টাইটা! ভাঙা ও কাঁপা আওয়াজ বের হলো রোয়েনের গলা থেকে। এগুলো তার আঁকা। টাইটার বৈশিষ্ট্যই আলাদা, চিনতে আমি ভুল করি না। তার কাজ যেখানেই দেখি, চিনতে পারব।
উপরের ধাপটায় দাঁড়িয়ে সবিস্ময় তিনদিকে তাকাচ্ছে ওরা। এগুলোর তুলনায় লম্বা গ্যালারির দেয়ালচিত্র ম্লান তো বটেই, অনুকরণ দোষেও দূষিত। এগুলো মহান এক শিল্পীর কাজ, কালজয়ী প্রতিভার, যার শিল্পকর্ম চার হাজার বছর পরও মানুষকে মুগ্ধ বিস্ময়ে স্তম্ভিত করে দিতে পারে।
ওরা খুব ধীর পায়ে সামনে এগুলো, প্রায় একটা ঘোরের মধ্যে। তোরণ পেরিয়ে আসার পর দেখলো দু দিকের দেয়াল ঘেঁষে সারির সারি ক্ষুদে চেম্বার রয়েছে, প্রাচ্যের বাজারগুলোয় যেমন ছোট দোকান-ঘর দেখা যায়। প্রতিটি দোকানের প্রবেশমুখে পাহারা দিচ্ছে লম্বা স্তম্ভ, উঁচু হয়ে ছাদ ছুঁয়েছে। প্রতিটি স্তম্ভ দেবতাদের একেকটা মূর্তি। মূর্তিগুলোই আসলে গম্বুজ আকৃতির সিলিংটাকে মাথায় করে রেখেছে।
প্রথম দুটো দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো নিকোলাস, চাপ দিল রোয়েনের বাহুতে। ফিসফিস করে বলল, ফারাও-এর ট্রেজার চেম্বার। চেম্বার বা দোকানগুলো মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত অদ্ভুত সুন্দর সব জিনিসে ঠাসা।
এগুলো ফার্নিচার স্টোর, বিড়বিড় করলো রোয়েন। চেয়ার, টুল, খাট আর ডিভানের আকৃতি স্পষ্ট চিনতে পারছে ও। কাছের স্টলের সামনে চলে এলো, হাত বাড়িয়ে রাজকীয় একটা সিংহাসন ছুঁলো। একেকটা বাহু পরস্পরকে পেঁচিয়ে থাকা একজোড়া করে সরীসৃপ, ব্রোঞ্জ আর ল্যাপিস ল্যাজুলাই দিয়ে তৈরি। পায়াগুলো সোনা দিয়ে তৈরি সিংহের থাবা। সীট আর পিঠে শিকার ধাওয়া করার দৃশ্য আঁকা হয়েছে। পিঠের মাথায় সোনার তৈরি একজোড়া ডানা।
সিংহাসনের পেছনে সাজানো রয়েছে অসংখ্য ফার্নিচার। জালি দিয়ে ঢাকা একটা ডিভান চিনতে পারলো ওরা, জালিটা আবলুস কাঠ আর আইভরি দিয়ে তৈরি। তবে ডজন ডজন আরো বহু জিনিস রয়েছে, বেশিরভাগই বিভিন্ন অংশ খুলে আলাদা করা, ফলে কোনটা যে কী চেনা গেল না। প্রতিটি অংশ দামি মেটাল আর রঙিন রত্নখচিত, তাকালেই দৃষ্টিবিভ্রম ঘটছে। তোরণের দু পাশে সারি সারি ছোট আকৃতির কুলুঙ্গি দেখা গেল, সেগুলো আশ্চর্য সুন্দর কালেকশনে ভরা। প্রতি জোড়া কুলুঙ্গির মাঝখানে মৃতের পুস্তক থেকে নেওয়া উদ্ধৃতি লেখা হয়েছে, লেখা হয়েছে। তোরণসমূহ পেরিয়ে ফারাও-এর ভ্রমণ কাহিনীর বিবরণ, ট্রেইলে কতো রকমের বিপদ ওত পেতে ছিল, দৈত্য আর দানবরা কীভাবে তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
লম্বা গ্যালারির নকল সমাধিতে এ পেইন্টিং ছিল না, নিকোলাসকে বলল রোয়েন। একবার শুধু রাজার মুখে দিকে তাকান। বুঝতে পারবেন উনি সত্যিকার একজন বাস্তব চরিত্র ছিলেন।
ওদের পাশের দেয়ালচিত্রে দেখা যাচ্ছে মহান দেবতা ওসিরিস ফারাও-এর হাত ধরে পথ দেখাচ্ছেন, কাছে সরে আসা দানবদের কবল থেকে রক্ষা করছেন তাঁকে।
ফিগারগুলো দেখুন, সায় দিয়ে বলল নিকোলাস আড়ই কাটের পুতুলের মতো নয়, সব সময় ডান পা বাড়িয়ে রেখেছে। এগুলো বাস্তবে দেখা পুরুষ ও নারী। প্রতিটি ফিগার অ্যানাটমিক্যালি কারেক্ট। শিল্পী হিউম্যান বডি স্টাডি করেছেন, শারীরিক কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল তার।
পাশের দেয়ালের খুপরির সামনে থামলো ওরা। ভেতরে অস্ত্র আর যুদ্ধের সরঞ্জাম দেখা গেল। রথের প্যানেলগুলো সোনার তৈরি পাতা দিয়ে ঢাকা, ফলে চোখ ধাধিয়ে গেল। সাইড প্যানেলে, প্রতিটি লম্বা চাকার পেছনে, সাজানো রয়েছে তীর আর বর্শা। রথের পাশে রয়েছে স্তূপ করা ছোরা আর আইভরির হাতলসহ তলোয়ার, ফলাগুলো চকচকে ব্রোঞ্জ। র্যাকে রাখা হয়েছে বলুম। ঢালগুলো ব্রোঞ্জের তৈরি, ঢালের গায়ে যুদ্ধবিজয়ের দৃশ্য, সঙ্গে স্বর্গীয় মামোসের প্রতিকৃতি আঁকা। কুমীরের চামড়া দিয়ে তৈরি হেলমেট আর ব্রেস্টপ্লেট দেখলো ওরা।
পাশাপাশি পাঁচটা ক্ষুদে চেম্বারে রয়েছে পাঁচটা যুদ্ধক্ষেত্রের মডেল। প্রতিটি দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে শত শত সৈন্য রথ নিয়ে আক্রমণের জন্য তৈরি। সৈনিক, ঘোড়া, রথ, অস্ত্র সবই স্বর্ণের। প্রতিটি মূর্তি বা আকৃতির গায়ে ফারাও-এর নাম খোদাই করা। এ পাঁচটা দোকান বা স্টোর দেখে এতোই বিহ্বল হয়ে পড়লো রোয়েন, নিকোলাসের গায়ে হেলান দিতে বাধ্য হলো, মনে হলো অসুস্থ হয়ে পড়বে। একটা স্টোরে সৈন্য সংখ্যা গুনতে শুরু করলো নিকোলাস, কিছুক্ষণ পর হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, এভাবে সম্ভব নয়, বের করে গুনতে হবে-পরে।
কত ভরি ওজন একজন সৈনিকের? বিড়বিড় করে জানতে চাইলো রোয়েন।
একটা মূর্তি হাতে নিয়ে ওজন পরীক্ষা করলো নিকোলাস। পনেরো থেকে বিশ ভরির কম নয়, বলল ও।
কয়েক হাজার সৈন্য, তাই না? আবার ফিসফিস করলো রোয়েন।
সৈন্য, সেবিকা, ঘোড়া, রথ, অস্ত্র, ঢাল, পানপাত্র-সব মিলিয়ে আনুমানিক ত্রিশ হাজার পিস।
দাম….না, থাক! হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলো রোয়েন।
সোনার দাম এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়, বলল নিকোলাস। প্রত্ন নিদর্শন হিসেবে মূল্য ধরতে হবে। প্রতিটি মূর্তিকে খোদাই করা রয়েছে ফারাও-এর নাম ও সীল। একটা মূর্তির জন্য একজন কালেক্টর দশ লাখ ডলার দিতেও হয়তো আপত্তি করবেন না।
