নিকি! পেছন থেকে বৃথায় ডাকলো রোয়েন।
*
বাঁধের উপর দিয়ে উড়ে এলো জেট রেঞ্জার। বাঁধ পিছিয়ে পড়তে গিরিখাদের আরো গভীরে নামলো কপ্টার। দু পাশে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়-প্রাচীন, মাঝখানে সরু ফাঁক, তার ভেতর দিয়ে ছুটছে ওরা। গহ্বরটা প্রায় শুকনো এখন, জমে থাকা পানি স্থির। ওই তো! ওই তো ওরা! সরাসরি সামনে হাত তুলল হেলম্। ওদিকে একদল লোককে দেখা যাচ্ছে, গহ্বরের কিনারায়। কর্নেল নগুকে আমি চিনতে পারছি। তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের স্পাই, হানশিত শেরিফ।
ইঞ্জিনের আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠলো তার গলা, পাইলটকে বলল, তুমি ল্যান্ড করতে পারো। ওই দেখো, কর্নেল নগু হাত নাড়ছেন।
হেলিকপ্টারের স্কিড জমিন স্পর্শ করতেই হানশিতকে নিয়ে ছুটে এলেন কর্নেল। নগু। ফন শিলারকে নিচে নামতে সাহায্য করলো ওরা, ঘুরন্ত রোটরের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনল। আমার লোকেরা জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। ডাকাতদের ধাওয়া করেছিলাম, উপত্যকার দিতে সরে যেতে বাধ্য করেছি। তারপর হানশিত শেরিফের পরিচয় দিলেন নণ্ড। হানশিত হারপার নিকোলাসের সঙ্গে সমাধির ভেতর ছিল, টানেলের প্রতিটি ইঞ্চি চেনে।
ইংরেজি বোঝে? জানতে চাইলেন ফন শিলার।
এক-আধটু।
গুড! গুড! হানশিতের দিকে তাকালেন ফন শিলার।
ওহে, সন্ন্যাসী, পথ দেখাও আমাকে। আসুন, নাহুত, আপনিও আমার সঙ্গে আসুন। প্রচুর বেতন দেওয়া হয়েছে আপনাকে, এবার কিছু কাজ দেখান।
পথ দেখিয়ে ওদেরকে পাহাড়-প্রাচীরের কিনারায়, কফিকলের কাছে নিয়ে এলো হানশিত। কিনারা থেকে উঁকি দিয়ে গহ্বরের নিচে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন ফন শিলার। কপিকলের বাঁশের কাঠামো ভঙ্গুর আর নড়বড়ে মনে হলো। পেছন থেকে হানশিত বলল, সমাধিতে নামার এটাই একমাত্র পথ।
চোখ বুজে রশির দোলনায় বসলেন ফন শিলার। একে একে নিচে নামলো ওরা। টানেলটা কোথায়? চারদিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন ফন শিলার।
হাত তুলে পাহাড়-প্রাচীরের গোড়ার ফাঁকটা দেখালো হানশিত। টাইটার পুলকে ঘিরে থাকা নিচু পাঁচিলের উপর দিয়ে সরু কার্নিসে চলে এলো সবাই। হেলম্ আর কর্নেলের দিকে তাকালেন ফন শিলার। হেলমকে নিয়ে আপনি এখানে পাহারায় থাকুন, কর্নেল, বললেন তিনি। হানশিত আর নাহুতকে নিয়ে ভেতরে ঢুকছি আমি। হেলমের দিকে তাকালেন। দরকার হলে তোমাদেরকে আমি ডেকে পাঠাব।
আমি আপনার সঙ্গে থাকতে পারলে খুশি হতাম, বলল হেলম্। আপনার নিরাপত্তার দিকটা….
ভুরু কুঁচকে ফন শিলার বললেন, যা বলছি শোনো। টানেলের মুখে ঢুকে পড়লেন তিনি। নাহুত আর হানশিত তাকে অনুসরণ করলো। এতো আলো। আসছে কোত্থেকে? জানতে চাইলেন ফন শিলার।
হানশিত বলল, একটা মেশিন আছে। তারপর ওরা শুনতে পেল সামনে থেকে জেনারেটরের অস্পষ্ট যান্ত্রিক গুঞ্জন ভেসে আসছে। সিঙ্কহোলের উপর ভাসমান সেতুতে না পৌঁছনো পর্যন্ত ওদের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না।
এখানে পানি কেন? বিড়বিড় করলেন নাহুত। মিশরীয় অন্য কোনো প্রাচীন সমাধিতে পৌঁছতে হলে এ রকম পানি পেরুতে হয়েছে বলে তো শুনিনি।
আপনি বেশি কথা বলেন, ধমক দিলেন ফন শিলার। আগে দেখতে দিন এ লোক আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যায়।
সেতু পার হওয়ার সময় হানশিতের কাঁধে ভর দিয়ে থাকলেন তিনি। এখান থেকে টানেল ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠে গেছে। হাই-ওয়াটার মার্ক ছাড়িয়ে এলো ওরা। টানেলের দেয়ালের দিকে পালিশ করা পাথর, লক্ষ্য করে ফারুকরি মন্তব্য করলেন, নাহ, আমারই ভুল হয়েছিল। টানেলের এ দিকে তো দেখছি মিশরীয় প্রভাব স্পষ্ট।
বিধ্বস্ত গ্যালারির বাইরে ল্যান্ডিঙে পৌঁছল ওরা। এখানে জেনারেটর রয়েছে। ইতোমধ্যে হাঁপিয়ে গেছেন ফন শিলার ও নাহুত, দু জনেই ঘামছেন–যতোটা না ক্লান্তিতে, তারচেয়ে বেশি উত্তেজনায়।
যতো দেখছি ততোই আশা জাগছে বুকে, বললেন নাহুত। এটা কোনো রাজকীয় সমাধি হওয়া বিচিত্র নয়।
এক পাশের দেয়াল ঘেঁষে স্তূপ করা রয়েছে প্লাস্টার সীল, হাত তুলে সেগুলো নাহুতকে দেখালেন ফন শিলার। ওগুলোর সামনে হাঁটু গাড়লেন নাহুত, মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করলেন।
ফারাও মামোসের সীল, উত্তেজনায় কেঁপে গেল তাঁর গলা। সঙ্গে লিপিকার টাইটার সই। চকচকে চোখ তুলে শিলারের দিকে তাকালেন। এখন আর কোনো সন্দেহ-ই নেই। আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম সমাধিতে নিয়ে আসব, এনেছিও।
কয়েক মুহূর্ত কথা বললেন না ফন শিলার। তারপরই যেনো বিস্ফোরিত হলেন। কিন্তু কি লাভ হলো? সবই তো ভেঙে নষ্ট করা হয়েছে।
না! না! ব্যাকুল সুরে আশ্বস্ত করলো হানশিত। এ দিকে আসুন। সামনে আরো একটা টানেল আছে।
আবর্জনার ভেতর দিয়ে পথ করে এগুলো ওরা, হানশিত ব্যাখ্যা করছে গ্যালারির ছাদ কীভাবে ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর আসল প্রবেশপথটা সেই আবিষ্কার করেছিল, এ কথা জানাতেও ভুলল না। সবশেষে বলল, সামনে রাশি রাশি গুপ্তধন পড়ে আছে, দেখে আপনাদের মাথা ঘুরে যাবে।–ঠিক আছে, বললেন ফন শিলার। সরাসরি সমাধিতে নিয়ে চলো আমাকে। আমার হাতে সময় খুব কম।
গোলকধাঁধা অর্থাৎ বাওবোর্ডের জটিল ছক ধরে পথ দেখালো হানশিত, লুকানো সিঁড়ি বেয়ে ওদেরকে তুলে আনল, তারপর ক্রমশ নিচু টানেল ধরে এগুলো।
অবশেষে তোরণশোভিত কামরার সামনে এসে থামলো ওরা। কামরার ভেতর দেয়ালচিত্র দেখে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন নাহুত। এতো সুন্দর দেয়ালচিত্র জীবনে কখনো দেখিনি আমি।
