তবে নাহুতের চেয়ে দ্রুত ছুটছে হানশিত, গ্যাস্ট্র্যাপ-এর সিঁড়ি বেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
হানশিত! ফিরে এসো! আমি তোমাকে হুকুম করছি! ছুটতে ছুটতে হাঁক ছাড়ছেন নাহুত, কিন্তু হানশিত থামলো না। টানেলের জটিল গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেল।
নাহুত, কোথায় আপনি? পাথুরে করিডরে শিলারের কাঁপা কাঁপা গলা প্রতিধ্বনি তুলছে। নাহুত শুনতে পেলেও সাড়া দিলেন না। ছুটছেন তিনি, তাঁর ধারণা হানশিতকে ঠিকমতোই অনুসরণ করছেন এখনো। খানিক পর মনে হলো সামনে থেকে হানশিতের পায়ের আওয়াজ ভেসে আসছে।
আরো তিনটে বাঁক ঘোরার পর নাহুত উপলব্ধি করলেন, গোলকধাঁধার ভেতর হারিয়ে গেছেন তিনি। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা মনে হলো বিস্ফোরিত হতে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে পড়লেন, চিৎকার করে ডাকলেন, হানশিত! কোথায় তুমি?
উত্তরে পেছন থেকে শিলারের আতঙ্কিত গলা ভেসে এলো, নাহুত! নাহুত! এখানে আমাকে ফেলে যাবেন না! তার ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ ক্রমশ কাছে সরে আসছে।
শাট আপ ধমক দিলেন নাহুত। বোকার মতো চেঁচাবেন না! হাঁপাচ্ছেন তিনি, হানশিতের পায়ের আওয়াজ শোনার আশায় আবার কান পাতলেন। কিন্ত পানির কলকল ছলছল হাসি ছাড়া আর কিছু শুনতে পেলেন না। আওয়াজটা মনে হলো তাঁর চারদিক থেকে ভেসে আসছে।
না! হানশিত, আমাকে ফেলে যেয়ো না! আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ছুটলেন আবার, কোত্থেকে কোথায় যাচ্ছেন নিজেও জানেন না।
*
আঁকাবাকা টানেলের প্রতিটি মোচড় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে হানশিত, মৃত্যুভয় তার পায়ে বিপুল গতি এনে দিয়েছে। কিন্তু মাঝখানের সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে হোঁচট খেলো সে, বাঁকা হয়ে গেল গোড়ালি, ধপাস করে পড়ে গেল সিঁড়ির ধাপে। গড়াতে গড়াতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল শরীরটা, লম্বা গ্যালারির নিচে এসে স্থির হলো।
অনেক কষ্টে, ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে সোজা হলো সে। যদিও ছুটতে গিয়ে আবার পড়ে গেল, মচকানো গোড়ালি বিপদের সময় সাহায্য করতে রাজি নয়। যতোক্ষণ শ্বাস ততোক্ষণ আশ, ক্রল করে এগুল হানশিত। দরজা পেরিয়ে এসে ল্যান্ডিঙে পৌঁছল, জেনারেটরের পাশে। টানেল থেকে সচল পানির আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজটা এখন আর নরম নয়, চাপা গর্জনের মতো শোনাচ্ছে, জেনারেটরের যান্ত্রিক গুঞ্জন প্রায় শোনাই যাচ্ছে না। ও যিশু, ও মেরী, আমাকে বাঁচাও গো! দেয়াল ধরে সোজা হলে আবার, এক পায়ে লাফাতে লাফাতে হাঁটছে। লোয়ার লেভেলে পৌঁছনোর আগে আরো দু বার হোঁচট খেয়ে পড়লো।
হাঁটুর উপর সোজা হয়ে সামনে তাকালো হানশিত। টানেলের ছাদে ইলেকট্রিক আলো সাজানো রয়েছে, তার আলোয় নিচের সিঙ্কহোলটা দেখতে পেল সে। দেখেও প্রথমে চিনতে পারলো না, কারণ আগের সেই চেহারা আর নেই। পানির লেভেল পালিশ করা মেঝের নিচে নয় এখন। পানিতে বিপুল একটা আলোড়ন উঠেছে। ভাসমান সেতু ভেঙে গেছে, এরইমধ্যে ডুবে গেছে অর্ধেকটা।
সিঙ্কহোলের ওপারের টানেলে, টাইটার পুল হয়ে, ঢুকে পড়েছে পাগলা নদী। সিঙ্কহোল ভরাট হয়ে গেছে, এপারের টানেলে উঠে আসছে পানি সগর্জনে। কিন্তু হানশিত জানে, বাইরে বের হওয়ার এটাই একমাত্র পথ।
এক পায়ে লাফ দিয়ে ভাসমান একটা পন্টুনে পড়লো হানশিত, কিন্তু সেটা এতো দ্রুত ঘুরপাক খাচ্ছে যে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। হামাগুড়ি দিয়ে বসলো সে, ওই অবস্থায় এক পন্টুন থেকে আরেক পন্টুনে চলে যাচ্ছে। এভাবে সিঙ্ক হোলের ওপারে পৌঁছল, টানেলের দেয়াল ধরে সোজা হলো আবার, একটা গর্তের ভেতর হাত গলিয়ে ঝুলে থাকলো। কিন্তু নদীর পানি শ্যাফটের ভেতর এখন তুমুল বেগে ঢুকছে, হানশিতের শরীরের নিচের অংশ টানা স্রোতের মধ্যে পড়ে গেল। পানি ঠেলে সামনে এগুতে পারছে না সে, গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে হাতটা।
মাথার উপর টানেলের ছাদে এখনো ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে, টানেলের শেষ মাথায় টাইটার পুলে বেরুনোর চৌকো ফাঁকটা অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে হানশিত। ওখানে একবার পৌঁছতে পারলে কপিকলে চড়ে পাহাড়-প্রাচীরের মাথায় উঠে যাওয়া সম্ভব। শরীরের সব শক্তি এক করে স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলো সে, এক গর্ত থেকে আরেক গর্তে হাত ঢোকাচ্ছে। আঙুলের নখ উপড়ে এলো, তবু এগুচ্ছে হানশিত।
অবশেষে দিনের আলো দেখতে পেল সে, টাইটার পুল থেকে ভেতরে ঢুকছে। আর মাত্র চল্লিশ ফুট এগুতে হবে। এভাবে এগুতে পারলে এ যাত্রা বেঁচে যাবে বলে মনে হলো। কিন্তু তারপরই নতুন একটা শব্দ ঢুকলো কানে। টানেলের বাইরে গহ্বরের ভেতর যেনো প্রলয়কাণ্ড শুরু হলো। কী ঘটছে বুঝতে পারলো হানশিত। বাধটা এবার পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, বিপুল জলরাশি জলপ্রপাতের মতো থেমে আসছে টাইটার পুলে। টানেলের বিশাল ঢেউ গ্রাস করে ফেললো, টানেল ভরাট হয়ে উঠলো ছাদ পর্যন্ত।
বিপুল জলরাশির ধাক্কাটা পাথর ধসের মতো লাগলো হানশিতকে, খড়কুটোর মতো ভেসে গেল সে। সিঙ্কহোল নিজের গভীরে টেনে নিল তাকে, পানির প্রচণ্ড চাপ হাড়-গোড় সব গুঁড়ো করে দিচ্ছে। কানের কাছে একটা ড্রাম বিস্ফোরিত হলো, হাঁ করা মুখ দিয়ে ঢুকে ফুসফুস ভরাট করে তুললাম পানি। পানির নিচের গোপন শ্যাফট দিয়ে তীব্রবেগে ছুটলো তার লাশ, পাহাড়ের দূর প্রান্তে প্রজাপতি ফোয়ারায় বেরিয়ে যাবে।
