কফিনটা বুক সমান উঁচু। সাইড প্যানেগুলো ভিত বা বেদীর সঙ্গে গাঁথা মনে হলো; ফারাও ও অন্যান্য দেবতাদের ছবি খোদাই করা। ঢাকনিতে একা শুধু রাজার চেহারা খোদাই করা হয়েছে, পুরো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ জুড়ে। দেখেই ওরা বুঝতে পারল, ঢাকনিটা এখনো আদি অবস্থানে রয়েছে, পুরোহিতের মাটির সীল পুরোপুরি অক্ষত। এ সমাধিতে কখনো কারো অনুপ্রবেশ ঘটে নি। ফারাও মামোসের মমি চার হাজার বছর ধরে নির্বিঘ্নে শুয়ে আছে এখানে।
তবে ওদেরকে বিস্মিত করলো অন্য দুটো জিনিস। কফিনের উপর পড়ে রয়েছে অদ্ভুত সুন্দর একটা ধনুক। লম্বায় প্রায় নিকোলাসের সমান, স্টক-এর পুরোটা দৈর্ঘ্য ইলেকট্রাম কয়েল দিয়ে জড়ানো-সোনা ও রুপার এ মিশ্রণ পদ্ধতি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
আরেকটা জিনিস, যা কখনই কোনো রাজকীয় সমাধিতে থাকার কথা নয়, দাঁড়িয়ে আছে কফিনের গোড়ার কাছে। পুতুল আকৃতির মানুষের একটা মূর্তি। এক পলক তাকিয়েই জিনিসটার উন্নত মান ও পরিচয় বুঝতে পারলো ওরা, খানিক আগে সমাধির বাইরে এ মূর্তির আঁকা মুখ দেখেছে ওরা তোরণশোভিত কামরাটায়।
টাইটার কথাগুলো, স্ক্রোলে ওরা পড়েছে, মনে হলো সমাধির ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এ মুহূর্তে, জোনাকির মতো জ্বল জ্বল করছে কফিনের উপর
শেষবারের মতো যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম পাথুরে শবাধারের কাছে, সমস্ত শ্রমিকদের দূরে সরিয়ে দিলাম আমি। আমার পরে আর কারো পা পড়বে না এ সমাধিতে। একা হতে কাপড়ের পুঁটুলিটা খুললাম। সেই লম্বা ধনুক-লানাটা বেরুলো ওটা থেকে। আমার মিসট্রেসের নামে ওটার নাম দিয়েছিল ট্যানাস। কেবলমাত্র ওরই জন্য আমি তৈরি করেছিলাম ধনুকটা। আমাদের দু জনের পক্ষ থেকে শেষ এ উপহার ট্যাসের জন্য। সীল করা পাথরের কফিনের ডালার উপরে ওটা রেখে দিলাম।
আরো একটা জিনিস ছিল পুঁটুলিতে। আমার নিজহস্তে খোদাই করা একটা উশব তি পুতুল। শবাধারের পায়ের কাছে রাখলাম ওটা। ওটা খোদাই করার সময় তামার আয়না রেখেছিলাম সামনে–যাতে করে নিজের অবয়ব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারি। পুতুলটা ছিল একটা ছোটো টাইটা।
পুতুলের নিচের অংশে কাঠ খোদাই করে লিখেছিলাম —
কফিনের গোড়ায় হাঁটুগেড়ে বসলো রোয়েন, ছোট্ট পতুলটা হাতে নিল। গোড়ায় খোদাই করা হায়ারোগ্লিফিক্স দেখছে। ওর পাশে হাঁটুগেড়ে নিকোলাস বলল, পড়ুন তো দেখি।
নরম সুরে শুরু করলো রোয়েন, ঠিক আছে। আমি টাইটা। আমি একজন চিকিৎসক এবং কবি। আমি একজন স্থপতি এবং দার্শনিক। আমি তোমার বন্ধু। তোমার পক্ষ থেকে আমি জবাবদিহি করব।
তাহলে দেখা যাচ্ছে সবই সত্যি, ফিসফিস করলো নিকোলাস।
ঠিক যেখান থেকে তুলেছে সেখানেই মূর্তিটা নামিয়ে রাখলো রোয়েন। তারপর মুখ তুলে নিকোলাসের দিকে তাকালো।
এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। আমি চাই এ মুহূর্ত যেনো শেষ না হয়।
কখনোই শেষ হবে না, প্রিয়। তোমার আর আমার কেবল শুরু। নিকোলাস বলল ওকে।
*
ওদেরকে আসতে দেখছে মেক। পাহাড়ের নিচের ঢালের কিনারা ঘেঁষে এগুচ্ছে দলটা। ঘন ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতর দিয়ে আসছে, বুশ-ফাইটারের তীক্ষ্ণ সৃষ্টি ছাড়া দেখতে পাবার কথা নয়। প্রতিপক্ষ দলের শক্তি-সামর্থ্য উপলব্ধি করে হতাশ হলো মেক। ওরা ক্র্যাক ট্রপস, দীর্ঘ বহু বছর যুদ্ধ করে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। অত্যাচারী মেনজিসটুর বিরুদ্ধে লড়ার সময় এরাও তার দলে ছিল, ওদের অনেককেই সে ট্রেনিং দিয়েছে। পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় এখন ওরা তার সঙ্গে লড়তে আসছে। গোটা আফ্রিকা মহাদেশে এটাই হচ্ছে নিষ্ঠুর বাস্তবতা, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সংগ্রামে পুষ্টি যোগায় প্রাচীন উপদলীয় কোন্দল, বর্তমান কালের রাজনীতিকদের লোভ আর দূনীতি।
তবে ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করার সময় এটা নয়। নিচের রণক্ষেত্রে কি কৌশল কাজে লাগবে সেটাই এখন তাকে খুঁজে বের করতে হবে। ওরা যারা আসছে তারা অবশ্যই দক্ষ নৈতিক। খুব আর লোককেই দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগই গা ঢাকা দিয়ে আছে। কোম্পানি স্ট্রেংথ, ভাবল সে, তারপর নিজের ছোট্ট ফোর্সের দিকে তাকালো। পাথরের ভঁজে লুকিয়ে আছে চৌদ্দজন গেরিলা। চমকে দেয়ার সুযোগ নিয়ে প্রতিপক্ষের উপর যতটা সম্ভব জোরালো আঘাত হেনে পিছু হটতে হবে ওদেরকে, কর্নেল নগুর মর্টার শেল ওদের শুয়ে থাকা জায়গায় ছুটে আসার আগেই।
আকাশের দিকে তাকিয়ে মেক ভাবল কর্নেল নগু বিমান হামলাও শুরু করবেন কিনা। আদ্দিসের এয়ার-বেস থেকে রুশ টুপোলেভ বহুবার এখানে আসতে সময় নেবে পঁয়ত্রিশ মিনিট। নাপামের গন্ধটা কল্পনা করলো সে, মনের চোখ দিয়ে দেখতে পেল আগুনের ঢেউ ওদের দিকে দ্রুত গড়িয়ে আসছে। তবে না, বিমান হামলার ঝুঁকি কর্নেল নগু বা তার পে-মাস্টার জার্মান হের ফন শিলার নেবেন না। গিরিখাদে নিকোলাস যা আবিষ্কার করেছে সেসব দখল করাই ওঁদের উদ্দেশ্য, ধ্বংস করা নয়। লুটের মাল আদ্দিসের কাউকে ভাগ দিতেও ওঁরা রাজি হবেন না। অ্যাবে গিরিখাদে এটা তাদের ব্যক্তিগত অভিযান, সরকারকে জানাবার মতো বোকামি তারা করবে না।
ঢালের গা বেয়ে আবার নিচে নেমে গেল মেকের দৃষ্টি। শত্রুপক্ষ পাহাড়ের কিনারা ঘেঁষে ডানডেরা নদীর দিকে এগুচ্ছে, উদ্দেশ্য নদীর পাশে ট্রেইলে অবস্থান গ্রহণ। খানিক পরই ওপরে, এ দিকটার একটা পেট্রল পাঠাবে ওরা, নিজেদের একটা পাশ সুরক্ষিত করার জন্য, তারপরই সরাসরি ওপরে উঠবে। হ্যাঁ, ওই তো ওদেরকে দেখা যাচ্ছে। আট-না, দশজন লোক মুল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, সরাসরি তার নিচে থেকে উঠে আসছে উপর দিকে।
