পেছন দিকে তাকালো ও। বাকি বোটগুলো ডুবুডুবু হয়ে অনুসরণ করছে ওদেরকে। বোটগুলো হলুদ রঙের, গিরিখাদের ঘাঢ় ছায়া আর কুয়াশার ভেতরও পরিষ্কার দেখা যায়। একটা হাত তুলে নাড়লো নিকোলাস, উত্তরে দ্বিতীয় বোট থেকে মেকও তাই করলো। দাড়ির ভেতর তার হাসি দেখতে পেল নিকোলাস।
নদী এরপর এঁকেবেঁকে, মোচড় খেয়ে এগিয়েছে। কোথাও কোথাও বোল্ডারের মাঝখান দিয়ে সরু পথ ধরে এগুতে হলো ওদেরকে। স্রোত এতো তীব্র, বৈঠা না চালালেও বোট ছুটছে। গিরিখাদের ভেতর বর্ষার পানি ঢোকায় নদীর উপর জেগে থাকা অনেক ক্ষুদে দ্বীপ বা বড় আকারের বোন্ডার ডুবে গেছে, তবে সারফেসের ঠিক নিচেই রয়েছে ওগুলো, বোঝা যাচ্ছে স্রোত বাধা পেয়ে ফেনা তৈরি হতে দেখে। বন্যার পানি দু দিকের পাড় ধরেই অনেক উপরে উঠে গেছে, উপ-খাদের প্রাচীর ছুঁই-ছুই করছে। একটা বোট যদি উল্টে যায়, বা বোট থেকে কেউ যদি পড়ে যায়, পিছিয়ে গিয়ে বোট বা আরোহীকে উদ্ধার করা অন্তত এ নদীতে সম্ভব নয়।
বোটের পেছনে দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়ে আছে নিকোলাস। মনে মনে শিউরে উঠলো, কারণ খানিক দূর থেকে শুরু হয়েছে নদীর উন্মত্ততা। ওর গোটা জগৎ উপ খাদের আকাশ ছোঁয়া প্রাচীরের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়লো। মুখে পানির ছিটা লাগছে, নাকি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, খেয়াল থাকলো না। নদীর নিচে প্রায় খাড়া ঢাল রয়েছে, ফলে তীব্র স্রোত বোটগুলোকে উল্টে দিতে চাইছে। ঢালের নিচে সমতল সারফেসে নামার সময় একটা বোট থেকে দু জন ছিটকে পড়লো। একজন লোককে দ্রুত ধরে ফেলায় বেঁচে গেল সে, কিন্তু চৌচির হয়ে গেল খুলি। ডুব দেওয়ার পর আর সে উঠলো না। কেউ কথা বলল না বা শোক প্রকাশ করলো না। সবাই যে যার প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত।
নদীর গর্জনে কান পাতা দায়। সেই শব্দকে ছাপিয়ে উঠলো রোয়েনের চিৎকার, নিকোলাস, হেলিকপ্টার!
পাহাড়-প্রাচীরের মাথায় নেমে আসা কালো মেঘের দিকে তাকালো নিকোলাস, দেখতে না পেলেও এঞ্জিলের আওয়াজ ঢুকলো কানে। মেঘের আড়ালে! পাল্টা চিৎকার করলো ও, হাতের উল্টোপিঠি দিয়ে পানির ছিটা আর বৃষ্টির ফোঁটা মুছলো চোখ থেকে। এই মেঘ-বৃষ্টির মধ্যে ওরা আমাদেরকে দেখতে পাবে না।
