হ্যাঁ, তারপর পরবর্তী নোটেশন। কাঁকড়া বিছে, দুই আর তিন সংখ্যা, তারপর আবার….
জলপথে ভ্রমণ আর ভালোবাসা আমার মানে কী? এভাবে ফলকের ধাঁধা নিয়ে গবেষণা চলল। রাতদিনের হিসাব ভুলে গেল ওরা, ঘুম আর খিদে গ্রাহ্যের মধ্যে আনলো না। তারপর একদিন বাস্তব জগতে ফিরে এলো সিঁড়ির গোড়া থেকে ড্যানিয়েলের আওয়াজ ভেসে আসায়। ডেস্ক ছেড়ে দাঁড়ালো নিকোলাস, আড়মোড়া ভেঙে হাতঘড়ি দেখলো আটটা বাজে। কিন্তু রাত নাকি দিন জানি না। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে দেখতে পেল সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে ড্যানিয়েল, তার কাপড়চোপড় ভেজা। তোমার এ অবস্থা কেন? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। সিঙ্কহোলে পড়ে গিয়েছিলে?
হাতের তালু দিয়ে মুখ মুছলো ড্যানিয়েল। কেউ তোমাকে বলে নি? বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে।
রোয়েন আর নিকোলাস পরস্পরের দিকে আতঙ্ক ভরা দৃষ্টিতে তাকালো।
এতো তাড়াতাড়ি? ফিসফিস করলো রোয়েন। আমাদের হিসেবে তো বর্ষা শুরু হতে আরো এক সপ্তাহ দেরি আছে।
কাঁধ ঝাঁকালো ড্যানিয়েল। ঋতুর পরিবর্তন হয় না?
অকাল বর্ষণ নয় তো? জানতে চাইলো নিকোলাস। নদীর কি অবস্থা? লেভেল উঠতে শুরু করেছে?
সে কথা বলার জন্যই তো এলাম। বাঁধের উপর উঠতে যাচ্ছি আমি বাঘ গ্রুপটাকে নিয়ে। ওটার উপর নজর রাখা দরকার। যদি দেখি বাঁধ ভেঙে পড়তে যাচ্ছে, একজন নিকোলাসেরকে পাঠাব। তখন কোনো তর্ক বা সময় নষ্ট করো না, সেই মুহূর্তে বেরিয়ে যাবে এখান থেকে। আমার লোক পাঠানোর মানে হবে যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হবে বাঁধ।
হানশিত শেরিফকে সঙ্গে নিয়ো না, নির্দেশ দিল নিকোলাস। ওকে এখানে আমার দরকার।
টানেল থেকে বেশিরভাগ শ্রমিককে নিয়ে চলে গেল ড্যানিয়েল। নিকোলাস ও রোয়েন পরস্পরের দিকে তাকালো, দু জনেই গম্ভীর।
আমাদের সময় ফুরিয়ে আসছে, অথচ টাইটার ধাঁধার সমাধান করতে পারছি না, বলল নিকোলাস। একটা ব্যাপার নিশ্চিত জানবেন, নদীর লেভেল বাড়তে শুরু করলে…
কথাটা রোয়েন শেষ করতে দিল না। নদী! চেঁচিয়ে উঠলো। সাগর নয়। অনুবাদে ভুল করেছি আমি। শব্দটার অনুবাদ করেছি-জোয়ার। ধরে নিয়েছিলাম টাইটা সাগরের কথা বলতে চাইছে। কিন্তু আসলে হবে স্রোত বা প্রবাহ। মিশরীয়রা দুটোর মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।
দু জনেই ওরা ডেস্কে পড়ে থাকা নোটবুকের কাছে ছুটে এলো। পড়ছি আবার–পেছনে স্রোত আর মুখে বাতাস নিয়ে জলপথে ভ্রমণ করেছি…। মুখ তুলে রোয়েনের দিকে তাকালো নিকোলাস।
নীলনদে, জলপথে মানে নীলনদে, বলল রোয়েন। জোরালো বাতাস সব সময় উত্তরদিক থেকে আসছে, আর স্রোত সব সময় দক্ষিণ দিক থেকে বয়। টাইটা উত্তর দিকে মুখ করেছিল। উত্তর দুর্গ।
কিন্তু আমরা ধরে নিয়েছিলাম উত্তরের প্রতীক বেবুন, ওকে মনে করিয়ে দিল নিকোলাস।
না! আমার ভুল হয়েছে। অনুপ্রেরণায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে রোয়েনের চেহারা। শুনুন–হে, ভালোবাসা আমার, তোমার স্বাদ আমার ঠোঁটে মিষ্টি-মধুর। মধু! মৌমাছি! উত্তর আর দক্ষিণের প্রতীক চিহ্ন আমি উল্টোপাল্টা করে ফেলেছিলাম।
আর পুব ও পশ্চিম? ওখানে কী পাচ্ছি আমরা? নতুন উদ্যমে অনুবাদে মনোযোগ দিল নিকোলাস। পড়ছি–আমার পাপ গোলাপের মতোই টকটকে লাল। ওগুলো আমাকে বেঁধে রেখেছে ব্রোঞ্জের মতো শেকল দিয়ে। ওগুলো আমার হৃদয়ে জ্বালাময়ি খোঁচা দেয়, এবং আমি চোখ ফেরাই সন্ধ্যা তারার দিকে।
এখানে কী ভুল করলাম বুঝতে পারছি না…
খোঁচা শব্দটা ভুল অনুবাদ, বলল নিকোলাস। হওয়া উচিত বিদ্ধ করে বা কামড় দেয়। কাঁকড়া বিছে কামড় দেয়। কাঁকড়া বিছে তাকিয়ে আছে সন্ধ্যা তারার দিকে। সন্ধ্যা তারা সব সময় পশ্চিমে দেখা যায়। কাঁকড়া বিছে হলো পশ্চিম দুর্গ, পুবদিকের দুর্গ নয়।
বোর্ডটাকে উল্টো করে দেখতে হবে! উত্তেজনায় লাফ দিয়ে চেয়ার ছাড়লো রোয়েন। চলুন নতুন নিয়মে খেলি।
লেভেল সম্পর্কে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসি নি আমরা, প্রতিবাদ করলো নিকোলাস। সিস্ট্রাম কী আপার লেভেল, নাকি তিন তলোয়ার?
উপায় যখন পেয়েছি, এটা ধরেই এগুতে হবে আমাদের। সিস্ট্রামকে আপার লেভেল ধরে খেলব আমরা, তাতে কাজ না হলে আরেক ভাবে চেষ্টা করা যাবে।
কাজটা আগের চেয়ে সহজ লাগলো। বহুবার আসা-যাওয়া করায় পরিচিত হয়ে উঠেছে, এখন আর আগের মতো গা ছমছমও করে না। টানেলের প্রতিটি কোণে, মোচড়ে, বাঁকে আর টি-জাংশনে নিকোলাসের হাতের চক দিয়ে লেখা চিহ্ন রয়েছে। জটিল বাক আর মোচড় ঘুরে দ্রুত এগুতে পারছে ওরা। প্রতিটি নোটেশন অনুসরণ করে এগুতে পারছে দেখে উৎসাহ আর উত্তেজনা বেড়ে গেল, সামনে কোনো বাধা পাচ্ছে না।
আঠারোতম চাল, কেঁপে গেল রোয়েনের গলা। এটা যদি আমাদেরকে ভোলা ফাইলগুলোর একটায় নিয়ে যেতে পারে, যেটা প্রতিপক্ষের দক্ষিণ দুর্গের জন্য হুমকি, তাহলে সেটা হবে চেক কু। বড় করে শ্বাস টানলো ও। পাখি। তিন আর পাঁচ নম্বর। সঙ্গে লোয়ার লেভেলের প্রতীক তিন তলোয়ার।
শুনে শুনে পা ফেলে পাঁচটা জাংশন পেরিয়ে এলো ওরা, নেমে এলো গোলকধাঁধার সবেচেয়ে নিচের লেভেলে, প্রতিটি মোড়ের পাথরের ব্লকে চক দিয়ে আঁকা চিহ্নগুলো পড়ে নিজেদের পজিশন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছে।
এটাই! রোয়েনকে বলল নিকোলাস, দাঁড়িয়ে পড়লো দু জনে, নিজেদের চারদিকে তাকালো।
