চরম মুহূর্তটা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য যতোটুকু তার পক্ষে সম্ভব, করেছে ড্যানিয়েল। বাঁধের পাঁচিল প্রায় চার ফুট উঁচু করেছে সে। পাঁচিলের পেছনে আরেক প্রস্থ অবলম্বন তৈরি করেছে, বাধটাকে আরো খানিক পোক্ত করার জন্য। আর কিছু করার নেই তার। এখন শুধু অপেক্ষা করার পালা।
পাড় বেয়ে উঠে এসে হলুদ ট্রাক্টরের গায়ে হেলান দিল ড্যানিয়েল, শ্রমিকদের দিকে তাকালো। রণক্লান্ত সৈনিকদের মতো লাগছে ওদেরকে। নদীকে ঠেকিয়ে রাখতে আজ দুদিন ধরে খাটছে ওরা, প্রত্যেকেই ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। ওদেরকে আবার কাজ করতে বলাটা হবে অমানবিক। এরপর নদী হামলা করলে পরাজয় মেনে নিতে হবে।
কয়েকজন শ্রমিক আড়ষ্ট ভঙ্গিতে উঠে বসে উজানের দিকে তাকালো। বাতাসে অস্পষ্টভাবে ভেসে এলো তাদের গলা। কিছু একটা কৌতূহলী ও উত্তেজিত করে তুলেছে তাদেরকে। ট্র্যাক্টরের উপর উঠে কপালে হাত রেখে রোদ ঠেকালো ড্যানিয়েল। ঢালের দিক থেকে ট্রেইল ধরে এগিয়ে আসছে পরিচিত একজন মানুষ। ক্যামো ফেটিগ পরা, হাঁটার ভঙ্গিতে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। মেক নিমুর। তার সঙ্গে দু জন কোম্পানি কমান্ডারও রয়েছে।
কাছাকাছি এসে মেক জানতে চাইলো, ড্যানিয়েল, তোমার বাঁধের খবর কী? পাহাড়ে বৃষ্টি শুরু হতে যাচ্ছে। নদীটাকে বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখকে পারবে বলে তো মনে হয় না।
ট্র্যাক্টর থেকে লাফ দিয়ে নেমে মেকের সঙ্গে করমর্দন করলো ড্যানিয়েল। তুমি যেমন নিকোলাসের বন্ধু, আমিও তেমনি। বন্ধুর জন্য যতোটুকু পারা যায় করছি। তবে তোমার কথাই ঠিক, ডানডেরাকে বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারব না।
আমি শুধু নদীকে নিয়ে চিন্তিত নই, বলল মেক। খবর পেয়েছি সরকারি বাহিনী হামলা করার জন্য পজিশনে চলে আসছে। আমার কাছে তথ্য আছে, ডেবরা মালিয়াম থেকে পুরো একটা ব্যাটালিয়ন রওনা হয়েছে। আরেকটা ফোর্স আসছে সেন্ট ফুমেনটিয়াস মঠের নিচে থেকে উঠে আসছে অ্যাবে নদী ধরে।
সাঁড়াশি আক্রমণ, তাই না?
আমরা সংখ্যায় কম, বলল মেক। আক্রমণ শুরু হলে কতোক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারব জানি না। আমার লোকেরা গেরিলা, সেটপিস ব্যাটলে অভ্যস্ত নয়। আমাদের কৌশল হলো হিট অ্যান্ড রান। আমি তোমাকে বলতে এসেছি, নোটিশ পাবার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পালাবার জন্য তৈরি থাকতে হবে।
আমার জন্য তোমাকে বেশি চিন্তা করতে হবে না, ছুটে পালাতে ওস্তাদ আমি। নিকোলাস আর মিস রোয়েনকে নিয়ে চিন্তা করো, টানেলের ভেতর না আটকা পড়ে।
ওদের কাছেই যাচ্ছি, বলল মেক। একটা ফল-ব্যাক পজিশনের ব্যবস্থা করতে চাই। যুদ্ধ শুরুর পর আমরা যদি পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, আবার আমাদের দেখা হবে মঠে লুকানো বোটের কাছে।
ঠিক আছে, মেক-হঠাৎ থেমে গেল ড্যানিয়েল, চারজনই ওরা মুখ তুলে ট্রেইলের দিকে তাকালো। পাড়ের কাছে লোকজনকে উত্তেজিত দেখাচ্ছে। কী ব্যাপার?
আমার একটার পেট্রল ফিরে আসছে। চোখ সরু করলো মেক।
নিশ্চয়ই নতুন কিছু ঘটেছে। তারপরই তার চেহারা বদলে গেল। গেরিলারা একটা স্ট্রেচার বয়ে আনছে। স্ট্রেচারে কাত হয়ে রয়েছে ছোট ও হালকা একটা দেহ।
মেককে ছুটে আসতে দেখে স্ট্রেচারের উপর উঠে বসলো টিসে। স্ট্রেচারটা মাটিতে নামিয়ে রাখলো গেরিলারা। সেটার পাশে হাঁটুগেড়ে বসলো মেক, দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল টিসেকে। কথা না বলে পরস্পরকে অনেকক্ষণ ধরে থাকলো ওরা। তারপর টিসের মুখটা দু হাতের তালুতে ভরে ক্ষতগুলো খুঁটিয়ে দেখলো মেক। গোটা মুখ ফুলে উঠেছে, এরই মধ্যে পুঁজ জমেছে কয়েকটা ক্ষতের মুখে। চোখের পাতায় ফোস্কা পড়েছে।
কে করলো? কার কাজ? নরম সুরে জানতে চাইলো সে।
পোড়া ঠোঁট নাড়লো টিসে, আবেগে আর অভিমানে আহত পশুর মতো দুর্বোধ্য আওয়াজ বের হলো শুধু। তারপর বলতে পারল, ওরা আমাকে সব কথা….
না, কথা বলো না,, বাধা দিল মেক, দেখলো টিসের নিচের ঠোঁট ফেটে গিয়ে তাজা রক্ত বেরিয়ে আসছে। তোমার দোষ নেই।
বাধা দিয়ো না, আমাকে বলতে হবে, ফিসফিস করলো টিসে। ওরা আমাকে কথা বলতে বাধ্য করেছে। তোমার গেরিলাদের সংখ্যা, এখানে নিকোলাসের সঙ্গে তুমি কী করছ, সব কথা বলে ফেলেছি। দুঃখিত, মেক। আমি তোমার সঙ্গে বেঈমানী করেছি…।
কে দায়ী? কে তোমার এ অবস্থা করলো?
কর্নেল নগু আর পেগাসাসের আমেরিকান লোকটা, হেলম্।
আলতো আলিঙ্গনে আবার টিসেকে জড়ালো মেক, তবে তার চোখ দুটো থেকে আগুন ঝরছে।
*
টানেলের লোয়ার চেম্বার পুরোপুরি গ্রাসমুক্ত হয়েছে। মেঝের মাঝখানে এখনো জ্বলছে আগুনটা, উত্তপ্ত বাতাস সিঁড়ি হয়ে উপরের টানেলে বেরিয়ে গেছে, অক্সিজেন-সমৃদ্ধ পরিবেশের সঙ্গে মিশে গ্যাস তার ক্ষতি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছে রোয়েন, নিকোলাসের পিছু নিয়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে উঠছেও।
চল্লিশটা ধাপ বেয়ে চেম্বারটায় নেমেছিল ওরা, হুবহু একই রকম আরেক প্রস্থ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। ওদের মাথা চল্লিশতম ধাপের সঙ্গে একই লেভেলে আসার পর হাতের ল্যাম্পটা উঁচু করে সামনে কী আছে দেখার চেষ্টা করলো নিকোলাস। সুবিশাল এক তোরণের ভেতর ছড়িয়ে পড়লো আলো, রঙিন সব বিচিত্র আকৃতি আর নকশায় ধাধিয়ে গেল ওদের চোখ, যেনো বৃষ্টির পর মরুভূমির একটা মাঠে অপরূপ সব ফুল ফুটেছে। গম্বুজ আকৃতির জায়গাটার চারদিকের দেয়ালে বিচিত্র সব পেইন্টিং, এতো সুন্দর আর নিখুঁত যে দম বন্ধ হয়ে এলো।
