এ রকম কিছু আমিও আশা করি নি, ফিসফিস করলেন ফন শিলার। আমি মুগ্ধ, আমি ধন্য!
কামরার প্রতিটি দিক অমুল্য ট্রেজারে ভর্তি, বলল হানশিত। ওখানে এমন সব জিনিস আছে, স্বপ্নেও আপনারা দেখেন নি। হারপার নিকোলাস খুব অল্পই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পেরেছেন, ছোট কয়েকটা বাক্সে ভরে। আর্টিফ্যাক্টের পাহাড় ফেলে রেখে গেছেন তিনি।
কফিনটা…কফিনটা কোথায়? রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইলেন ফন শিলার। মমি! মমি!
ওটা ছিল সোনালি একটা কফিনে। হারপার নিকোলাস সেটা প্রধান পুরোহিতকে দান করেছেন। সন্ন্যাসীরা ওটা মঠে দিয়ে গেছে।
কর্নেল নগুকে দিয়ে ওটা আনিয়ে নেব আমরা, বললেন নাহুত। আপনি চিন্তা করবেন না, হের ফন শিলার।
তোরণ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন ওঁরা, তারপর ছুটলেন। প্রথম সারির একটা স্টোরের সামনে এসে দাঁড়ালেন ফন শিলার, শিশুর মতো অবিরাম হাসছেন।
অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্য! একই কথা বারবার বলছেন। কাঠের একটা চেস্ট স্তূপ থেকে নামালেন তিনি, কাঁপা হাতে খুলে ফেললেন ঢাকনি। ভেতরের জিনিসগুলো দেখে বোবা হয়ে গেলেন। চেস্টের উপর ঝুঁকে নরম সুরে কাঁদছেন।
*
ড্যানিয়েলের হলুদ ফ্রন্ট-এন্ড ট্র্যাক্টরের ড্রাইভিং সিটে উঠে বসেছে নিকোলাস। হাইড্রলিক কন্ট্রোল অপারেট করছে গভীর মনোযোগের সঙ্গে, ক্রেনটাকে খাড়া করলো যতটুকু পারা যায়। নদী আক্ষরিক অর্থেই ফুঁসছে, বাঁধের মাথা ছুঁতে আর বেশি সময় নেবে না। বাঁধ ভাঙবেই, তবে সময়টা আরো খানিক এগিয়ে আনতে চেষ্টা করছে ও। ক্রেনের যান্ত্রিক হাত কাজ শুরু করলো, বাঁধের মাথা থেকে জালে আটকানো পাথর একটা একটা করে তুলে ফেলে দিচ্ছে পানিতে।
ওদিকে, উন্মাদের মতো আচরণ করছেন ফন শিলার। চেস্ট খুলে রাজকীয় অলঙ্কার শূন্যে ছুঁড়ছেন, চড়িয়ে দিচ্ছেন চারদিকে, ছুটে এসে এমন জায়গায় দাঁড়াচ্ছেন, ওগুলো যাতে তাঁর মুখ আর মাথায় পড়ে। সেই সঙ্গে অট্টহাসি হাসছেন, পাক খাচ্ছেন লাটিমের মতো, আবার কখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছেন। নাহুতও আবেগে আপ্লুত, তবে তিনি শিলারের আচরণ হাঁ করে গিলছেন।
খানিক পর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ফন শিলার ফিসফিস করলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আর্কিওলজিকাল ডিসকভারি। এখনো তিনি কাঁপছেন, রুমাল বের করে মুখ মুছলেন।
আমাদের সামনে কয়েক বছরের কাজ, ভাবাবেগের লাগাম টেনে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলেন নাহুত। এ অবিশ্বাস্য কালেকশনের ক্যাটালগ তৈরি করতে হবে, তারপর মূল্যায়নের পালা। আবিষ্কারক হিসেবে আপনার নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একেই বলে মিশরীয় অমরত্ব, আপনার নাম কেউ কোনোদিন ভুলবে না, হের ফন শিলার।
নিষ্পলক দৃষ্টিতে নাহুতের দিকে তাকিয়ে থাকলেন ফন শিলার। এ চিন্তাটা আগে তাঁর মাথায় ঢোকে নি। অমরত্ব লাভের এ সুবর্ণসুযোগ কেন তিনি হাতছাড়া করবেন? প্রথমে ভেবেছিলেন মামোসের ট্রেজার সবই একা দখল করবেন তিনি, কাউকে কোনো ভাগ দেবেন না। নাহুতের কথা শুনে এখন ভাবছেন, ফারাওদের মতো অমর হতে বাধা কোথায়? মমোসের ট্রেজার সাধারণ লোকের দ্রষ্টব্য বস্তুতে পরিণত হোক, এটা তিনি চান না, অন্তত তাঁর মৃত্যুর আগে নয়। না! নাহুতের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন তিনি। এই গুপ্তধন আমার, একা শুধু আমার! আমি মারা গেলে সব আমার সঙ্গে যাবে। আমি একটা উইল তৈরি করব। আমি মারা যাবার পর কী করতে হবে আমার ছেলেরা তা জানবে। আমার সমাধিতে থাকবে সব। ওটা হবে আধুনিক কালে ফারাও ফন শিলারের রাজকীয় সমাধি।
মানুষটা যে সত্যিকার অর্থে পাগল, আজই প্রথম উপলব্ধি করছেন নাহুত। তবে তিনি জানেন যে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। যা করার পরে মাথা খাঁটিয়ে বের করতে হবে। এ বিপুল প্রত্ন নিদর্শন আরেকটা সমাধিতে হারিয়ে যাবে, তা তিনি হতে দেবেন না। মাথা নত করে আনুগত্য প্রণাম করলেন তিনি, আপনি যা বলেন, হের, ফন শিলার। তবে এ মুহূর্তে আমাদের প্রথম চিন্তা, নিরাপদে সব বাইরে বের করে নিয়ে যাওয়া। হেলম্ আমাদেরকে নদীর কথা বলে সাবধান করে দিয়েছেন। তাকে আর কর্নেলকে এখানে ডাকা দরকার, সমাধি খালি করতে হবে। প্যাক করে ওখান থেকে পাঠিয়ে দেব জার্মানিতে।
হ্যাঁ, ঠিক আছে। হেলম আর কর্নেলকে ডেকে পাঠান। রাজি হলেন ফন শিলার।
হানশিত, কোথায় তুমি? চিৎকার করলেন নাহুত।
খালি কফিনের সামনে হাঁটুগেড়ে প্রার্থনা করছে তরুণ সন্ন্যাসী। উঠে এসে নাহুতের সামনে দাঁড়ালো। যাও, ওদেরকে ডেকে আনো…., হঠাৎ থেমে গেলেন তিনি, কান পাতলেন। ও কিসের শব্দ?
মাথা নাড়লো হানশিত, ছোটে আঙুল রেখে চুপ থাকার ইঙ্গিত দিল। শুনুন! শুনুন!
হঠাৎ আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে গেল ফারুকরির চোখ। আওয়াজটা বহুদূর থেকে আসছে, খুবই নরম, বাতাসের দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো।
কিসের শব্দ? জিজ্ঞেস করলেন ফন শিলার।
পানি! ফিসফিস করলেন নাহুত। ছুটন্ত পানির আওয়াজ!
নদী! কর্কশ শোনার হানশিতের গলা। টানেলের ঢুকে পড়ছে নদী! ঘুরলো সে, তারপর কামরা থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল।
আমরা এখানে আটকা পড়ব! চেঁচিয়ে উঠে তার পিছু নিলেন নাহুত।
দাঁড়ান! অপেক্ষা করুন! গলা ফাটালেন ফন শিলারও, পিছু নিলেন ওদের। কিন্তু নাহুত ও হানশিত তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, স্বভাবতই পিছিয়ে পড়ছেন তিনি।
