কফিনের দু পাশে দাঁড়িয়ে নিকোলাস ও রোয়েন লিনেনের জাল ছাড়ালো। ওদের আঙুলের চাপে টিস্যু পেপারের মতো ছিঁড়ে গেল ওগুলো। দু জনেই নিজের অজান্তে বিস্ময়সূচক আওয়াজ করলো ফারাও-এর ডেথ-মাস্ক উন্মোচিত হয়ে পড়ায়। মানুষের মাথার চেয়ে সামান্য একটু বড় ওটা আকারে, তবে সংশ্লিষ্ট মানুষটির হুবহু প্রতিচ্ছবি বলতে হবে মুখোশটিকে। শিল্পীর কাজ এতো নিখুঁত, চেহারার বৈশিষ্ট্যগুলো এতোকাল পরও অটুট রয়েছে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলো ওরা, স্ফটিকের চোখ দিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছেন ফারাও-ও, সেই চোখে বিষণ্ণ দৃষ্টি, মনে হলো যেনো অভিযোগও আছে। :
মমির মাথা থেকে মুখোশটা তুলতে সাহস সঞ্চয়ের জন্য সময় নিতে হলো ওদেরকে। তারপর যখন তুললাম, আরো প্রমাণ পেল যে প্রাচীন কালে রাজা ও তাঁর জেনারেল ট্যানাস-এর দেহ অদলবদল করা হয়েছে। ওদের চোখের সামনে যে মমিটা পড়ে রয়েছে সেটা পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে কফিনের তুলনায় বেশ বড়। আংশিক আচ্ছাদন মুক্ত অবস্থায় রাখা, অনেকটা গুঁজে ভরা হয়েছে।
রাজকীয় মমির সঙ্গে কয়েকশো তাবিজ আর মন্ত্রঃপূত কবচ থাকবে, আবরণের নিচে, ফিসফিস করে জানালো রোয়েন। এটা বিখ্যাত বা অভিজাত কোনো ব্যক্তির মমি, কোনোমতেই একজন রাজার হতে পারে না।
লাশের মাথা থেকে ব্যান্ডেজের ভেতরে স্তর খুব সাবধানে খুলল নিকোলাস, ফলে মোটা দাড়ির কুণ্ডলি পাকানো জট বেরিয়ে পড়লো। তোরণের ভেতর কামরাটায় ফারাও মামোসের যে প্রতিকৃতি আমরা দেখেছি, তাতে তাঁর দাড়ি ছিল হেনায় রাঙানো, বিড়বিড় করলো ও।
এটা দেখুন। এখানে মমির দাড়ি শুকনো ঘাসের মতো, সোনালি আর রুপার মতো। আর কোনো সন্দেহ নেই, আবার বলল ও। এটা ট্যানাস-এর মমি। ট্যানাস টাইটার বন্ধু ছিলেন, আর রানীর ছিলেন প্রেমিক।
রোয়েনের চোখে জল। হ্যাঁ, বলল ও। লসট্রিসের পুত্রসন্তানের আসল বাবা তিনিই, পরে যিনি ফারাও টামোস হয়েছিলেন, হয়েছিলেন বহু রাজার পূর্ব-পুরুষ। কাজেই ইনিই সেই ব্যক্তি, যার রক্ত প্রাচীন মিশরের ইতিহাস জুড়ে বইছে।
সেই অর্থে যে কোনো ফারাও-এর মতোই মহান ছিলেন তিনি, শান্ত সুরে বলল নিকোলাস।
*
কথাটা প্রথমে খেয়াল হলো রোয়েনের। নদী! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো, গলায় ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ ধার। নদী ফুলে উঠলে সব আবার হারিয়ে যাবে!
তবে সবই যে আমরা উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারব, তা ভাববেন না। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না এক জায়গায় এতো সম্পদ থাকতে পারে। এ দিকে আমাদের সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, রোয়েন।
তাহলে? চেহারা দেখে মনে হলো কেঁদে ফেলবে রোয়েন।
সবচেয়ে সুন্দর আর গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো ক্রেটে ভরব আমরা, বলল নিকোলাস। আল্লাই জানে সে-সময়ও পাব কিনা।
কাজেই চরম ব্যস্ততার সঙ্গে কাজ শুরু করলো ওরা। পাঁচটা রণক্ষেত্রের সমস্ত স্বর্ণমূর্তি প্রথমে বাক্স বন্দি করা হলো। পাঁচটা লম্বা বাক্স লাগলো ওগুলোর জন্য।
মূর্তি, দেয়ালচিত্র, ফার্নিচার আর অস্ত্রগুলো নেওয়ার কথা ভাবতেই পারা গেল না। পড়ে থাকবে তৈজসপত্র, কাপড়-চোপড় আর কসমেটিক্সও। সোনার তৈরি বিশাল একটা রথও চার হাজার বছর ধরে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই রেখে যাবে ওরা।
ট্যানাসের মাথা থেকে সোনার ডেথ-মাস্ক তুলে নিল ওরা, তবে মমিটা কফিনের ভেতর থেকে গেল। তারপর নতুন প্রধান পুরোহিত মাই মেতাম্মাকে খবর পাঠালো নিকোলাস। তাঁকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল প্রাচীন সেইন্টের মরদেহ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে, সেটা গ্রহণ করার জন্য বিশজন সন্ন্যাসীকে নিয়ে চলে এলেন তিনি। ধর্মীয় সঙ্গীত গাইতে গাইতে ট্যানাস-এর কফিন বয়ে নিয়ে গেলেন তারা, মঠের মাকডাস-এর স্থাপন করা হবে।
ইতোমধ্যে পাঁচটা রণক্ষেত্রের সমস্ত মূর্তি বাক্সে ভরার কাজ শেষ হয়েছে। তবে এগুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে ডেথমাস্ক। একটা ক্রেটের ভেতর অনায়াসে ভরা গেল ওটাকে, পাশে শোয়ানো হলো টাইটার ক্ষুদে মূর্তিটাকে। ক্রেটে ফোম ভরা হয়েছে, ঢাকনির উপর ওয়াটারপ্রুফ ওয়াক্স ক্রেয়ন দিয়ে লেখা হলো-মাস্ক ও টাইটার কাঠের মূর্তি।
বেশিরভাগ গুপ্তধনই ফেলে যেতে হবে, কারণ হাতে সময় নেই। গায়ে ছবি আঁকা কাঠের টেস্টগুলো আর্টিফ্যাক্টস হিসেবে অমূল্য, ভেতরের জিনিসপত্র ছাড়াই। কিন্তু অসংখ্য চেস্টের মধ্যে থেকে কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা নেবে ওরা? শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, চেস্টের ঢাকনি ও গায়ে আঁকা ছবি দেখে বাছাই করা হবে। তার আগে কয়েকটা ঢাকনি খুলে দেখে নিতে হলো ছবির সঙ্গে ভেতরের জিনিসপত্র মেলে কি না। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে ফারাও তার ব্লু যুদ্ধ মুকুট পরে আছেন, সেই মুকুট ভেতরেও পাওয়া গেল। শুধু যে বু ক্রাউন তাই নয়, লাল আর শাদা মুকুট জোড়াও অন্য একটা চেস্টে পেল ওরা। সবগুলোই অক্ষত ও অটুট অবস্থায় রয়েছে।
এরপর শুধু ছোটখাট আর্টিফ্যাক্ট ভরা হলো অ্যামুনিশন ক্রেটে। আকারে যেগুলো বড়, যতোই ঐতিহাসিক মূল্য থাকুক, বাদ দিতে হলো। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, রাজকীয় অলঙ্কার আর মূল্যবান পাথর ভরা চেস্টগুলো ক্রেটের ভেতর জায়গা করে নিতে পারছে, ফলে শুধু পাথর আর অলঙ্কারই নয়, চেস্টগুলোও অবিশ্বাস্য দামে বিক্রি করা যাবে। তারপর বড় আইটেমগুলো, তিনটি মুকুট আর রত্নখচিত কয়েকটা রক্ষাবরণ সহ, সদ্য তৈরি বড় কয়েকটা বাক্সে ভরা হলো।
