নিকোলাসের দিকে অবিশ্বাস ভরা চোখে তাকালো রোয়েন। যাহ্! এতো?
এতোই। কিংবা আরো বেশি। এগুলো আমরা, যুদ্ধ ক্ষেত্রের এ মডেল পাঁচটা, লম্বা ক্রেটে ভবে। আমার ধারণা দুটো ক্ৰেটেই সবগুলোর জায়গা হয়ে যাবে।
চারদিকে চোখ বুলাচ্ছেল রোয়েন, হঠাৎ নিকোলাসের হাত ধরে ঝাঁকালো। নিকোলাস, স্টোরের সারি একটা নয়! দেখুন, প্রথম সারর পেছনে আরো এক সারি স্টোর রয়েছে।
একজোড়া স্টোরের মাঝখানে সরু প্যাসেজ দেখা গেল, তার ভেতর দিয়ে পেছনের সারির স্টোরগুলোর সামনে চলে এলো ওরা। তারপর দেখা গেল, দুই সারি নয়, আসলে তিন সারি স্টোর রয়েছে। প্রতিজোড়া স্টোরের মাঝখানের দেয়ালে চোখ জুড়ানো সব ছবি আঁকা, সবগুলোতেই রাজার জীবনকাহিনীর দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনো ছবিতে কন্যাদের সঙ্গে খেলছেন বা কৌতুক করছেন, কোনো ছবিতে পুত্রসন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করছেন। মন্ত্রী পরিষদের সঙ্গে মিটিং করছেন বা উপপত্নীদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। ভোজনের দৃশ্যও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, পুরোহিতদের সঙ্গে বসে আছেন রাজা। প্রতিটি মানুষকে আঁকা হয়েছে চোখে দেখে, প্রতিটি চরিত্রই বাস্তব থেকে নেওয়া।
বিশাল কামরাটার সেন্ট্রাল প্যানেলগুলোর সামনে এসে দাঁড়ালো ওরা। একটা প্যানেলের দিকে হাত তুলে রোয়েন বলল, এটা নিশ্চয়ই টাইটার আত্মপ্রতিকৃতি। ওটা একজন খোঁজা ব্যক্তির প্রতিকৃতি।
নিজের চেহারা আঁকতে গিয়ে টাইটা কী পোয়েটিক লাইসেন্স নিয়েছে? নাকি সত্যিসত্যি এতো সুদর্শন ছিল সে? ক্রীতদাসের চেহারায় এতোটা আভিজাত্য থাকতে পারে?
সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কাড়ে টাইটার বৃদ্ধিদীপ্ত চোখ জোড়া। সেই চোখে তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী দৃষ্টি। শিল্পীর হাত এতো ভালো, ওরা যে তীব্র দৃষ্টিতে তাকে দেখছে, সে-ও ওদেরকে একই দৃষ্টি ফিরিয়ে দিচ্ছে। ক্ষীণ, স্মিত হাসি লেগে রয়েছে টাইটার মুখে। পেইন্টিংটা বার্নিশ করা, ফলে সুরক্ষিত রয়েছে, দেখে মনে হচ্ছে গতকাল আঁকা হয়েছে ছবিটা। টাইটার ঠোঁট একটু ভেজা ভেজা, চোখ দুটোয় চকচকে ভাব।
গায়ের রঙ ফর্সা, মন্তব্য করলো নিকোলাস। চোখ নীল। তবে লাল চুল রঙ–করা হয়েছে হেনা দিয়ে।
কে জানে কোথায় টাইটার জন্ম। স্ট্রোলের কোথাও এ সম্পর্কে কিছু বলেনি টাইটা। গ্রিস বা ইটালি হতে পারে না। জলদস্যু হতে পারে? জার্মান বা ভাইকিং? আসলে টাইটার রুটস কোনো দিনই জানা যাবে না, সে নিজেও সম্ভবত জানত না।
পাশের প্যানেলের দেখা যাচ্ছে তাকে, বলল নিকোলাস।
এ প্যানেলে রাজা ও রানীর সামনে নতজানু হয়ে প্রণাম করছে টাইটা, রাজা ও রানী পাশাপাশি দুটো সিংহাসনে বসে আছেন। হিচককের মতো, বলল রোয়েন। নিজের সৃষ্টির মধ্যে উপস্থিত থাকতে ভালোবাসত টাইটা।
আরো এক সারি স্টোরের সামনে দিয়ে হেঁটে এলো ওরা। এগুলোয় ঠাসা রয়েছে তৈজসপত্র বাসনকোসন, জার, গামলা, পানপাত্র, হাতা-চামচ। বেশিরভাগ সোনা বা রুপার তৈরি। পালিশ করা ব্রোঞ্জ আয়না দেখা গেল। মূল্যবান সিল্ক আর লিনেন-এর রোল রয়েছে, অনেক কাল আগেই পচে গিয়ে নরম ছাইয়ের স্তূপে পরিণত হয়েছে। তারপর, দু সারি স্টোরের মাঝখানের দেয়ালে দেখা গেল হিকসস-এর সঙ্গে যুদ্ধের দৃশ্য, যে যুদ্ধে ফারাও আহত হয়েছিলেন। হিকসসের নিক্ষিপ্ত তীর রাজার বুকে বিঁধে আছে, হাতে সার্জিকাল ইন্সট্রুমেন্ট, রাজার বুকের গভীর থেকে তীরটা বের করে আনছে।
এরপর ওরা সারি সারি কুলুঙ্গির সামনে এসে দাঁড়ালো, ভেতরে কয়েক শো সিডার কাঠের বাক্স বা চেস্ট। বাক্সগুলোর গায়ে রাজার প্রতীক চিহ্ন আঁকা, আর ছবিগুলোতে দেখা যায় রাজা টয়লেটে রয়েছেন, সুর্মা লাগাচ্ছেন চোখে, লাল রঙ দিয়ে রঙিন করছেন চেহারা, নাপিতরা তাঁর দাড়ি কামাচ্ছে, চাকর-বাকরা পরাচ্ছে রাজকীয় পোশাক।
কিছু বাক্সে রাজকীয় প্রসাধনী আছে, বলে উঠলো রোয়েন। বাকিগুলোতে ফারাও-এর কাপড়চোপড়।
পাশের দেয়ালের দৃশ্যগুলোয় দেখা যাচ্ছে রাজা বিয়ে করছেন। কুমারী লসট্রিস, রানী হতে যাচ্ছেন। টাইটা ছিল রানী লসট্রিসের ক্রীতদাস। সে তার কত্রীর অবয়ব আঁকার সময় সমস্ত মেধা ঢেলে দিয়েছে। রানীর চেহারার খুঁটিনাটি সূক্ষ্ম সব বৈশিষ্ট্য এতো নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে, নিষ্পলক তাকিয়ে শুধু দেখতেই ইচ্ছে করে। কোনো সন্দেহ নেই শিল্পী এখানে অতিরঞ্জনের স্বাধীনতা নিয়েছে। নগ্ন স্তন জোড়ার উপর সযত্নে টানা ব্রা শুধু নিখুঁত আকৃতি দেওয়ার কাজ করে নি, যৌন বিশুদ্ধতা ফুটিয়ে তোলারও চেষ্টা করেছে।
টাইটা কতোই না ভালোবাসত রানীকে, বলল রোয়েন, বলার সুরে ক্ষীণ ঈর্ষার ছোঁয়া থেকে গেল। প্রতিটি রেখায় তার প্রমাণ পাবেন আপনি।
মৃদু হেসে, এক হাতে রোয়েনের কাঁধ জড়িয়ে ধরলো নিকোলাস।
পরবর্তী সারির কুলুঙ্গিতে আরো কয়েকশো কাঠের বাক্স রয়েছে, ঢাকনির উপর : রাজার ক্ষুদে প্রতিকৃতি, সমস্ত অলঙ্কার পরে আছেন। তাঁর আঙুল আর গোড়ালিতে আঙটি ও ঘুঙুর, বুক সোনার মেডেলে মোড়া, বাহু আর কব্জিতে বালা পরানো। একটা প্রতিকৃতিতে দেখা গেল রাজা একত্রিত দুই মিশরীয় রাজ্যের জোড়া মুকুট পরে আছেন। একটা লাল অপরটা সাদা-মুকুটের কপালে শকুন আর গোক্ষুরের মাথা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের মুকুট ব্যবহার করতেন তিনি। সব মিলিয়ে বারোটা মুকুট দেখলো ওরা।
