দ্বিতীয় স্তরের ফলক এতো চওড়া আর শক্ত যে ওদের হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা সম্ভব হলো না। অগত্যা বাধ্য হয়ে প্রথম ফলকের চারধারে জয়েন্ট বরাবর গভীর খাল কেটে আলাদা করতে হলো প্রথমে, তারপর তুলে ফেলা হলো। ভিত থেকে একটা প্রান্ত তুলতে পাঁচজন লোককে হাত লাগাতে হলো।
ফলকটার নিচে একটা ফাঁক আছে। হাঁটু গেড়ে উঁকি দিল রোয়েন। খোলা শ্যাফটের মতো।
একটা ফলক তোলার পর বাকিগুলো তোলার কাজ সহজ হয়ে গেল। অবশেষে চৌকো ফাঁকটার সবটুকু উন্মোচিত হলো। অন্ধকার শ্যাফটের ভেতর ল্যাম্পের আলো ফেললো নিকোলাস। ভেতরের ফাঁক টানেলের এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়াল পর্যন্ত বিস্তৃত, নিচের প্রথম ধাপে পা রাখার পর সোজা হয়ে দাঁড়াতে নিকোলাসের কোনো অসুবিধে হলো না, বাকি ধাপগুলো, পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী বাঁক নিয়ে নেমে গেছে। আরেকটা সিঁড়ি, বলল ও। বোধহয় এটাই সেটা। ভুল পথ দেখাতে দেখাতে এমন কী টাইটাও এততক্ষণে ক্লান্ত হয়ে পড়ার কথা।
শ্রমিকরা সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, তবে জানে বোনাস হিসেবে অতিরিক্ত সিলভার ডলার পাবে তারা।
আমরা কী এক্ষুনি নিচে নামছি? জানতে চাইলো রোয়েন। জানি ফাঁদ থাকতে পারে, সাবধান হওয়া দরকার; কিন্তু সময় তো ফুরিয়ে যাচ্ছে।
ফাঁদ থাকুক আর নাই থাকুক, আজ আমাদের ঝুঁকি নেওয়ার দিন, বলল নিকোলাস।
পাশাপাশি নামছে ওরা। প্রতিবার সাবধানে একটা করে পা ফেলছে। হাতের ল্যাম্প মাথার উপর উঁচু করে ধরেছে নিকোলাস। রোয়েন বলল, নিচে একটা চেম্বার দেখা যাচ্ছে।
মনে হচ্ছে স্টোররুম, ফিসফিস করলো নিকোলাস। দেয়াল ঘেঁষে সাজানো কি ওগুলো? সংখ্যায় কয়েকশো হবে। কফিন, পাথুরে শবাধার? গাঢ় আকৃতিগুলো প্রায় মানুষেরই আদল, কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একের পর এক অনেকগুলো সারি। চেম্বারটা চৌকো।
না, বলল রোয়েন। একদিকে ওগুলো শস্য রাখার বাস্কেট, আমি চিনতে পারছি। আরেকদিকে দুই হাতলঅলা জার, মদ রাখার জন্য। সম্ভত মৃত লোককে দান করা হয়েছে।
এটা যদি সমাধি সম্পদের স্টোররুম হয়ে থাকে, উত্তেজনায় আঁটসাঁট গলায় বলল নিকোলাস, ধরে নিতে হয় সমাধির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা।
হ্যাঁ! চেঁচিয়ে উঠলো রোয়েন। দেখুন-স্টোররুমের শেষ মাথায় একটা দরজা। ওদিকে আলো ফেলুন!
প্রকোষ্ঠের এক প্রান্তে ফাঁকটা দেখা গেল, যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওদের। শেষ ধাপ কয়টা ছুটে পার হলো ওরা। কিন্তু স্টোররুমের লেভেল ফ্লোরে পৌঁছতেই অদৃশ্য একটা বাধা থামিয়ে দিল ওদেরকে। ছিটকে পেছন দিকে পড়লো দু জনেই।
ঈশ্বর! নিজের গলা খামছে ধরেছে নিকোলাস, কর্কশ শোনালো আওয়াজটা। পিছিয়ে আসুন! পিছিয়ে আসুন!
হাঁটুগেড়ে প্রায় ঢলে পড়ার অবস্থা হলো রোয়েনের, বাতাসের অভাবে সে-ও ভুগছে। নিকোলাস! চিৎকার দিতে চাইছে, কিন্তু সমস্ত বাতাস আটকে গেছে ফুসফুসে। বুকে প্রচণ্ড একটা চাপ অনুভব করছে ও। নিকোলাস! আমাকে বাঁচান! দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার অবস্থা হয়েছে ওর, ডাঙার তোলা মাছের মতো খাবি খাচ্ছে।
রোয়েনের উপর ঝুঁকলো নিকোলাস, দু হাতে ধরে তুলতে চেষ্টা করলো। পারছে না, সাংঘাতিক কাহিল লাগছে নিজেকে। পা দুটো হাঁটুর কাছে ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে, নিজের ওজনই বইতে পারছে না। ও জানে, দম আটকে মারা যাচ্ছে ওরা। চার মিনিট, ভাবল ও। চার মিনিটের মধ্যে তাজা বাতাস না পেলে মৃত্যু ঘটবে মস্তিস্কের।
রোয়েনের পেছনে দাঁড়ালো নিকোলাস, ওর বগলের তলা দিয়ে গলিতে হাত দুটো এক করর, তারপর আবার ওকে তুলতে চেষ্টা করলো। কিন্তু ওর সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। পেছন দিকে ঢলে পড়ছে ও, ধাপের উপর। সমস্ত মনোবল এক করে নিজেকে স্থির রাখতে চাইছে। আবার রোয়েনকে তুলতে চেষ্টা করলো। কীভাবে পারলো বলতে পারবে না, শুধু খেয়াল করলো ধাপ বেয়ে পিছু হটছে ও, বুকের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে রোয়েন। প্রতিটি পা ফেলতে অবশিষ্ট সবটুকু শক্তি লাগছে। আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে রোয়েন, নিকোলাসের বৃত্তাকার বাহুবন্ধনে ঝুলছে, অসাড় পা দুটো পাথুরে ধাপের উপর ঘষা খাচ্ছে।
চিৎকার করতে চাইছে নিকোলাস, হানশিতকে বলতে চাইছে সাহায্য করো। কিন্তু গলা থেকে কোনো আওয়াজই বের করতে পারলো না। আরো পাঁচ ধাপ উঠে এলো। বুঝতে পারছে, রোয়েনের ভার বহন করা ওর পক্ষে আর সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে এ ও জানে, ওকে যদি এখানে ফেলে গেল নিকোলাস। ধাপের উপর আড়ষ্ট ভঙ্গিতে শুয়ে আছে, বুকের উপর রোয়েন। শ্বাস নিতে দাও, ঈশ্বর শ্বাস নিতে দাও! গলায় আওয়াজ নেই, শুধু ঠোঁট দুটো নড়ছে। প্লিজ, গড়…..
যেনো ওর প্রার্থনা শুনেই ছুটে এলো তাজা বাতাস, নাক-মুখ গলে ফুসফুসে পৌঁছে গেল। সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা মুক্তি ফিরে এলো। রোয়েনকে আবার জড়িয়ে ধরল নিকোলাস, নিধে হলো টলতে টলতে। এবার সিঁড়ির মাথার দিকে মুখ করে উঠছে নিকোলাস, ফাঁকটার মাথায় পৌঁছে গেল, হানশিত শেরিফের পায়ের কাছে।
কী ব্যাপার, এফেন্দি? কী হয়েছে আপনাদের? উদ্বিগ্ন হানশিত জানতে চাইলো।
টানেলের মেঝেতে রোয়েনকে শুইয়ে দিল নিকোলাস, জবাব দেওয়ার শক্তি নেই। রোয়েনের গালে চাপড় মারলো ও। কথা বলুন, রোয়েন! কথা বলুন!
রোয়েন সাড়া দিচ্ছে না। কাজেই ওর উপর ঝুঁকলো নিকোলাস, মুখটা নিজের মুখ দিয়ে চেপে ধরল, ফুঁ দিল ভেতরে। চোখের কোণ দিয়ে দেখলো, রোয়েনের বুক ফুলছে।
