রোয়েন, সত্যি তুমি? কতকাল তোমার কোনো খবর নেই! আছো কেমন?
কিছু সময় আলাপের পর প্রফেসরকে লাইনে চাইলো রোয়েন। তিনি ধরলেন ফোন।
আমার ফেভারিট স্টুডেন্ট? শুনে হাসছে রোয়েন। অনেক আগেই অবসর নেওয়ার কথা প্রফেসরের, বয়েস সত্তরের উপর। এখনো তিনি শক্ত-সামর্থ, অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী, আর সব সুন্দরী ছাত্রীকে ফেভারিট বলে মনে করেন।
. ইন্টারন্যশনাল কল, প্রফেসর, মনে করিয়ে দিল রোয়েন। আমি শুধু জানতে চাই অফারটা এখনো বহাল আছে কিনা।
মাই গুডনেস, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করবে না।
পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। যদি দেখা হয় সব আপনাকে খুলে বলব।
অবশ্যই তোমার লেকচার আমরা শুনতে চাই। কবে নাগাদ আসতে পারবে?
কাল আমি ইংল্যান্ডে আসছি। ইয়র্কে, মায়ের কাছে থাকব। আপনি ফোন নম্বরটা লিখে রাখুন। তবে কয়েকদিনের মধ্যে আমিই আপনাকে কল করব।
ক্রেডলে রিসিভার রেখে দিয়ে বিছানায় কাত হলো রোয়েন।
দু মাস আগে রানী লসট্রিস-এর সমাধি ও স্ক্রোল আবিষ্কার এবং খনন কাজ সম্পর্কে লেকচার দেওয়ার জন্য প্রফেসর ডিক্সন আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ওকে। গোটা বিষয়টা সম্পর্কে তিনি জানতে পারেন একটা বই পড়ে, বিশেষ করে বইটার শেষে যোগ করা ফুটনোট পড়ে। বইটা প্রকাশ পাবার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন মহলে বিরাট আলোড়ন উঠেছিল। অ্যামেচার ও প্রফেশনাল, দু ধরনের ঈজিপ্টলজিস্টই খোঁজ-খবর নিতে শুরু করেন। এমন কি টোকিও আর নাইরোবির মতো দূর দেশ থেকেও প্রচুর চিঠি আর ফোন আসে। সবারই একটা প্রশ্ন, উপন্যাসের কাহিনী সত্যের উপর ভিত্তি করে রচিত কিনা।
রোয়েন আসলে কোনো গল্প লেখককে ট্রান্সক্রিপসন দেখাতে একদমই রাজি হয় নি, বিশেষ করে ওগুলো তখনো সম্পূর্ণ না হওয়ায়। ওর মনে হয়েছিল, গোটা ব্যাপারটাকে সিরিয়াস অ্যাকাডেমিক সাবজেক্ট হিসেবে গণ্য করা উচিত। প্যালিয়েন্টেলজিকে স্পিলবার্গ যেমন জুরাসিক পার্কের মাধ্যমে খেলা করে ফেলেছেন, ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম।
ওর আপত্তিতে এমন কি ডুরেঈদও কান দেন নি। কারণটা অবশ্যই টাকা। বড় কোনো কাজ তো দূরের কথা, টাকার অভাবে ওদের ডিপার্টমেন্ট ছোটখাট কোনো কাজেও হাত দিতে পারছিল না। বইটার নাম রিভার গড, লেখক উইলবার স্মিথ। আগেই কথা হয়ে যায়, রয়্যালটির অর্ধেক টাকা ডিপার্টমেন্ট পাবে। সেই টাকা দিয়ে এক বছর গবেষণা আর অনুসন্ধানের কাজ চালানো সম্ভব হয়েছে। তবু লেখকের প্রতি সন্তুষ্ট হতে পারে নি রোয়েন। তার কারণ, স্ক্রোলে যা লেখা আছে তার উপর রঙ চড়িয়েছেন তিনি, ঐতিহাসিক চরিত্র ও ব্যক্তিত্বকে দিয়ে এমন সব কথা বলিয়েছেন বা এমন সব কাজ করিয়েছেন, যা করা বা বলা হয়েছে কিনা প্রমাণ নেই। প্রাচীন লেখক টাইটাকে আধুনিক লেখক উইলবার স্মিথ চিত্রিত করেছেন মিথ্যে বড়াইকারী ও দাম্ভিক হিসেবে, বিশেষ করে এখানেই রোয়েনের আপত্তি।
পরে অবশ্য রোয়েনকে মেনে নিতে হয়েছে। একজন লেখক তার পাঠককে প্রাঞ্জল ভাষায় মুখরোচক গল্পের খোরাক পরিবেশন করবেন, এ তো জানা কথা। সন্দেহ নেই, সে কাজে উইলবার স্মিথ পুরোপুরি সফল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো রোয়েন। ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে, এ নিয়ে চিন্তা করলে শুধু শুধু মাথা ব্যথাই বাড়বে।
ওর বরং এখন জরুরি সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা দরকার। লীডস-এ লেকচার দিতে হলে ওর স্লাইডগুলো লাগবে, কিন্তু সেগুলো মিউজিয়ামে ওর অফিসে আছে। কীভাবে ওগুলো ওখান থেকে বের করা যায় ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো রোয়েন, কাপড় না পাল্টেই।
*
শেষে সহজ সমাধানটাই বেছে নিল রোয়েন। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিসে ফোন করে কী করতে হবে বলে দিল ও, ওই অফিসের একজন সেক্রেটারি স্লাইডগুলো নিয়ে হাজির হলো ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের চেক ইন ডেস্কে। ওকে ওগুলো দেওয়ার সময় সে জানালো, আজ সকালে অফিস খোলার পর পুলিশ এসেছিল। কথা বলার জন্য আপনাকে খুঁজছিল তারা।
বোঝাই যায়, রেনোয়ার রেজিস্ট্রেশন চেক করেছে পুলিশ। ভাগ্য ভালো যে রোয়েনের কাছে ব্রিটিশ পাসপোর্ট আছে। মিশরীয় পাসপোর্ট নিয়ে দেশত্যাগ করতে হলে সমস্যা এড়ানো যেত না। পাসপোর্ট কন্ট্রোল পয়েন্টে পুলিশ সম্ভবত রেসট্রিকশন অর্ডার দিয়ে রেখেছে। যা হোক, চেক পয়েন্টে কোনো অসুবিধে দেখা দিল না। ডিপারচার লাউঞ্জে ঢুকে নিউজ-স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালো রোয়েন।
স্থানীয় সবগুলো দৈনিকে ওর গাড়িতে বোমা ছুঁড়ে মারার ঘটনাটা ছাপা হয়েছে, সেই সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ইবনে ডুরেঈদের হত্যাকাণ্ড। রিপোর্টাররা বলতে চেয়েছে ঘটনা দুটোর মধ্যে যোগসূত্র আছে এবং কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে মৌলবাদী ধর্মীয় গ্রুপগুলোকে দায়ী বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। রোয়েন প্রতিটি দৈনিকেরই একটা করে কপি কিনল।
• প্লেন তখন আকাশে, নোটবুক বের করে ডুরেঈদ হাসলেন, হারপার নিকোলাস সম্পর্কে যা যা বলেছে সব লিখে রাখছে রোয়েন। লন্ডনে পৌঁছে এ ভদ্রলোককে খুঁজে বের করতে হবে, যদি তিনি ইংল্যান্ডে থাকেন।
ডুরেঈদের কাছে রোয়েন শুনেছে, ব্রিটিশ কলোনিয়াল চাকরিতে অবদানের জন্য নিকোলাসের বড়ো বাবাকে ব্যারোনেট উপাধিতে ভূষিত করেছিল রানী। তিন পুরুষ ধরেই নিকোলাসের পরিবার আফ্রিকার সঙ্গে গাঢ় হৃদ্যতা এবং যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে, বিশেষত উত্তর আফ্রিকার ব্রিটিশ কলোনি ছিল যে দেশগুলোয়, সেগুলোর সাথে মিশর, সুদান, উগান্ডা এবং কেনিয়া।
