ঢাকনিতে যা দেখছি, বাক্সের ভেতরও কী তাই আছে? ফিসফিস করে জানতে চাইলো রোয়েন।
এমন কী নিকোলাসও চিন্তা করতে গিয়ে একটা ঢোক গিলল। রোয়েনের প্রশ্নের উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, এ বিপুল ঐশ্বর্য কল্পনা করা সত্যি কঠিন। কোনো বাক্স না খুলেই ইতোমধ্যে ওরা যা দেখেছে, তার মূল্য বুঝতে হলে কমপিউটার নিয়ে বসতে হবে। পরিমাণে এতো বিপুল প্রত্ন সম্পদ এর আগে কোথাও পাওয়া যায় নি।
আপনার মনে আছে, স্ক্রোলে কী লিখেছিল টাইটা?
এতো বেশি গুপ্তধন কোনো কালে কোথাও এক জায়গায় জড়ো করা হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। দেখে মনে হচ্ছে কোনো কিছুতেই হাত দেওয়া হয় নি। ফারাও মামোসের ট্রেজার পুরোটাই আছে এখানে।
পেছনের অর্থাৎ তৃতীয় সারির স্টোরগুলোয় রয়েছে চীনামাটি আর কাঠের মূর্তি–উশব তি। এমন কোনো পেশা বা ব্যবসার লোক নেই যাদের মূর্তি এখানে পাওয়া যাবে না। পুরোহিত, লিপিকার, আইনবিশারদ, চিকিৎসক, কৃষক, মালী, রুটি আর মদ তৈরির কারিগর, নর্তকী, নাবিক, রজকিনী, সৈনিক, সাধারণ শ্রমিক, খোঁজা প্রহরী, রাজমিস্ত্রী, বাজনদার, মুসাফির, ভবঘুরে-সমাজের সর্ব স্তরের সবাই আছে, এমন কী বেশ্যাও। প্রত্যেকের হাতে নিজ নিজ পেশার যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম। এরা সবাই পরলোকে রাজার সঙ্গী হবে, সেবা করবে ফারাও-এর।
তোরণশোভিত বিশাল কামরার শেষ মাথায় এসে পৌঁছল ওরা। সামনে এককালে ছিল কয়েক সারিতে টাঙানো সাদা লিনেন। ওগুলোর রঙ এখন আর সাদা নেই, পর্দাও আর পর্দা নেই। সব পচে গিয়ে রিবনের মতো লম্বা হয়ে ঝুলে আছে, দেখে মনে হচ্ছে নোংরা মাকড়সার জাল অথচ তারপরও পর্দায় লাগানো রত্নগুলো রিবনের সঙ্গে ঝুলছে, জেলের জালে ধরা পড়া চকচকে মাছের মতো। জালের ভেতর আরো একটা দরজা দেখতে পেল ওরা।
ওটা নিশ্চয়ই মূল সমাধিতে ঢোকার পথ, ফিসফিস করলো রোয়েন। রাজা আর আমাদের মাঝখানে এখন শুধু পচা খানিকটা জাল ছাড়া আর কিছু নেই।
কিন্তু দু জনই ওরা পা বাড়াতে দ্বিধায় ভুগছে। সামনে কোনো বিপদ নেই তো? টাইটার তৈরি সবগুলো ফাঁদ কী ওরা পেরিয়ে এসেছে?
*
গেরিলাদের মধ্যে কোনো ডাক্তার নেই, কমান্ডার মেকই আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা করে, তার হাতের কাছে সব সময় একটা মেডিকেল কিটও থাকে। পাথরখনির কাছাকাছি একটা কুঁড়েতে টিসেকে বয়ে নিয়ে এলো গেরিলারা, কুঁড়েটা ঘাসের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ছেঁড়া ট্রাইজার আর শার্ট খুলে টিসের ক্ষতগুলো ডিসইনফেকট্যান্ট দিয়ে ধুলো মেক, তারপর ফিল্ড ড্রেসিং দিয়ে প্রায় সবগুলো ঢেকে দিল। তারপর উপুড় করা হলো টিসেকে, অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দেওয়ার জন্য। ব্যথা পেয়ে উফ করে উঠলো টিসে। মেক নরম সুরে বলল, আমার হাত ডাক্তারদের মতো ভালো নয়।
তবু আমার ভাগ্য যে তোমার হাতেই চিকিৎসা পাচ্ছি, বলল টিসে। জানো, মৃত্যু ভয়ের চেয়ে বেশি ভুগেছি তোমাকে আর দেখতে পাব না ভেবে।
নিজের প্যাক থেকে সোয়েটশার্ট আর ফেটিগ বের করে টিসেকে পরিয়ে দিল মেক, কয়েক সাইজ বড় হয়েছে গায়ে। কালচে, ফোস্কা পড়া ঠোঁট নেড়ে টিসে বিড়বিড় করলো, কুৎসিত লাগছে আমাকে, তাই না?
সাবধানে তার গালে আঙুল বুলাল মেক। আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে তুমি, চিরকাল তাই থাকবে।
ঠিক সেই মুহূর্তগুলির আওয়াজ শুনলো ওরা। অনেক দূর থেকে ভেসে এলো, বয়ে নিয়ে এলো উত্তরে বৃষ্টি ভেজা বাতাস। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো মেক। শুরু হয়েছে। কর্নেল নৃগু হামলা করেছেন।
আমার দোষ। আমিই তাঁকে… .
না, দৃঢ় সুরে বলল মেক। তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি কথা না বললে ওরা তোমাকে মেরেই ফেলত। আর হামলা ওরা এমনিতেও করত। ওয়েবিং বেল্ট তুলে কোমরে জড়ালো সে। এবার দূর থেকে ভেসে এলো মর্টার শেলের আওয়াজ। আমাকে এবার যেতে হবে, টিসে।
জানি। আমার জন্য চিন্তা করো না।
তোমার চিন্তাই যুদ্ধ করতে উৎসাহ যোগাবে আমাকে। আমার লোকজন মঠে নামিয়ে নিয়ে যাবে তোমাকে। এক পর্যায়ে সবাই ওখানে জড়ো হব আমরা। যা-ই ঘটুক, ওখানে আমার জন্য অপেক্ষা করবে তুমি। কর্নেল নগুকে বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারব না। তাঁর শক্তি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। খুব তাড়াতাড়ি আবার দেখা হবে আমাদের।
তোমাকে ভালোবাসি, ফিসফিস করলো টিসে। তোমার জন্য চিরকাল অপেক্ষা করব।
দরজার কাছে মাথা নিচু করে কুঁড়ে থেকে বেরিয়ে গেল মেক।
*
পর্দার ফ্রেমে হাত ছোঁয়াতেই জালের মতো রিবনগুলো টাইলের মেঝেতে খসে পড়লো। জালে আটকানো রত্নগুলো মেঝেতে পড়ে জলতরঙ্গের মতো আওয়াজ তুললাম। জালের গায়ে ভেতরে ঢোকার জন্য যথেষ্ট বড় একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। রোয়েনের হাত ধরে পা বাড়ালো নিকোলাস, থামলো ইনার ডোরওয়ের সামনে। দরজা বা ফাঁকটার এক পাশে পাহারায় রয়েছে মহান দেবতা ওসিরিস-এর বিশাল এক মূর্তি, হাত দুটো বুকের উপর ভাঁজ করা, এক হাতে বাঁকা লাঠি। উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর স্ত্রী আইসিস, মাথায় লুনার ক্রাউন আর শিং। তাঁদের উদাস চোখের দৃষ্টি অনন্ত-অসীমের দিকে প্রসারিত, চেহারায় প্রশান্তির ভাব। বারো ফুট উঁচু জোড়া মূর্তির মাঝখান দিয়ে এগুলো রোয়েন ও নিকোলাস এবং অবশেষে ফারাও মামোসের আসল সমাধিতে পৌঁছে গেল।
ছাদটা গম্বুজ আকৃতির, গম্বুজ আর দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে-ফরমাল ও ক্ল্যাসিকাল। রঙ এখানে আরো গাঢ়, প্যাটার্নগুলো জটিল। যতটা আশা করেছিল ওরা তার চেয়ে আকারে ছোট চেম্বারটা। স্বর্গীয় ফারাও মামোসের বিশাল এ্যানিট কফিনেরই শুধু জায়গা হয়েছে।
