মাথা তুললাম নিকোলাস, তিন পর্যন্ত শুনলো। প্লিজ, ডালিং, প্লিজ! শ্বাস নিন! মড়ার মতো চেহারায় কোনো রঙ ফুটছে না। আবার ঝুঁকলো ও, মুখে মুখ চেপে ফুঁ দিল। রোয়েনের ফুসফুস ভরে গেল আবার, এবার নিকোলাসের নিচে নড়ে উঠলো ও। গুড গার্ল! লক্ষ্মী মেয়ে!
তৃতীয় বার ফুঁ দেওয়ার পর নিকোলাসকে ঠেলে নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিল রোয়েন, আড়ষ্টভঙ্গিতে উঠে বসলো, বোকার মতো তাকালো চারদিকে। নিকোলাসের উপর চোখ পড়তে অবাক হয়ে জানতে চাইলো, নিকোলাস, কি ঘটেছে?
ঠিক জানি না। তবে দু জনেই মারা যাচ্ছিলাম। এখন কেমন লাগছে আপনার?
মনে হচ্ছিল অদৃশ্য একটা হাত আমার গলা চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে পারছিলাম না, তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
গলিপথের লোয়ার লেভেলে কোনো ধরনের গ্যাস আছে। আপনি অজ্ঞান ছিলেন মিনিট দুয়েক।
কপালে হাত দিল রোয়েন। ব্যথা করছে। শুনতে পাচ্ছিলাম আপনি আমার নাম ধরে ডাকছেন। আপনি আমাকে ডালিং বলেছেন… নাকি ভুল শুনলাম?
সামান্য স্লিপ অভ টাং, হাত ধরে রোয়েনকে দাঁড় করালো নিকোলাস। তারপরও টলছে ও, হেলাল দিল নিকোলাসের গায়ে।
ধন্যবাদ, নিকোলাস। ঋণের বোঝা শুধু বাড়ছেই। জানি না কোনোদিন শোধ করতে পারব কিনা।
একটা না একটা উপায় দু জনে মিলে বের করেই ফেলবো। স্মিত হাসি লেগে রয়েছে নিকোলাসের ঠোঁটে।
হঠাৎ রোয়েন খেয়াল করলো, চারপাশের লোকজন ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। নিকোলাসের গা থেকেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ও। কী ধরনের গ্যাস, নিকোলাস? গ্যাস ওখানে এলোই বা কোত্থেকে? আপনার কি ধারণা, এটাও টাইটার আরেকটা চালাকি?
সম্ভবত কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেনও হতে পারে। মিথেনও তো বাতাসের চেয়ে ভারী, তাই না?
এলো কোত্থেকে?
পচা লাশ থেকে তৈরি হতে পারে, বলল নিকোলাস। তবে ওই বাস্কেট আর। জারগুলোকে সন্দেহ হচ্ছে আমার। ওগুলোর ভেতরে কী আছে জানার পর বুঝতে পারব। কেমন লাগছে এখন? মাথার ব্যথাটা কমেছে?
আমি ভালো আছি। এখন আমরা কী করব, নিকোলাস?
চেম্বার থেকে গ্যাস পরিষ্কার করতে হবে, বলল নিকোলাস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
শ্যাফটের গ্যাস লেভেল পরীক্ষা করার জন্য মোমবাতি ব্যবহার করলো নিকোলাস। ডান হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নামছে। নামার সময় হাতের বাতিটা মেঝের দিকে নিচু করলো, প্রতিবার এক ধাপ করে নামছে। ভালোই জ্বলছে বাতি, নাচানাচি করছে শিখাটা। তারপর চেম্বারের মেঝে থেকে ছয়টা ধাপ ওপরে থাকতে, শিখাটা হলুদ হয়ে গেল, নিভে গেল দপ করে। দেয়ালে চক দিয়ে দাগ কাটলো নিকোলাস।
না, মিথেন নয়, বলল ও। কার্বন ডাইঅক্সাইডই।
শ্যাফটের মাথা থেকে রোয়েন বলল, মিথেন হলে বুঝি বিস্ফোরণ ঘটত? হেসে উঠলো ও।
হানশিত, ব্লোয়ার ফ্যানটা নিয়ে এসো, বলল নিকোলাস।
হাতে ফ্যানটা নিয়ে দম আটকালো নিকোলাস, নিচের ধাপটায় নেমে এসে চেম্বারের মেঝেতে রাখলো ওটা। ফ্যান চালু করেই ছুটে ফিরে এলো দেয়ালে দাগ কাটা জায়গাটার ওপরে। রোয়েনের প্রশ্নের উত্তরে জানালো, পনেরো মিনিট পর পর টেস্ট করতে হবে।
গ্যাস সরাতে এক ঘণ্টা লেগে গেল। চেম্বারে নেমে এখন ওরা শ্বাস নিতে পারছে। নিকোলাসের নির্দেশে কিছু জ্বালানি কাঠ নিয়ে এলো হানশিত, চেম্বারের মাঝখানে আগুন জ্বালা হলো। আঁচ পেয়ে বাতাস আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এরপর নাকে নিয়ে বাস্কেটগুলো পরীক্ষা করলো নিকোলাস।
ব্যাটা অতি চালাক! বলল নিকোলাস। নানা জিনিস মিশিয়ে সার তৈরি করে রেখে গেছে।
চেম্বারের আরেক দিকে চলে এলো ওরা, মাটির একটা জার কাত করে খানিকটা পাউডার ঢাললো মেঝেতে। আঙুলে নিয়ে ঘষা দিল নিকোলাস, তারপর শুকলো। লাইমস্টোনের গুঁড়ো। অনেক আগে শুকিয়ে যাওয়ায় গন্ধ হারিয়ে ফেলেছে, তবে টাইটা সম্ভবত কোনো ধরনের অ্যাসিডে ভিজিয়ে রেখেছিল। সম্ভবত ভিনিগার, আবার প্রস্রাবও হতে পারে। এ থেকেই কার্বন ডাইঅক্সাইড তৈরি হয়েছে।
তার মানে এটাও তাহলে একটা ফাঁদ ছিল, বলল রোয়েন।
এতো হাজার বছর আগেও টাইটা পচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানত। ওই মিশ্রণ থেকে কী ধরনের গ্যাস তৈরি হবে জানা ছিল তার। ব্যাটাকে বিরাট কেমিস্ট বলতে আমার আপত্তি নেই।
আর বাতাস যেহেতু এখানে স্থির, এ-ও জানত যে চেম্বারের মেঝেতে ভেসে থাকবে গ্যাস, উপরে উঠবে না। আমি ধরে নিচ্ছি এ শ্যাফটের ডিজাইন করা হয়েছে একটা ইউ-ট্র্যাপ-এর আদলে। বাজি ধরে বলতে পারি, ওই প্যাসেজও ক্রমশ উপর দিকে উঠে গেছে… হাত তুলে আরেক প্রান্তের দরজা বা ফাঁকাটা নিকোলাসকে দেখালো রোয়েন। প্রথম ধাপটা এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি আমি।
*
নদীর কিনারায় পাথরের উঁচু স্তূপ তৈরি করেছে ড্যানিয়েল, লেভেল মনিটর করার জন্য। ওগুলোর উপর কড়া নজর আছে তাঁর।
বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর ছয়ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। পাহাড় চূড়ায় মেঘ সরে গেছে, তবে উত্তর দিগন্তে নতুন করে জমা হচ্ছে আবার। ওদিকে, হাইল্যান্ডে, যে কোনো মুহূর্তে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হবে। তা যদি হয়, ড্যানিয়েল ভাবছে, এখানে অ্যাবে গিরিখাদে বন্যার পানি পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে।
ট্র্যাক্টের থেকে নেমে নদীর পাড় ধরে নিচে নামলো সে, স্টোন মার্কার পরীক্ষা করবে। গত এক ঘণ্টায় পানির লেভেল এক ফুটের মতো নেমেছে। তবে নিজেকে খুশি হতে নিষেধ করলো সে-কারণ, নদীর লেভেল এক ফুট উঁচু হতে মাত্র পনেরো মিনিট লেগেছিল। চূড়ান্ত বর্ষণ আসন্ন। অমোঘ নিয়তির মতো, এড়াবার উপায় নেই। নদী ফুলে-ফেঁপে উঠবে। বিস্ফোরিত হবে বাঁধ। ভাটির দিকে ফিরে বাঁধটা দেখলো সে। হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছে।
