অসাধারণ কিছুই এখানে নেই, রোয়েনের গলায় হতাশার সুর। এর আগে অন্তত পঞ্চাশবার এখান দিয়ে আসা-যাওয়া করেছি আমরা। এটাও আর সব বাঁকের মতো।
টাইটা চেয়েছেও তাই, আমরা যাতে পার্থক্যই বুঝতে না পারি।
এখন তাহলে কী করব আমরা? এ প্রথম দিশেহারা দেখালো নিমাকে।
ফলকের শেষ লেখাটা পড়ন তো।
হাতের নোটবুক খুলল রোয়েন। পড়েছি-মিশরের এ পবিত্র আর কালো মাটিতে ফসলের কোনো কমতি নেই। আমি আমার গাধার পাঁজরে চাবুক মারলাম, রাঙলের কাঠের ফলা নতুন জমিন গুঁড়ো করল। আমি বীজ বপন করলাম, ঘরে তুললাম আঙুর আর শস্যদানা। সময় মতো আমি মদ্য পান করলাম আর রুটি খেলাম। মরশুমের ছন্দ মেনে চলি আমি, জমিনের যত্ন নিই।
মুখ তুলে নিকোলাসের দিকে তাকালো রোয়েন। মরশুমের ছন্দ? টাইটা কি ফলকের চারটে মুখের কথা বলছে? জমিন? প্রশ্ন করে পায়ের সামনে পাথরের দিকে তাকালো। জমিন কি পায়ের নিচে নয়, নিকোলাস?
পাথরের ফলকে পা ঠুকলো নিকোলাস, কিন্তু আওয়াজটা হলো তো আর নিরেট। জানার একটাই উপায় আছে। তারপর গলা চড়িয়ে হাঁক ছাড়লো, হানশিত! এদিকে এসো!
৭. বৃষ্টির মধ্যে
বৃষ্টির মধ্যে হলুদ ফ্রন্ট এন্ড লোডার-এর উঁচু সিটে বসে বাগ গ্রুপটাকে গালিগালাজ করছে ড্যানিয়েল, আবার হাসছে ও, কারণ জানে তার গালাগালির একটা শব্দও ওরা বুঝতে পারছে না। ইতোমধ্যে বৃষ্টির মাত্রা কমে গেছে, তবে পাহাড় চূড়ার মাথায় বিশাল এলাকা জুড়ে কালো আর ভারী হয়ে আছে মেঘ। সত্যিকার অর্থে বর্ষা মরশুম শুরু হয় নি; প্রবল বাতাস বইছে, মেঘগুলো সরে গেলেও যেতে পারে।
তবে নদী উপরে উঠছে। বাতাস থেমে গেলে তুমুল বৃষ্টি শুরু হবে। তখনকার বিপদের কথা ভেবেই বাঁধের উপর গ্যাবিয়ন ফেলে আরো উঁচু করা হচ্ছে ওটা। জালে পাথর ভরা হচ্ছে, বাঘের বাচ্চারা সেগুলো বয়ে এনে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখছে, ড্যানিয়েল সেগুলো তার ট্রাক্টরের ক্রেনে তুলে নিয়ে বাঁধের মাথায় নামাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, নদীর পানিকে কোনোভাবেই বাঁধের মাথায় উঠতে দেওয়া যাবে না। তা যদি একবার উঠতে পারে, এ বাঁধ খড়-কুটোর মতো ভেসে যাবে, কারো সাধ্য নেই ঠেকিয়ে রাখে। আর বৃষ্টি যদি একবার শুরু হয়, নদীকে বশে রাখাও সম্ভব হবে না।
ড্যানিয়েল জানে বিপদ ঘটতে শুরু করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা চলবে না, কারণ তখন নিকোলাসকে খবর পাঠিয়েও কোনো লাভ নেই। বাঁধ ভাঙা পানির সঙ্গে দৌড়ে নিকোলাসের কাছে আগে পৌঁছতে পারবে না। ব্যাপারটা এখন সূক্ষ্ম বিবেচনার। ওর খুব সতর্ক এ। বলছে, নিকোলাসকে সাবধান করার এখনই সময়। টানেল থেকে এখুনি ওদের বেরিয়ে আসা উচিত।
তবে এও ড্যানিয়েল. জানে যে টানেলের ভেতর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে ওরা, সময়ের আগে টানেল থেকে ডেকে নিলে ক্ষতি তো হবেই, তার উপর রেগেও যাবে নিকোলাস।
ড্যানিয়েল সিদ্ধান্ত নিল, নদীর উপর নজর রেখে আরো এক ঘণ্টা অপেক্ষা করবে সে। নদীর কিনারা ঘরে ট্রাক্টর নিয়ে এগুলো, আরেকটা গ্যাবিয়ন নামাবে বাঁধের মাথায়।
*
হানশিত শেরিফ আর তার কয়েকজন লোকের সঙ্গে নিকোলাসও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। গোলকধাঁধার এটা সবচেয়ে নিচের লেভেল, মেঝে থেকে একটা একটা করে তুলে ফেলা হচ্ছে স্ল্যাব বা ফলক। ওগুলোর মাঝখানের জয়েন্ট এতো আঁটসাঁট যে এমন কী ক্রোবার দিয়ে আলাদা করতেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। ওরা। সময় বাঁচানোর জন্য নিজেদের তৈরি স্লেজ-হ্যামার দিয়ে ফলকগুলো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে হলো নিকোলাসকে।
শ্রমিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও, সবারই চোখে-মুখে ভয়ে ছাপ লেগে আছে, কারণ তারা জানে গিরিখাদের মাথায় নদীর লেভেল উপরে উঠতে শুরু করেছে। নিকোলাসের জন্য খারাপ খবর হলো, হানশিত শেরিফের ষোলোজন শ্রমিক। ডিউটিতে আসে নি। সন্দেহ নেই, পালিয়েছে তারা।
টানেলের বাঁক থেকে ফলক ভাঙতে শুরু করেছে ওরা। ভাঙা হচ্ছে বাঁকের দু দিকের মেঝেই। একটা করে ফলক ভাঙা হয়, নিচে কোনো দরজা বা ধাপ দেখার আশায় দম ধরে রাখে নিকোলাস। কিন্তু হতাশ হতে হয়, নিচে নিরেট পাথর ছাড়া আর কিছু নেই।
কাজ থামিয়ে পানি খেতে এসে রোয়েনকে বলল ও, আশা করার মতো কিছু দেখছি না।
রোয়েন উত্তরে কিছু বলার আগেই হানশিতের চিৎকার ভেসে এলো, এফেন্দি, দেখে যান!
হাত থেকে পানির ফ্লাস্কটা ফেলে দিয়ে ছুটলো রোয়েন, খেয়ালই করলো না যে ওটা ভেঙে গিয়ে ওর পা ভিজিয়ে দিল। হানশিতের পাশে এসে দাঁড়ালো সে। হ্যাঁমার উপর তুলে আরেকটা আঘাত করার জন্য তৈরি হানশিত। কী… কী… থেমে গেল রোয়েন, ইতোমধ্যে ওর পাশে চলে এসেছে নিকোলাসও। দুজনেই দেখলাম সদ্য ভাঙা একটা ফলকের নিচে সাধারণ কোনো পাথর নয়, ড্রেস করা আরেকটা ফলক রয়েছে।
তারপর দেখা গেল সাজানো ফলকের আরো একটা স্তর রয়েছে মেঝের নিচে, টানেলের এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়াল পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলকগুলো চারপাশের পাথরের সঙ্গে জোড়া লাগানো, জয়েন্টগুলো এতো সরু যে প্রায় চোখেই পড়ে না। কিনারাগুলো মসৃণ ও সমান, কোনো রকম খোদাই বা চিহ্ন নেই। কী ব্যাপার, নিকোলাস? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।
বোঝাই যাচ্ছে, আরেকটা স্তর, নিচে হয়তো কোনো ফাঁক আছে। না তোলা পর্যন্ত বোঝা যাবে না।
