মেক সিদ্ধান্ত নিল, ওদেরকে যতোটা সম্ভব কাছাকাছি পৌঁছতে দেবে সে। সব কয়টাকে সাবাড় করতে পারলে ভালো হত, কিন্তু সেটা বেশি আশা করা হয়ে যায়। চার-পাঁচজনকে গায়েল করতে পারলেই খুশি সে, বাকিগুলো ঝোঁপ-ঝাড়ের মধ্যে পড়ে তারস্বরে চিৎকার করুক। যুদ্ধে আহত লোকদের চিৎকার দারুণ উপকারী, সঙ্গী যোদ্ধারা মাথা নিচু করে রাখে, গুলি করার জন্য মাথা তুলতে ভয় পায়।
পাথর ঝড়ানো ঢালে চোখ বুলাল মেক। আরপিডি লাইট মেশিন গান প্রতিপক্ষের অ্যাডভান্ড গ্রুপের দিকে তাক করা হয়েছে। সালিম, তার মেশিন গানার, একজন ওস্তাদ। বলা যায় না, সে পাঁচ-সাতজনকেও ফেলে দিতে পারে। তারপর মেক দেখলো, তার ঠিক নিচেই রিজে একটা ফাঁক রয়েছে। খোলা রিজ পার হওয়ার ঝুঁকি ওরা নেবে না, ভাবল সে। ওপরে উঠবে ওই ফাঁক গলে, একজন একজন করে। তার আগে ফাঁকটার কাছাকাছি জড়ো হবে ওরা। তখনই সুযোগ পাবে তার গেরিলারা।
আবার আরপিডি-র দিকে তাকালো মেক। সালিম তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, অপেক্ষা করছে সঙ্কেত পাওয়ার। ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেল মেকের দৃষ্টি। যা ভেবেছে, লাইনটা এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে। বাম দিকের দীর্ঘদেহী লোকটা এরই মধ্যে পরিজশন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। তার দু পাশের দু জন লোক তির্যক এগোচ্ছে ফাঁকটার দিকে।
ঝোঁপ-ঝাড়ের সঙ্গে কর্নেল নগুর সৈনিকদের ক্যামোফ্রেজ হুবহু মিলে গেছে, তাদের অস্ত্র ক্যামোফ্লেজ নেটিঙে ঢাকা, রোদ যাতে প্রতিফলিত না হয়। ঝোঁপের ভেতর প্রায় অদৃশ্যই তারা, শুধু নড়াচড়া আর গায়ের রঙ ধরা পড়েছে চোখে। তারা এখন এতো কাছে, মাঝে মধ্যে দু একজনের চোখের মণি দেখতে পাচ্ছে মেক। কিন্তু এখনো তাদের মেশিন গানারকে সে দেখতে পাচ্ছে না।
প্রথম এক পশলা গুলিতেই প্রতিপক্ষের মেশিন গান স্তব্ধ করে দিতে হবে। আরে, ওই তো! ডান দিকের লাইনে দেখা যাচ্ছে গানারকে। লোকটা খাটো আর শক্ত-সমর্থ, কাঁধ দুটো ভারী, হাতগুলো লম্বা, লাইট মেশিন গানটাকে অনায়াসে বহন করছে নিতম্বের কাছে। অস্ত্রটা চিনতে পারলো মেক, রাশিয়ায় তৈরি ৭.৬২ আরপিডি। অ্যামুনিশন বেল্ট কাঁধ থেকে ঝুলছে, পিতলের কার্ট্রিজ চকচক করায় ধরা পড়ে গেল লোকটা।
নিচের নামছে মেক, বেসের চারদিকে ছড়িয়ে থাকা বোল্ডার আড়াল দিচ্ছে তাকে। নিচের একেএম-এর রেট-অব-ফায়ার সিলেক্টর র্যাপিড-এর ঠেলে দিল সে, মুখের একটা পাখ ঠেকালো কাঠের স্টকে। জিনিসটা অ্যাসল্ট রাইফেল, তবে কারিগরি ফলিয়ে নিখুঁত করা হয়েছে।
মেক যেখানে শুয়ে আছে যেখান থেকে আরপিডি বহনকারী প্রতিপক্ষ লোকটা আর মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরে, উঠে আসছে ঢাল বেয়ে। ডান দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল সে, আরো তিনজন লোক ফাঁকটা লক্ষ্য করে উঠছে-মাত্র এক পশলা গুলি করেই ওদের ব্যবস্থা করতে পারবে সালিম। এরপর আরপিডি মেশিন গানারের পেটে লক্ষ্যস্থির করলো সে, ট্রিগার টানলো তিনবার।
তিনটে বিস্ফোরণ তালা লাগিয়ে দিল কানে, তবে মেক দেখতে পেল বুলেটগুলো টার্গেট মিস করেনি, পেট থেকে গলা পর্যন্ত তিনটে গর্ত তৈরি করেছে। নিচেরটা লেগেছে নাভির কাছে, ওপরেরটা গলায়।
মেকের চারদিক থেকে গেরিলারা গুলি করছে। যে ভাবছে, কে জানে প্রথম দফায় কজনকে ফেলতে পারলে সালিম। না, দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। শত্রুপক্ষের সবাই ঝোঁপের নিচে। পাল্টা গুলিও হয়েছে, নীল ধোয়া দেখা যাচ্ছে ঝোঁপের মাথায়। কয়েক সেকেন্ড পার হয়ে গেল, তারপর শোনা গেল বিকট চিৎকার, আমাকে লেগেছে! আল্লাহর দোহাই, আমাকে বাঁচাও! তার চিৎকার পাহাড়ে লেগে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মেক তার একে এম-এ নতুন ক্লিপ পরালো।
গা, আরো, গান গা! বিড়বিড় করলো সে।
*
নিকোলাস আর রোয়েন তো হাত লাগালোই, কফিন থেকে ঢাকনিটা তুলতে হানশিত শেরিফের আরো আটজন লোকের সাহায্য নিতে হলো। তোলার পর সবার হাত-পায়ের পেশী থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো, খুব সাবধানে তারা সেটাকে সমাধির দেয়াল ঘেঁষে নামিয়ে রাখলো। এরপর কফিনের পাশে এসে ভেতরে তাকালো নিকোলাস ও রোয়েন।
পাথরের তৈরি কফিনের ভেতর আরো একটা কফিন রয়েছে, এটা কাঠের। এটার ঢাকনিতেও খোদাই করা হয়েছে ফারাও-এর আকৃতি। এখানে দেখানো হয়েছে তার লাশের ছবি, হাত দুটো বুকের উপর ভাঁজ করা, এক হাতে বাঁকা লাঠি। চেহারায় ফুটে আছে সুখময় প্রশান্তি।
দ্বিতীয় কফিনটা বের করলো ওরা, পাথুরে ঢাকনির চেয়ে এটার ওজন কম। সাবধানে গোল্ডেন সীল আর শুকনো রেজিনের শক্ত স্তরে ফাটল ধরালো নিকোলাস, তা না হলে ঢাকনিটা আলগা করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয় ঢাকনি সরাবার পর দেখা গেল ভেতরে আরো একটা কফিন। সেটা খোলার পর আরো একটা। এভাবে সব মিলিয়ে সাতটা কফিন পাওয়া গেল, একটার চেয়ে অপরটা আকারে একটু ছোট, তবে অলঙ্করণের মাত্রা ক্রমশ বাড়লো। সপ্তম কফিনটা পূর্ণ দৈর্ঘ্য একজন মানুষের চেয়ে আকারে সামান্য বড়, এটা তৈরি করা হয়েছে সোনা দিয়ে। পালিশ করা সোনায় ল্যাম্পের আলো পড়তে মনে হলো এক হাজার আয়না ঝলমল করে উঠলো, সমাধির প্রতিটি কোণ উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো সোনালি আভায়।
অবশেষে সপ্তম কফিন খোলার পর দেখা গেল ভেতরে ফুল রয়েছে। কুঁড়ি আর পাপড়িগুলো শুকিয়ে গেছে, অদৃশ্য হয়েছে রঙও। সুগন্ধও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, রয়েছে শুধু পচা একটা ঝাঁঝ। পাপড়িগুলোর এমন অবস্থা, ছুঁতে না ছুঁতেই খুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে। ফুলের নিচে রয়েছে মিহি লিনেন। এক সময় নিশ্চয়ই বকের পালকের মতো সাদা ছিল, এখন খয়েরি দেখাচ্ছে-পচা ফুলের রস ঝরে পড়ায়। নরম ভাজের ভেতর সোনার চকচকে ভাব দেখতে পেল ওরা।
