পথের জাংশনে পৌঁছবার আগেই স্ট্রেচার সহ একদল গেরিলাকে দেখতে পেল ওরা। তারাও মঠের দিকে যাচ্ছে। কাছাকাছি এসে নিকোলাস দেখলো স্ট্রেচারে শুয়ে রয়েছে টিসে। তার মুখে ব্যান্ডেজ আর করুণ চেহারা দেখে মোচড় দিয়ে উঠলো বুকটা। টিসে! কে আপনার এ অবস্থা করলো?
অভিমানী শিশুর দৃষ্টিতে নিকোলাসের দিকে তাকালো টিসে। থেমে থেমে, ফোঁপাতে দু একটা মাত্র শব্দ বলতে পারল।
হেলম! চাপা গলায় গর্জে উঠলো নিকোলাস। বেজন্মাটাকে ধরতে পারলে হয়? ওর পাশে এসে দাঁড়ালো রোয়েন, টিসেকে দেখে বিকৃত হয়ে উঠলো ওর চেহারা।
নিকোলাসকে ঠেলে সরিয়ে দিল রোয়েন, বলল, আপনি অন্য দিকে যান, আমি ওর পাশে থাকি।
নিকোলাস এক পাশে সরে এসে স্ট্রেচার বহনকারীদের একজনকে জিজ্ঞেস করলো, মিযরা, কি ঘটছে ও দিকে?
গিরিখাদের পুব দিকে থেকে একটা ফোর্স নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছেন কর্নেল নগু, বলল মিযরা। পাশ দিয়ে এগিয়ে এসেছে ওরা, তাই আমরা পিছু হটছি। এ যুদ্ধে আমরা অভ্যস্ত নই।
জানি, মন্তব্য করলো নিকোলাস। গেরিলারা সব সময় জায়গা বদল করবে। মেক কোথায়?
গহ্বরের পুব পাড় ধরে পিছু হটছেন তিনি, মিযরা যখন উত্তর দিচ্ছে, ওদের পেছন থেকে গোলাগুলির নতুন আরেক দফা আওয়াজ ভেসে এলো। ওই ওখানে উনি! মাথা ঝাঁকালো মিযরা। কর্নেল ন তাকে তাড়া করছেন।
তোমাকে সে কি নির্দেশ দিয়েছে?
ওইজিরো টিসেকে নিয়ে নৌকায় চড়ে তার জন্য অপেক্ষা করতে।
ঠিক আছে। আমরাও তোমার সাথে যাবো।
*
অ্যাবে গিরিখাদের মাথায় জমাট বাঁধছে ঘন কালো মেঘ। পেগাসাস কোম্পানির জেট রেঞ্জার হেলিকপ্টার সারি সারি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে উড়ছে। হেলম্ জানে মেক নিমুরের কাছে আরপিডি, রকেট-লঞ্চার আছে, গিরিখাদের ভেতর পাহাড়-শ্রেণীর আড়াল না নিয়ে উপায় নেই তাদের। ডান দিকের সিটে বসেছে যেনো পাইলটের পাশে। পেছনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসেছেন হের ফন শিলার আর : নাহুত গাদ্দাবি, দু জনেই পেছন দিকে ছুটস্ত উপত্যকার দিকে তাকিয়ে আছেন।
কয়েক মিনিট পরপর জ্যান্ত হয়ে উঠেছে রেডিও, কর্নেল নগুর লোকজন মর্টার সাপোর্ট চাইছে কিংবা লক্ষ্য অর্জনের রিপোর্ট দিচ্ছে।
ওরা কী গহ্বরের সেই জায়গায় পৌঁছেছে, জানতে চাইলেন ফন শিলার, হারপার নিকোলাস যেখানে কাজ করছে?
উত্তর পেতে আরো খানিকটা সময় লাগলো। রেডিও থেকে সরাসরি কর্নেল গুমার আওয়াজ ভেসে এলো। আমরা সফল হয়েছি, হের ফন শিলার। সমস্ত পজিশন দখল করে নিয়েছি। কপিকলে চড়ছে আমার লোকজন, গহ্বরের নিচে নামতে যাচ্ছে ওরা।
ফন শিলার পাইলটকে প্রশ্ন করলেন, ওখানে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে?
মিনিট পাঁচেক, স্যার।
পৌঁছবার পর জায়গাটাকে ঘিরে চক্কর মারবেন, সঙ্গে সঙ্গে ল্যান্ড করবেন না।
আকাশে থেমে দাঁড়ালো কপ্টার।
কি হলো? শিলার জানতে চান। কি দেখছো?
বাঁধ, জ্যাক হেল বলে। কুয়েনটন-হারপারের বাঁধ দেখছি। প্রচুর কাজ করেছে ব্যাটা।
বৃষ্টিস্নাত আলোয় বাঁধে আটকে পড়া নীলের জল গাঢ় আর কাদাটে দেখাচ্ছে। লম্বা উপত্যাকায় চারপাশে ফুঁসছে পানি।
পরিত্যক্ত! হেল বলে চলে, ওরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
নদীর তীরে হলুদ মতো ওটা কী? ফন শিলারের জিজ্ঞাসা।
ওটা দিয়ে মাটি সরায়। ওই যে, আমার ইনফরমার বলেছিল।
এখানে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। চলো নিচে গিয়ে দেখি! তর সইছে না ফন শিলারের।
পাইলটের কাঁধে হাত রেখে নির্দেশ দেয় হেলম্।
*
ট্রেইলের জাংশনে অপেক্ষা করছিল ড্যানিয়েল। নদী এখানে নতুন পথ ধরে সগর্জনে উপত্যকা বেয়ে নেমে যাচ্ছে, নামার পথে আদি ট্রেইলের কিছুটা অংশ ডুবিয়ে দিয়েছে। মাথায় ক্রেট নিয়ে পোর্টাররা উঠে যাচ্ছে উঁচু জমিনে।
হানশিত কোথায়? ড্যানিয়েলকে জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। পোটারদের দীর্ঘ লাইনে তরুণ হানশিত শেরিফকে দেখে নিও।
আমিতো জানতাম সে তোমার সঙ্গে আছে, জবাব দিল ড্যানিয়েল।
ফেলে আসা পথের দিকে তাকালো নিকোলাস, ঝোঁপ-ঝাড়ে ঢাকা ট্রেইলে আর কেউ নেই। কে এখন খুঁজতে যায়! মঠে তাকে একাই ফিরতে হবে। ও থামতেই দূর থেকে হেলিকপ্টারের আওয়াজ ভেসে এলো। পেগাসাসের কপ্টার, ভাবল নিকোলাস। আওয়াজ শুনে বোঝা যাচ্ছে সরাসরি টাইটার হ্রদের দিকে যাচ্ছেন ফন শিলার। তার মানে ওরা কোথায় কাজ করছিল, জার্মান ধনকুবের আগে থেকেই তা জানে।
আওয়াজটার দিকে মুখ তুলে রয়েছে রোয়েনও, আশা ঘন কালো মেঘের গায়ে কোথাও হেলিকপ্টারটাকে দেখতে পাবে। শুয়োরের দলটা আমাদের সমাধিতে ঢুকলে পবিত্র একটা জায়গায় মর্যাদা নষ্ট হবে, বলল ও, গলায় রাগ।
হঠাৎ এগিয়ে এসে স্ট্রেচারের পাশে দাঁড়ানো রোয়েনের একটা হাত চেপে ধরল নিকোলাস। ঠিক বলেছেন আপনি! টিসেকে নিয়ে মঠে চলে যান আপনি। আমি একটু পরে আসছি। রোয়েন প্রতিবাদ করার আগেই ছুটে ড্যানিয়েলের সামনে চলে এলো ও।
ড্যানিয়েল, মেয়ে দুটোর দায়িত্ব তোমার উপর থাকলো।
নিকোলাসের পেছনে চলে এলো রোয়েন। কী করতে চাইছেন, বলবেন। আমাকে?
ছোট্ট একটা কাজ আছে। খুব বেশি দেরি করব না।
নিশ্চয়ই আপনি ওখানে আবার ফিরে যেতে চাইছেন না?
আতঙ্কিত দেখালো রোয়েনকে। ধরতে পারলে ওরা আপনাকে স্রেফ খুন করবে…
চিন্তা করবেন না, বলে হেসে উঠলো নিকোলাস, তারপর রোয়েন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর ঠোঁটে পূর্ণ চুমো খেয়ে ঘুরে দাঁড়ালো, ফিরতি পথে ছুটছে। টিসের দিকে খেয়াল রাখবেন।
