কামানের বিস্ফোরিত গোলার মতো আওয়াজ তুলে বাধের চূড়া ভেঙে পড়লো। মুক্ত পানি উথলে উঠলো আকাশে, দেখতে পেয়েই লাফ দিয়ে ফ্রন্ট-এন্ডের সিট থেকে নিচে নামলো নিকোলাস, পাড় ধরে ছুটছে। কিন্তু মাত্র কয়েক পা এগুতে পারলো ও, আলোড়িত পানি নাগাল পেয়ে গেল ওর। খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জলপ্রপাত হয়ে নিচে পড়ছে, গহ্বরের খোলা মুখ গ্রাস করে নিচ্ছে ওকে।
*
তীব্র স্রোত ট্র্যাক্টরটাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জলপ্রপাতের মাথা থেকে খসে পড়লো ওটা, ওর নিচে শূন্যে ওটাকে এক পলকের জন্য দেখতে পেল নিকোলাস। খসে গহ্বরের নিচে পড়ছে, উপলব্ধি করলো ট্রাক্টরের সিটে থাকলে ওটার নিচে চাপা পড়ত ও। বিশাল মেশিনটা হ্রদের সারফেসে পড়লো, সাদা পানি ছিটিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল গভীরে।
একটু পর ঝুলে পড়লো নিকোলাস, নিচে পা দিয়ে। তীব্র স্রোত আবার ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পানির উপর মাথা তুললাম পঞ্চাশ গজ ভাটির দিকে। চোখ থেকে চুল সরিয়ে দ্রুত চারদিকে দৃষ্টি বুলাল ও।
ওর সামনে, নদীর মাঝখানে, পাথরের ছোট একটা দ্বীপ রয়েছে। অল্প একটু সাঁতরে ওটার উপর উঠলো, ওখান থেকে গহ্বরের দু পাশের খাড়া পাঁচিলগুলোর দিকে তাকালো। শেষবার যখন এখানে আটকা পড়েছিল, তখনকার কথা মনে পড়ে গেল ওর। বাঁধ ভেঙে দিয়ে ফারাও-এর সমাধি ডুবিয়ে দেওয়ার উল্লাস কর্পণের মতো উবে গেল।
ওই পিচ্ছিল পাঁচিল বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়, জানে নিকোলাস। ধরার মতো কোনো গর্ত নেই পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে। গোটা প্রাচীর জুড়েই ফুলে আছে পাঁচিলের গা, পার হওয়া অসম্ভব। সাঁতরে পেছন দিকে, জলপ্রপাতের গোড়ায় পৌঁছনোও সম্ভব নয়।
তারপর লক্ষ্য করলো, জলপ্রপাতের মাথা থেকে যতোটা আশা করেছিল ততো বেশি পানি নামছে না। তার মানে বাধটা পুরোপুরি এখনো ভেঙে পড়েনি, শুধু চূড়ার দিকটা ভেঙে গেছে। তবে চূড়া যখন ভাঙবে, এ নদীতে সাঁতার কাটা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই, যা করার এখুনি করা দরকার। বুট খুলে দ্বীপ থেকে ডাইভ দিয়ে নদীতে পড়লো নিকোলাস। আর ঠিক সেই মুহূর্তে বিকট আওয়াজ শুনে বুঝতে পারল, অবশিষ্ট বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
দুনিয়া কাঁপানো গর্জন শুরু হলো, পানির নিরেট পাঁচিল জলপ্রপাতের মাথা থেকে লাফ দিচ্ছে নিচে। গায়ের সবটুকু শক্তি দিয়ে সাঁতরাচ্ছে নিকোলাস, দ্রুতগতি বন্যার আগে থাকার ইচ্ছা। ধেয়ে আসা ঢেউ-এর গর্জন শুনে কাঁধের উপর দিয়ে পেছন দিকে তাকালো। গহ্বরটা ডুবিয়ে দিয়ে ছুটে আসছে পানির তোড়, পনেরো ফুট উঁচু, চুড়ার দিকটা সাপের মতো ফণা তুলে আছে। ওই চূড়ায় উঠতে হবে ওকে, তলিয়ে যাওয়া চলবে না, সিদ্ধান্ত নিল নিকোলাস। পানিতে থাবা মেরে ঢেউ এর ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা চালালো। অনুভব করলো স্রোতটা ওর নাগাল পেয়ে গেছে, তুলে নিচ্ছে মাথায়। চূড়ায় ওঠার পর পিঠ ধনুকের মতো বাঁকা করলো নিকোলাস, হাত দুটো গুঁজে দিল নিজের পেছনে-ক্লাসিক বডিসাফার পজিশন, ঝুলে আছে ঢেউ-এর মুখে, মাথাটা সামান্য নত, শরীরের সামনের অর্ধেক অংশ পানির উপর তোলা, ভেসে থাকছে শুধু পা ছুঁড়ে। আতঙ্কিত কয়েকটা সেকেন্ড পেরিয়ে যাবার পর উপলব্ধি করলো, ঢেউ-এর মাথায় থাকতে পারছে ও, নিজের উপর খানিকটা নিয়ন্ত্রণ আছে; আতঙ্ক কমে এলো, রোমাঞ্চকর একটা শিহরণ বয়ে গেল শিরায় শিরায়।
বিশ নট! স্রোত আর নিজের গতি আন্দাজ করলো নিকোলাস, দু পাশের পাহাড়-প্রাচীর এতো দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে যে ঝাপসা লাগলো চোখে। ঢেউটার মাঝখানে থাকতে চেষ্টা করছে ও, পাঁচিলের কাছ থেকে দূরে। নিজেকে প্রায় কিছুই করতে হচ্ছে না, ঢেউই ওকে বয়ে নিয়ে চলেছে। তীব্র গতি আর বিপদের আশঙ্কা উপভোগ করছে নিকোলাস।
গহ্বরের গভীরতা বেড়ে যাওয়ায় বোল্ডারগুলো ডুবে গেছে, ফলে ধাক্কা খাবার ভয়টা এখন আর নেই। প্রথম এক মাইল পেরিয়ে আসার পর ঢেউ তার আকৃতি বদলাল, কারণ গিরিখাদ এ দিকে চওড়া হয়ে গেছে। আরো খানিক পর দেখা গেল ঢেউটা ওকে মাথায় তুলে রাখতে পারছে না। দ্রুত চারদিকে চোখ বুলালো নিকোলাস। কাছেই বিশাল এক গাছের কাণ্ড ভাসছে, ছুটে চলেছে ঢেউয়ের সঙ্গে একই গতিতে। ভাঙা বাঁধের একটা অংশ এটা, কোনো একটা ফাঁকে খুঁজে রেখেছিল ড্যানিয়েল। কাণ্ড বা লগটা প্রায় ত্রিশ ফুট লম্বা, পিঠ দেখে মনে হচ্ছে তিমি বুঝি। কাঠুরেরা করাত দিয়ে কাটার সময় কাণ্ডের সব শাখা হেঁটে ফেলেনি, ফলে ওটার উপর ওঠার সময় ধরার জন্য শক্ত ডাল পেল নিকোলাস। পানিতে পা ঝুলিয়ে ভাটির দিকে মুখ করে শুয়ে থাকলো, দম ও শক্তি ফিরে আসছে ধীরে ধীরে।
বাঁধ ভাঙা বন্যার আকৃতিতে এখন আর ঢেউ তেমন নেই, তারপরও গহ্বরের ভেতর দিয়ে প্রবল বেগে ছুটে চলেছে পানি। গতি প্রায় দশ নট, আন্দাজ করলো নিকোলাস। এ গতিতে টাইটার পুল আক্রান্ত হলে সমাধির ভেতর ফন শিলার আর তাঁর সঙ্গী সাথীদের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আগামি চার হাজার বছর ওখানে ওদেরকে থাকতে হবে। আপনমনে হাসলো নিকোলাস, যদিও পরক্ষণেই হাসিটা মুছে গেল। কারণ লম্বা লগটা একপাশে সরে যাচ্ছে, মনে হলো একদিকের পাহাড়-প্রাচীরে ধাক্কা খাবে।
গড়ান দিয়ে লগের আরেক দিকে চলে এলো নিকোলাস, পানিতে ঘন ঘন পা ছুঁড়ছে। বেঢপ ভেলা সাড়া দিল, তীব্র স্রোত থাকা সত্ত্বেও আবার সোজা হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে শিখছে নিকোলাস কীভাবে লগটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওর মনে হলো এটায় চড়ে মঠ পর্যন্ত যাওয়া যাবে। এমন কী এ গতিতে রোয়েন আর মারটিরে চেয়ে আগেও পৌঁছে যেতে পারে।
