সামনে তাকিয়ে গহ্বরের এ অংশটুকু চিনতে পারলো নিকোলাস। টাইটার হ্রদের উপর এটা একটা মোচড় বা বাঁক। দু এক মিনিটের মধ্যে ওখানে পৌঁছে যাবে ও। ধারণা করলো, ঝুলন্ত দোলনা আর কপিকলটা নিশ্চয়ই এতোক্ষণে বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে।
ভারসাম্য ঠিক রেখে লগের মাঝখানে সোজা হওয়ার চেষ্টা করলো নিকোলাস, ঘন ঘন পাতা ফেলে চোখ থেকে পানি সরালো। টাইটার হ্রদের উপর জলপ্রপাতের মাথাটা দেখতে পেল, ওর দিকে ছুটে আসছে, নিচে খসে পড়ার জন্য শক্ত করলো নিজেকে।
ওর সামনে ছুটন্ত, দীর্ঘ, মসৃণ জলরাশি উন্মুক্ত হলো, পানির সঙ্গে শূন্যে লাফ দেওয়ার মুহূর্তে নিচের পাথুরে বেসিনটা এক পলকের জন্য দেখতে পেল নিকোলাস। ওর ধারণা ভুল, ঝুলন্ত মাচাগুলো বন্যার তোড়ে এখনো পুরোপুরি ভেসে যায় নি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিচের অংশটা নেই, তবে ওপরের অংশ মাতালের মতো পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে দোল খাচ্ছে, ছুটন্ত পানি প্রায় ছুঁয়ে। অন্তত দু জন লোক ওই ভঙ্গুর কাঠামোয় আটকা পড়ে গেছে, নড়বড়ে কপিকলের একটা খুঁটি ধরে জ্বলে আছে কোনো রকমে।
পলকের জন্য তামাটে বেরেট-এর নিচে স্টীল-রিম চমশা ঝিক করে উঠতে দেখলো নিকোলাস, বুঝতে পারলো খুঁটির মাথার কাছে লোকটা কর্নেল নগু। নগু খুঁটিটার মাথা থেকে লাফ দিয়ে পাহাড়-প্রাচীরের চূড়ায় উঠলেন, অদৃশ্য হয়ে গেলেন নিকোলাসর দৃষ্টিসীমা থেকে। বিপুল জলরাশির সঙ্গে খসে পড়ছিল নিকোলাস, লগটা গোত্তা খাওয়ার ভঙ্গিতে নিচে নেমে ডুব দিল পানিতে। তারপর ওটার ডিগবাজি খাওয়া শুরু হলো, শক্ত ডাল ধরে মাঝখানে জ্বলে রয়েছে ও। মাত্র দু বার ডিগবাজি খেয়ে সোজা হয়ে গেল লগ। স্রোত আবার ওটাকে পেয়ে বসলো।
টাইটার পুল দেখতে পাচ্ছে নিকোলাস। সমাধির প্রবেশপথ, টানেলের মুখটা, পুরোপুরি ডুবে গেছে-পানির সারফেস থেকে এখন সেটা অন্তত পঞ্চাশ ফুট নিচে। উল্লাস অনুভব করলো ও, এখন আর কারো পক্ষে সমাধির ভেতর ঢোকা সম্ভব নয়। ওর দৃষ্টি পাহাড়-প্রাচীরের গা বেয়ে ওপরে উঠলো। অবশিষ্ট মাচাগুলো ভেঙে পড়ছে, ফোকর থেকে বেরিয়ে আসছে বাঁশগুলো। অপর লোকটা এখনো খুঁটির উপর ঝুলছে, তবে এ খুঁটিটা পাহাড়-প্রাচীরের চূড়া পর্যন্ত পৌঁছায় নি। পানি থেকে বিশ ফুট উপরে রয়েছে সে, বাতাসে কাত হওয়া উঁচু বাঁশের আগায় বসা বিড়ালের মতো লাগছে তাকে। খুঁটির নিচের অংশ পানিতে ডোবা, স্রোত ওটাকে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। চোখ ফিরিয়ে নেবে নিকোলাস, খুঁটির উপর থেকে ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকালো লোকটা।
হেলম্! জ্যাক হেলম্! লোকটাকে চিনতে পেরে নিকোলাসের শরীরে যেনো আগুন ধরে গেল। কিশোর উপাসক তামেরের কথা মনে পড়ে গেল পাথর ধসে চাপা পড়ে মারা গেছে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো টিসের ক্ষতবিক্ষত চেহারা। পানিতে পা ছুঁড়ে লগটাকে ঘোরাবার চেষ্টা করলো নিকোলাস, ওই খুঁটির নিচে পৌঁছতে চায়। লম্বা একটা বাঁশ দেখতে পেয়ে তুলে নিল হাতে। বাগিয়ে ধরল ওটা খোঁচা দিল খুঁটির গায়ে ঝুলে থাকা হেলমের নিতম্বে। পাকা আমের মতো খসে পড়লো হেলম, ঝপাৎ করে পানিতে পড়লো।
লগ সোজা করে নিল নিকোলাস, স্রোতের টানে আবার ওটা ছুটছে। হাতের বাঁশটা আবার বাগিয়ে ধরে চারদিকের পানিতে চোখ বুলাচ্ছে ও। ওর একেবারে কাছে পানি থেকে মাথা তুললাম হেলম্, তুলতেই খুলিল উপর বাঁশটা সবেগে নামিয়ে আনলো নিকোলাস।
খুলি নয়, বাঁশটা ফেটে গেল। আবার ডুব দিয়েছে হেলম্। নিকোলাসও বাঁশটা উল্টো করে নিয়ে অপেক্ষা করছে। দ্বিতীয়বারও কাছাকাছি মাথাচাড়া দিল আমেরিকান কসাই। আবার আঘাত করলো নিকোলাস। এবার কপালে লাগলো। খুলি ফাটার আওাজ পেল নিকোলাস। পানির নিচে তলিয়ে গেল হেলম, ঢিল পড়লো নিকোলাসের পেশীতে। কয়েক সেকেন্ড পর চোখের কোণ দিয়ে দেখলো লগের এক প্রান্তে একজোড়া হাত। ঝট করে সেদিকে তাকালো ও। মাথা আর কপাল থেকে হড়হড় করে রক্ত বের হচ্ছে, তারপরও লগে ওঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে হেলম্। এগিয়ে এসে তার হাতের উপর বাঁশ দিয়ে বাড়ি করছে হেলম। এগিয়ে এসে তার হাতের উপর বাঁশ দিয়ে বাড়ি মারলো নিকোলাস। একটা হাতের কব্জি গুঁড়ো হয়ে গেল। পরবর্তী বাড়িটা আবার পড়লো মাথায়। এবার হলুদ মগজ দেখতে পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল নিকোলাস।
পেছনে ফিরে বলল, শব্দ শুনে মনে হয় টুমা ন জিতে গেছে। ফন শিলার আর শয়তান মিশরীয়টার কী খবর, কে জানে।
সমাধিতে আর ঢোকা হচ্ছে না বাবাজিদের। অবশ্য, আবার বাধা দিলে আলাদা কথা। আচমকা চিন্তাটা এলো তার মাথায়। আরে, যখন নদী খুলে গেল, তখন আবার শিলার সমাধিতে ছিলেন না তো? মুচকে হেসে মাথা নাড়লো নিকোলাস।বেশি আশা করে ফেলছি। এতো ন্যায় বিচার নাও হতে পারে!
মঠের উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে, ব্যথায় কাতড়ে উঠছে থেকে থেকে।
*
টানেলের একটা বাঁক ঘুরে ছুটে এলেন নাহুত গাদ্দাবি, ফন শিলারের সঙ্গে ধাক্কা খেলেন। বৃদ্ধ কোনো সাহায্যে আসবেন না, এ কথা জানা সত্ত্বেও তার উপস্থিতিতে এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করলেন তিনি। হানশিত না থাকায় টানেলের এ গোলকধাঁধা ভৌতিক একটা জায়গা হয়ে উঠেছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও পরস্পরকে তাঁরা জড়িয়ে ধরে থাকলের জঙ্গলে পথ হারানো এক জোড়া বালকের মতো।
