বুড়ো বলে কি! টানেলের মেঝেতে ঘষা খেয়ে এখনো পিছু হটছেন নাহুত।
সোনার বাঁকা লাঠিটা অত্যন্ত ভারী, সেটা দিয়ে নাহুতের কাঁধে বাড়ি মারলেন ফন শিলার। চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন নাহুত। দ্বিতীয় বাড়িটা লাগলো তাঁর নাকে, নরম হাড় ভেঙে গেল, ফুটো দিয়ে হড়হড় করে রক্ত বের হচ্ছে। চিৎকার করছেন ফন শিলার। মেরে ফেলব। মেরে ফেলব। এখনো কথা শোন, তা না হলে মেরে ছাতু বানিয়ে ফেলব। আক্ষরিক অর্থে বানাচ্ছেনও তাই, একের পর এক আঘাত করে রক্তাক্ত করছেন নাহুতকে।
থাকুন! আহত ঘোড়ার মতো চিচি করছেন নাহুত। না, প্লিজ, থামুন! শুনব, যা বলেন শুনব! দয়া করে আর মারবেন না! মেঝেতে ঘষা থেকে থেকে শিলারের কাছ থেকে সরে যাচ্ছেন, কোমর সমান পানিতে পৌঁছে থামলেন। আমাকে তৈরি হবার সময় দিন, হের ফন শিলার প্লিজ।
লাঠিটা আবার মাথার উপর তুলে এগিয়ে এলেন ফন শিলার। এক্ষুনি! আমার হুকুম, এক্ষুনি যান। আমি জানি চেষ্টা করলে টানেলের খোলা মুখ আপনি খুঁজে পাবেন। আমার ধারণা ওখানে কিছু বাতাস আটকা পড়েছে, শ্বাস নিতে পারবেন। তারপর বেরিয়ে যাবেন বাইরে। যান যান!
আঁজলা ভরা পানি তুলে মুখের রক্ত ধুলেন নাহুত। একটু সময় দিন, কাতর অনুনয় করলেন তিনি। জুতো আর কাপড়-চোপড় খুলতে হবে। আসলে সময়। নিতে চাইছেন তিনি।
কিন্তু পানি থেকে তাকে উঠতে দেবেন না ফন শিলার। যা করার ওখানে দাঁড়িয়েই করুন, নির্দেশ দিলেন, মারমুখো ভঙ্গিতে আবার লাঠিটা তুললেন মাথার উপর।
নাহুত বুঝতে পারলেন সোনার লাঠিটা মাথায় নেমে এলে খুলিটা গুঁড়ো হয়ে যাবে। পানির কিনারায় হাঁটু ডুবে গেছে তাঁর, এক পায়ে দাঁড়িয়ে অপর পায়ের জুতো খুলছেন। তারপর, অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধীরে ধীরে শুধু আন্ডার প্যান্ড ছাড়া সমস্ত কাপড় গা থেকে খুলে ফেললেন। তার কাঁধের চামড়া থেঁতলে গেছে লাঠির আঘাতে, পিঠ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। বুড়ো শয়তান বলে মনে মনে গাল দিচ্ছেন ফন শিলারকে। বুঝতে পারছেন, অন্তত নির্দেশ পালনের ভান না করে কোনো উপায় নেই। পানির নিচে ডুব দেবেন, টানেল ধরে কিছু দূর এগোবেন, পাশের দেয়াল ধরে অপেক্ষা করবেন কিছুক্ষণ, তারপর মাথা তুলে আবার ফিরে আসবেন।
গো! হুঙ্কার ছাড়ছেন ফন শিলার। আপনি আমার সঙ্গে চালাকি করছেন। সময় নষ্ট করে কোনোই লাভ নেই। ভুলেও ভাববেন না পানি থেকে আপনাকে আমি উঠতে দেব।
পানির আরো নিচে নেমে এলেন নাহুত, এবার তার বুক ডুবে গেল। বড় করে নিঃশ্বাস ফেললেন কয়েকবার। তারপর দম আটকে ডুব দিলেন সারফেসের নিচে। কূলের কিনারায় অপেক্ষা করছেন ফন শিলার, গাঢ় পানির নিচে নাহুতকে দেখতে পাচ্ছেন না। শুধু লক্ষ্য করলেন নাহুতের রক্ত সারফেসের রঙ বদলে দিচ্ছে।
এক মিনিট পার হলো। তারপর হঠাৎ পানির নিচে একটা তীব্র আলোড়ন উঠলো। গাঢ় সারফেসের উপর খাড়া হলো একটা ফর্সা বাহু, হাত ও আঙুল আবেদনের ভঙ্গিতে নড়ছে। তারপর আবার ধীরে ধীরে ডুবে গেল পানির নিচে।
গলা লম্বা করে সামনে এক পা বাড়লেন ফন শিলার। নাহুত! রাগে কাঁপছেন তিনি। আবার চালাকি শুরু করেছেন?
পানির নিচে আরেকটা জোরালো আলোড়ন উঠলো। সারফেসের নিচে আয়নার মতো কী যেনো ঝিক করে উঠলো।
নাহুত! গলা ফাটালেন ফন শিলার।
যেন তার ডাকে সাড়া দিয়েই পানির উপর মাথাচাড়া দিলেন নাহুত। তাঁর ত্বক মোমের মতো হলদেটে দেখাচ্ছে, সমস্ত রক্ত যেনো শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে, মুখটা চিৎকার করার ভঙ্গিতে পুরাপুরি খোলা, অথচ কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। তার চারপাশের পানি টগবগ করে ফুটছে, যেনো বড় আকৃতির মাছের একটা ঝাঁক পানির নিচে ভোজনে মত্ত। ফন শিলার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন, নাহুতের মাথার চারপাশ থেকে গাঢ় একটা ঢেউ জাগলো পানিতে, সেই সঙ্গে লাল গোলাপ পাপড়ির রঙ পেল সারফেস। প্রথম এক মুহূর্ত ফন শিলার বুঝতেই পারলেন না যে ওটা আসলে নাহুতের রক্ত।
তরপর তিনি দেখতে পেলেন সরীসৃপ আকৃতির লম্বাটে প্রাণীগুলো ছুটোছুটি করতে পানির তলায়, মোচড় খাচ্ছে, পেঁচিয়ে ধরছে নাহুতকে, কামড় দিয়ে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলছে তার মাংস। একটা হাতাবার উঁচু করলেন নাহুত, এবার সেটা শিলারের দিকে লম্বা করলেন, যেনো সাহায্যের আশায়। হাতটা অক্ষত নয়, কয়েক জায়গায় অর্ধচন্দ্র আকৃতির ক্ষত দেখা গেল-মাংস তুলে নেওয়া হয়েছে।
আতঙ্কে চেঁচাচ্ছেন ফন শিলার, পুল থেকে পিছিয়ে আসছেন। নাহুতের চোখ দুটো বিশাল দেখাচ্ছে, দৃষ্টিতে অভিযোগ। শিলারের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি, গলা থেকে উন্মত্ত যে চিৎকারটা বের হচ্ছে সেটাকে মানুষের বলে চেনার উপায় নেই।
বিশাল এক ট্রপিক্যাল ঈল সারফেসের নিচ থেকে মাথা তুললাম, হ্যাঁ করে আছে, ভাঙা কাঁচের মতো দাঁতগুলো চকচক করছে। খোলা চোয়ালে পুরে নিল নাহুতের গলা। কুৎসিত প্রাণীটাকে গলা থেকে ছাড়াবার কোনো চেষ্টাই করলেন না। নাহুত। প্রকান্ড ঈল মোচড় খাচ্ছে, ঘন ঘন কুণ্ডলী পাকাচ্ছে, দাঁত দিয়ে বিচ্ছিন্ন। করতে চাইছে গলার মাংস, আর নাহুতের চোখ জোড়া কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তাকিয়ে আছেন শিলারের দিকে।
ধীরে ধীরে নাহুতের মাথা আবার পানির নিচে তলিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ সারফেসের তলায় আলোড়িত হলো পানি, মাঝে মধ্যে দু একটা ঈলের চকচকে ও পিচ্ছিল গা ভেসে উঠলো পানির উপর। তারপর ক্রমশ শান্ত হয়ে এলো পানি, এক সময় আয়নার মতো স্থির ও মসৃণ দেখালো আবার।
