সামান্য কিছু অলঙ্কার এখনো ফেলে দেন নি ফন শিলার। মামোসের সোনার তৈরি বাঁকা লাঠিটা এখনো তার হাতে। স্যুটের পকেটগুলো ফুলে রয়েছে গহনায়। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ধমকের সুরে জানতে চাইলেন, হানশিত কোথায়? আমাকে ফেলে আপনি ছুটছিলেন কেন? ইডিয়েট, বিপদটা বুঝতে পারছেন না? টানেল থেকে বের হবার উপায় কী?
আমি কী করে জানব… রেগেমেগে শুরু করলেও, ফন শিলারের পেছনের দেয়ালে চক মার্ক দেখে থেমকে গেলেন নাহুত। আগেও এগুলো লক্ষ্য করেছেন, তবে তাৎপর্যটুকু ধরতে পারেন নি। চিন্তা করবেন না, হারপার নিকোলাস আমাদের জন্য চিহ্ন রেখে গেছে। আসুন! টানেল ধরে দ্রুত পায়ে এগুলেন তিনি। প্রতিটি বাকে পৌঁছে চক মার্ক দেখে নিচ্ছেন।
এ ভাবে মাঝখানের সিঁড়িতে পৌঁছলেন ওঁরা, তবে হানশিত ওঁদেরকে ছেড়ে যাবার পর ইতোমধ্যে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে লম্বা গ্যালারিতে নেমে এলেন দু জন, নামার সময় শুনতে পেলেন নদীর হিসহিস আওয়াজটা ক্রমশ বাড়ছে মনে হচ্ছে ঘুমন্ত একা ড্রাগন নিঃশ্বাস ফেলছে।
নাহুত ছুটলেন। হোঁটচ খেতে খেতে তার পিছু নিলেন ফন শিলার, প্রাচীন পা দুটো ভয়ে দুর্বল হয়ে গেছে।
দাঁড়ালো! প্লিজ, দাঁড়ান! সুরটা এখন আর ধমকের নয়, করুণা ভিক্ষার; কিন্তু শুনেও শুনছেন না নাহুত। প্লাস্টার-সীলড ডোরওয়ের কাছে পৌঁছে মাথা নিচু করলেন তিনি, দেখলেন ল্যান্ডিঙের উপর জেনারেটরটা এখনো চলছে, সারি সারি বালবও জ্বলছে ছাদের উপর।
ছুটে বাঁক ঘুরলেন নাহুত, তাঁর নিচে টানেলটা ডুবে গেছে বুঝতে পেরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সিঙ্কহোল বা ভাসমান সেতুর কোনো চিহ্নমাত্র নেই কোথাও, পন্টুনগুলো কম করেও পঞ্চাশ ফুট পানির নিচে ডুবে গেছে। ডানডেরা নদী, সহস্র বছরের প্রহরী, আবার তার দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। গাঢ় ও দুর্ভেদ্য, সমাধির প্রবেশপথ সীল করে দিয়েছে, ঠিক যেভাবে চার হাজার বছর আগে দিয়েছিল। হে আল্লাহ! হে আল্লাহ! আমাদের উপর রহম করো! ফিসফিস করছেন নাহুত।
বাঁক ঘুরে এগিয়ে এলেন ফন শিলার, নাহুতের পাশে দাঁড়ালেন। জলমগ্ন শ্যাফটের দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে আছেন দু জনেই। তারপর পাশের দেয়ালে হেলান দিলেন ফন শিলার। আমরা আটকা পড়েছি, বিড়বিড় করলেন তিনি, শুনে দেয়ালে ঘষা খেয়ে বসে পড়লেন নাহুত। নাকি সুরে প্রার্থনা করছেন, অভিমানী শিশুর কান্নার মতো লাগলো শুনতে।
থামুন! হিসহিস করলেন ফন শিলার। প্রার্থনায় কোনো কাজ হবে না। বাঁকা লাঠিটা দিয়ে নাহুতের পিঠে সজোরে আঘাত করলেন। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলেন নাহুত, ক্রল করে পিছিয়ে যাচ্ছেন। বের হওয়ার কোনো না কোনো রাস্তা নিশ্চয়ই আছে, বললেন ফন শিলার। আসুন, খুঁজে বের করি। কোথাও বাঁক থাকলে নিশ্চয়ই ভেতরে বাতাস ঢুকছে। আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে। ব্লোয়ার ফ্যানটা বন্ধ করুন, বাতাস নিজে থেকে নড়ে কিনা বুঝতে হবে।
শিলারের নির্দেশ পেয়ে ছুটলেন নাহুত, ফ্যানটা বন্ধ করলেন।
আপনার কাছে সিগারেট লাইটার আছে, বললেন ফন শিলার, তারপর নিকোলাসের ফেলে যাওয়া কাগজ আর ফটোগ্রাফগুলো দেখালেন। আগুন জ্বালুন। ধোয়া দেখে বুঝতে চেষ্টা করি বাতাস কোন দিকে বইছে।
পরবর্তী দু ঘণ্টা ধরে সমাধির সবগুলো লেভেলে ঘুরে বেড়ালেন ওঁরা, উঁচু করা হাতে ধরে আছেন জ্বলন্ত কাগজ, ধোয়ার গতিপথের উপর নজর রাখছেন। কিন্তু টানেলের কোথাও বাতাসের কোনো নড়াচড়া নেই। ক্লান্ত হয়ে আবার ওঁরা ফিরে এলেন জলমগ্ন শ্যাফটের কিনারায়।
শান্ত পানির ওপারে তাকিয়ে থেকে ফন শিলার বিড়বিড় করলেন, ওটাই একমাত্র পথ।
হানশিত হয়তো ওইপথেই বেরিয়ে গেছে, সায় দেয়ার সুরে বললেন নাহুত।
কিছুক্ষণ আর কোনো কথা হলো না। সমাধির ভেতর সময় বোঝা যাচ্ছে না। নদী নিজের লেভেলে স্থির হয়ে আছে, টানেলের ভেতর সারফেসে কোনো আলোড়ন নেই। মুদু সিঙ্কহোলের নিচে, স্রোত বইছে, তারই কোমল হিসহিস আওয়াজ ভেসে আসছে কানে। অবশেষে নিস্তব্ধতা ভাঙলেন নাহুত, জেরারেটরের ফুয়েল ফুরিয়ে আসছে।
খানিক পর অন্ধকার হয়ে যাবে টানেলগুলো।
আবার কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বললেন না। তারপর অকস্মাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন ফন শিলার। আপনাকে সাঁতরাতে হবে। যেভাবেই হোক শ্যাফটের বাইরে বেরিয়ে লোকজনের সাহায্য চাইতে হবে। আমি আপনাকে অর্ডার করছি!
চোখে অবিশ্বাস, শিলারের দিতে তাকিয়ে থাকলেন নাহুত। দূরত্বটা আন্দাজ করতে পারছেন? টানেলের মুখ একশো গজ দূরে। একশো গজ যদি পার হতে পারি, বাইরে বেরিয়ে বাতাস পাব না-বন্যায় ভরাট হয়ে গেছে নদী।
লাফ দিয়ে সোজা হলেন ফন শিলার, হুমকি দেয়ার ভঙ্গিতে নাহুতের দিকে ঝুঁকলেন। হানশিত ওই পথে বেরিয়ে গেছে। আপনাকেও তাই করতে হবে। সাঁতার কেটে টানেল থেকে বেরিয়ে যাওয়া এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। কর্নেল নগু আর হেলকে নদীর পাশেই কোথাও পাবেন। হেলম্ জানে কী করতে হবে। আমাকে এখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করবে সে।
আপনি একটা উন্মাদ! পিছু হটছেন নাহুত।
ফন শিলারও সামনে বাড়ছেন। আমি আপনাকে হুকুম করছি, নাহুত! আপনি আমার বেতন ভোগী কর্মচারী, ভুলে যাবেন না। আমি যা বলব আপনাকে তাই করতে হবে। আমি আপনার মনিব! নামুন, লাফ দিন পানিতে!
