তার আগে এ সেন্ট্রাল ল্যান্ডিঙে আলো আর ডেস্ক নিয়ে আসি, বলল নিকোলাস। বোর্ডের মাঝখান থেকে কাজ শুরু করা উচিত বলে মনে করি। চাক্ষুষ বা আন্দাজ করা সহজ হতে পারে।
*
কামরার ভেতর শুধু নরম একটা গোঙানির শব্দ হচ্ছে। নিজের রক্ত আর প্রস্রাবের মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে মেয়েটা। কর্নেল ন কনফারেন্স টেবিলে বসে একটা চুরুট ধরালেন। হাত সামান্য একটু কাঁপল, দেখে মনে হলো অসুস্থ। তিনি একজন সৈনিক, মানুষের নিষ্ঠুরতা দেখে অভ্যস্ত, তিনি নিজেও একজন নিষ্ঠুর মানুষ। মেনজিস্টুর সময়ে নির্যাতন সয়েছেন। কিন্তু আজ যা চাক্ষুষ করলেন, তাঁর বুকটা রীতিমত কেঁপে গেছে। এখন তিনি জানেন হের ফন শিলার কেন এতো ভরসা করেন হেলমের উপর। লোকটা আসলে মানুষ নয়, জানোয়ার।
কামরার আরেক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছোট একটা বেসিনে হাত ধুচ্ছে হেলম্। সময় নিয়ে তোয়ালে দিয়ে হাত দুটো মুছলো সে, কাপড়ে লাগা রক্তের দাগও মুছলো তারপর হেঁটে এসে দাঁড়ালো টিসের সামনে। আর বোধহয় কিছু বলার নেই ওর, শান্ত সুরে বলল সে। কিছু গোপন করেছে বলে মনে হয় না।
টিসের দিকে তাকালেন কর্নেল। গোটা বুক আর মুখ জুড়ে পোড়া দাগগুলো দগদগে ঘায়ের মতো লাগছে। উপুড় করলে নিতম্বেও এ দাগ দেখা যাবে। চোখ বুজে পড়ে রয়েছে টিসে, চোখের পাপড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত মুখ খোলেনি মেয়েটা। শুধু হেলম্ যখন তার চোখের পাতায় জ্বলন্ত চুরুট ছোঁয়াল, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে নি, গড়গড় করে সব বলে ফেলেছে।
খানিকটা স্বস্তিবোধ করছেন কর্নেল নগু। হেলম্ তাঁকে টিসের চোখের পাতা খুলে রাখতে বলেছিল। কিন্তু তার প্রয়োজন হয় নি।
ওর উপর নজর রাখুন, নির্দেশের সুরে বলল হেল, শার্টের গুটানো আস্তিন কব্জিতে নামাল। কর্নেলকে পাশ কাটিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল সে। দরজাটা খোলা রেখে গেল, ফলে জার্মান ভাষার দুএকটা শব্দ শুনতে পেলেন কর্নেল। এখন তিনি জানেন পাশের ঘরেই রয়েছেন হের ফন শিলার। হেলমের কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন ভদ্রলোক, সেজন্যই কনফারেন্স রুমে ঢোকেন নি।
ফিরে এসে কর্নেলের উদ্দেশ্যে মাথা ঝাঁকালো হেলম্।ওকে আর দরকার নেই আমাদের। কি করতে হবে আপনি জানেন।
নার্ভাস ভঙ্গিতে চেয়ার ছাড়লেন কর্নেল, হোলস্টারে হাত রাখলেন। এখানে? এখুনি?
বোকার মতো কথা বলবেন না, ধমক দিল হেলম্। অন্য কোথাও পাঠান। দূরে কোথাও। তারপর কাউকে ডেকে জায়গাটা পরিষ্কার করতে বলুন। আবার পাশের ঘরে চলে গেল সে।
দরজার কাছে গিয়ে চিৎকার করলেন কর্নেল, লেফটেন্যান্ট হাম্মেদ!
দু জন মিলে টিসেকে কাপড় পরাল ওরা। তার ট্রাউজার আর শার্টও অনেক জায়গায় পুড়ে গেছে। কাপড় পরাবার সময় আহমেদ টিসের দিকে না তাকাবার চেষ্টা করলেন। ট্রাকে একটা চাদর আছে, নিয়ে আসি, বলে বেরিয়ে গেলেন তিনি। ফিরে এলেন একটু পরই। টিসের ট্রাউজার আর শার্টের উপর চাদরটা জড়িয়ে দেওয়া হলো, তারপর দু জন মিলে দাঁড়াতে সাহায্য করলো তাকে। কর্নেল কনফারেন্স রুম থেকে বেরুলেন না, হাম্মেদ একাই টিসেকে নিয়ে ট্রাকের দিকে এগুলেন। প্যাসেঞ্জার সীটে বসানো হলো টিসেকে। দুহাতে পোড়া মুখটা ঢেকে রেখেছে সে।
মাথা ঝাঁকিয়ে হাম্মেদ আবার ডাকলেন কর্নেল। শান্ত সুরে নির্দেশ দিলেন তিনি। নির্দেশ শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন হাম্মেদ। এক পর্যায়ে প্রতিবাদ করতে গেলেন তিনি, খেঁকিয়ে উঠে তাকে থামিয়ে দিলেন কর্নেল। তারপর বললেন, মনে রাখবেন, জায়গাটা কোনো গ্রামের কাছাকাছি হওয়া চলবে না। নিশ্চিত হয়ে নেবেন, কোনো সাক্ষী যেনো না থাকে। কাজ শেষ করেই রিপোর্ট করবেন আমাকে।
স্যালুট করে ট্রাকে ফিরে এলেন লেফটেন্যান্ট, ক্যাবে টিসের পাশে উঠে বসলেন। নির্দেশ পেয়ে ট্রাক ছেড়ে দিল ড্রাইভার।
ব্যথায় দিশেহারা বোধ করছে টিসে, সময় সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। উঁচু পথ ধরে ছুটছে ট্রাক, প্রায় অচেতন টিসের মাথা ঘন ঘন আঁকি খাচ্ছে। মুখটা এতো ফুলে আছে, চোখ খুলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। খোলার পর মনে হলো অন্ধ হয়ে গেছে সে। তারপর বুঝতে পারলনা, সূর্য ডুবে গেছে, দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসছে। চারদিক। তারমানে হেলম্ তাকে প্রায় সারাটা দিন কনফারেন্স রুমে আটকে রেখেছিল।
চোখ খুলে উইন্ডস্ক্রীনে তাকিয়ে আছে টিসে, হেডলাইটের আলোয় সামনের পথটা চিনতে পারলো না। আমাকে আপনারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? বিড়বিড় করলো সে। এটা তো গ্রামে ফেরার পথ নয়।
নিজের সীটে লেফটেন্যান্ট হাম্মেদ যেনো আরো কুঁজো হয়ে গেলেন, কোনো কথা বললেন না। ব্যথায় আর ক্লান্তিতে টিসেও আর কোনো প্রশ্ন করলো না। চোখ বুজে সীটের উপর নেতিয়ে পড়লো সে।
হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়লো ট্রাক, ঝাঁকি খেয়ে ঘুম ভাঙল টিসের। কর্কশ কয়েক জোড়া হাত ক্যাব থেকে নামিয়ে হেডলাইটের আলোয় দাঁড় করালো তাকে। হ্যাঁচকা টান দিয়ে হাত দুটো পিছনে আনা হলো, বাঁধা হলো চামড়ার বেল দিয়ে। আপনারা আমাকে ব্যথা দিচ্ছেন, ফুঁপিয়ে উঠলো বেচারি।
বাঁধা কব্জি ধরে টান দিল একজন সৈনিক, রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়ে এলো টিসেকে। আরো দু জন সৈনিক পিছু নিল ওদের, হাতে কোদাল। রাস্তা থেকে একশো মিটার দূরে ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতর থামলো ওরা। একটা গাছের গোড়ায় বসানো হলো তাকে, তার ফাঁক দিয়ে গায়ে চাঁদের আলো পড়ছে। ওই আলোতেই টিসে দেখতে পেল তার জন্য কবর খোঁড়া হচ্ছে। কবর খুঁড়ছে দু জন লোক, অপর লোকটা তার দিকে রাইফেল তাক করে দাঁড়িয়ে আছে নাগালের ঠিক বাইরে।
