ঘুরে দৌড় দিলেন ফন শিলার। টানেল বেয়ে উঠে এলেন ল্যান্ডিঙে, ওখানে জেনারেটরটা এখনো সচল রয়েছে। কোথায় যাচ্ছেন জানেন না তিনি, শুধু জানেন সিঙ্কহোলের কাছ থেকে যতোটা সম্ভব দূরে পালাতে হবে তাঁকে। সামনে খোলা কোনো প্যাসেজ পেলেই হলো, ছুটছেন সেটা ধরে। মাঝখানের সিঁড়িটার গোড়ায় পৌঁছে টানেলের এক কোণে ধাক্কা খেলেন, ছিটকে পড়লেন মেঝের উপর। কপালটা আলুর মতো ফুলে উঠলো।
কিছুক্ষণ পর সোজা হলেন তিনি, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন। দিশেহারা ও বিভ্রান্ত, কল্পনার চোখে অবাস্তব সব দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন। নিজেই বুঝতে পারছেন, পাগল হতে আর বেশি দেরি নেই তার। বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছেন, এক সময় আর উঠে দাঁড়াবার শক্তি পেলেন না। তবু থামছেন না, হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছেন।
খাড়া শ্যাফট বেয়ে টাইটার গ্যাস ট্র্যাপে নামার সময় হড়কে গেল শরীরটা। ধাপ বেয়ে গড়িয়ে নিচে নামলেন। তারপর অনেক কষ্টে দাঁড়ালেন। টলতে টলতে কীভাবে তোরণটার কাছে পৌঁছলেন, নিজেও বলতে পারবেন না। তোরণ পেরিয়ে ফারাও মামাসের সমাধিতে ঢুকলেন তিনি।
তারপরই ম্লান হয়ে গেল বালবের আলো। হলুদ আভা ছড়াচ্ছে শুধু। আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেললেন ফন শিলার। এরপর কী ঘটবে জানেন। খানিক পর ঘটলও তাই, নিভে গেল বালব, পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেল সমাধি। আবার তিনি ছুটলেন, তবে কয়েক পা এগুবার পরই ধাক্কা খেলেন কিছু একটার সঙ্গে, ছিটকে পড়লেন।
খুলি ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। পড়ার পর আর নড়ছেন না তিনি। কতক্ষণ পর মৃত্যু আসবে? ভাবছেন তিনি। কয়েক দিন লাগতে পারে, এমন কী কয়েক সপ্তাহ লাগাও বিচিত্র নয়। কিসের সঙ্গে ধাক্কা খেলেন বোঝার জন্য অন্ধকারে হাতড়াচ্ছেন। গাঢ় অন্ধকার, কাজেই হাত দিয়ে ছোঁয়ার পরও মামোসের পাথুরে শবাধারটা চিনতে পারলেন না। নিরাপদ মনে করে হোক বা অন্য কিছু ভেবে, কফিনটার ভেতর ঢুকলেন ফন শিলার। চুপচাপ শুয়ে থাকলেন তিনি, তাঁর চারদিকে একজন প্রাচীন সম্রাটের সমাধি সম্পদের স্তূপ। ধীর, অনিস্বীকার্য মৃত্যু অপেক্ষা করছে ফন শিলারের জন্য।
৮. সেন্ট ফুমেনথিয়াসের মঠ
সেন্ট ফুমেনথিয়াসের মঠ খালি হয়ে গেছে। গিরিখাদের নিচে তুমুল : যুদ্ধের আওয়াজ শুনে সন্ন্যাসীরা নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়েছেন।
তোরণশোভিত খালি উদ্যান ধরে ছুটলো নিকোলাস, দম নেয়ার জন্য থামলো সিঁড়ির মাথায় এসে। এ সিঁড়ি নীলনদের লেভেল পর্যন্ত নেমে গেছে, ওখানেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে বোটগুলো। হাঁপাচ্ছে নিকোলাস, ওর নিচের গভীর বেসিনে চোখ বুলাচ্ছে, যেখানে সূর্যকিরণ প্রায় সময় পৌঁছতেই পারে না। জোড়া জলপ্রপাত থেকে ছড়িয়ে পড়া রূপোলি জলকনা সচল মেঘের মতো খাদের গভীরতা ঢেকে রেখেছে, জানার কোনো উপায় নেই রোয়েন আর ড্যানিয়েল ওর জন্য ওখানে অপেক্ষা করছে কিনা, নাকি ট্রেইল ধরে মঠে পৌঁছুবার সময় তারা কোনো বিপদে পড়েছে।
তারপর হঠাৎ রোয়েনের গলা ভেসে এলো নিচে থেকে, ওর নাম ধরে ডাকছে। ঘন কুয়াশার মতো সচল জলকণার নিচ থেকে আসছে ডাকটা।
নিকোলাস, ওহ, নিকোলাস। তারপর সিঁড়ির ধাপে দেখা গেল ওকে, দ্রুত উঠে আসছে। থ্যাঙ্ক গড! ধরেই নিয়েছিলাম আপনাকে আর পাব না! ছুটে এসে নিকোলাসের গায়ে আছাড় খেলো ও। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল ওরা, রোয়েন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
বাকি সবাই কোথায়? খানিক পর নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।
নিকোলাসের হাত ধরে সিঁড়ির ধাপে পা রাখলো রোয়েন। নিচে আসুন। সবাই ওরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। ড্যানিয়েল আর মেক বোটে বাতাস ভরেছেন। ক্রেটগুলো তোলা হচ্ছে এখন।
টিসে?
ভালো আছে।
সিঁড়ির শেষ কটা ধাপ টপকে এলো ওরা। শেষবার যখন দেখেছিল নিকোলাস, তারচেয়ে দশ ফুট উঁচু হয়েছে এখানে নীলনদ। নদী এখন উন্মত্ত, গতিও তীব্র। সচল জলকণার ভেতর দিয়ে কোনোরকমে পাহাড়-প্রাচীরের গা দেখা যায়।
সাতটা রাবার বোট কিনারায় টেনে আনা হয়েছে। এরই মধ্যে চারটেতে বাতাস ভরা হয়েছে, কমপ্রেসড এয়ার সিলিন্ডারের সাহায্যে বাকিগুলোতেও বাতাস ভরার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বাতাস ভরা চারটে বোটে ক্রেটগুলো তোলার পর এ মুহূর্তে সেগুলো নাইলন কার্গো নেট দিয়ে সুরক্ষিত করা হচ্ছে। এগিয়ে এসে মেকের কাঁধে হাত রাখলো নিকোলাস, বলল, ধন্যবাদ, বন্ধু। তোমার গেরিলারা বীরের মতো লড়েছে। তুমি আমার জন্য অপেক্ষাও করেছ। পাহাড়-প্রাচীরের সরু কার্নিসে শুয়ে-বসে থাকা গেরিলাদের দিকে তাকালো ও। কয়জনকে হারিয়েছ তুমি, মেক?
তিনজন মারা গেছে, ছয় জন আহত হয়েছে, বলল মেক। আরো বেশি ক্ষতি হতে পারত, কর্নেল ন যদি আরো জোরে ধাওয়া করতেন।
তবু এ-ও অপূরণীয় ক্ষতি, বলল নিকোলাস।
হ্যাঁ, কোনো মৃত্যুরই ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়, সায় দিল মেক।
মেক, তোমার বাকি লোকজন কোথায়?
সীমান্তের দিকে রওনা হয়ে গেছে। শুধু বোটগুলো হ্যাঁন্ডেল করার জন্য কয়েকজনকে রেখে দিয়েছি। নিকোলাসের হাত ধরে কয়েক পা হেঁটে এলো মেক, গলা খাদে নামিয়ে বলল, বিপদ এখনো কাটে নি, নিকোলাস।
জানি, মাথা ঝাঁকালো নিকোলাস। কর্নেল নগু এখনো বেঁচে আছে।
শুধু তাই নয়, বলল মেক। অন্তত পুরো একটা কোম্পানি নিয়ে নদীর ভাটি পাহারা দিচ্ছে। আমার স্কাউটরা রিপোর্ট করেছে, দুই পাড়ের ট্রেইলের পজিশন নিয়ে আছে তারা।
