রিভার গড পড়ার সময় নিশ্চয়ই আপনি খেয়াল করেছেন চাকার প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল টাইটার, রোয়েনকে বলল ও। রথের চাকা, পানি তোলার চাকা, আর একটা নিশ্চয়ই ব্যালেন্স হুইল-বুবি ট্র্যাপের জন্য। আমরা লিভার নাড়তেই গোঁজ সরে যায়। ওই গোঁজই চাকাটাকে জায়গা মতো আটকে রেখেছিল। চাকা যে-ই ঘুরতে শুরু করলো, গ্যালারির উপর সিলিঙে সাজিয়ে রাখা প্রকাণ্ড পাথরগুলো খসে পড়লো ছাদে, ভেঙে পড়লো ছাদ।
এখন নয়, নিকোলাস! ধৈর্য হারিয়ে বলল রোয়েন। পরে আপনার লেকচার শোনা যাবে। টাইটার ডেথ-ট্র্যাপ হানশিতকে উত্তেজিত করে নি। সে অন্য কিছু আবিষ্কার করেছে। আসুন।
ভিড় ঠেলে আরো সামনে এগুলো ওরা, দাঁড়ালো দীর্ঘদেহী হানশিতের মুখোমুখি। কী ঘটেছে? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। কী পেয়েছ তুমি?
পাল্টা চিৎকার করলো হানশিত, এ দিকে, ইফেন্দি! জলদি আসুন!
আরো কিছুটা এগিয়ে পাথর ধরেস বন্ধ গ্যালারির সামনে থামলো। ওই দেখুন! হাত তুললাম হানশিত।
ভাঙা শ্রাইনের ভেতর একটা হাঁটু গাড়লো নিকোলাস। ফাটল ধরা পাথুরে দেয়ালে এখনো রঙ করা প্লাস্টারের টুকরো দেখা যাচ্ছে। ধসে পড়া দেয়ালের মুখ থেকে বড় একটা টুকরো সরালো হানশিত, তারপর সদ্য তৈরি ফাঁকটার দিকে আঙুল তাক করলো। চোখের পলকে পালস রেট বেড়ে গেল নিকোলাসের। গ্যালারির এক পাশে একটা পথ দেখা যাচ্ছে, সম্ভবত আরেকটা টানেলের মুখ। মহান দেবতার প্লাস্টার মোড়া ছবির পেছনে লুকিয়ে ছিল। নিকোলাস তাকিযে আছে, বাহুতে রোয়েনের স্পর্শ আর মুখের পাশে গরম নিঃশ্বাস অনুভব করলো।
এটাই, নিকোলাস! এ টানেলটাই! ফারাও মামোসের আসল সমাধিতে ঢোকার পথ। এ গ্যালারি, যেকানে আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছি, এটা স্রেফ একটা ধাপ্পা। আসল সমাধি আছে দ্বিতীয় টানেলের ভেতর।
হানশিত! আবেগে রুদ্ধ গলায় নির্দেশ দিল নিকোলাস, তোমার লোকদের বলো পথটা পরিষ্কার করুক।
সঙ্গে সঙ্গে পাথর আর আবর্জনা সরাবার কাজ শুরু হয়ে গেল। ফাঁকটার ভেতর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠলো একটা দরজা। এটাও চৌকো, তিন মিটার চওড়া, দুই মিটার লম্বা। লিনটেল আর চৌকাঠের বাজু নিখুঁতভাবে কাটা, পালিশ করা পাথর। দরজাটা ভেঙে পড়েছে, ভেতরে সউঠে গেছে পাথুরে সিঁড়ির ধাপ।
তার টেনে নতুন দরজার মুখে আরোর ব্যবস্থা করা হলো। সিঁড়ির প্রথম ধাপে পাও রাখলো নিকোলাস, দেখলো ওর পাশে পাও রাখলো রোয়েন।
আমিও আপনার সঙ্গে যাব, জেদের সুরে বলল ও।
এখানে কোনো ফাঁদ থাকতে পারে, সাবধান করলো নিকোলাস। হয়তো প্রথম বাকেই টাইটা আপনার জন্য ওত পেতে আছে।
এসব বলে কোনো কাজ হবে না, আমি যাবই।
ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে ওরা, প্রতি ধাপে থেমে দেয়াল আর সামনের দিকটা পরীক্ষা করে নিচ্ছে। বিশ ধাপ ওঠার পর আরেকটা ল্যান্ডিঙে পৌঁছল ওরা, . দুদিকে দুটো দরজা দেখা যাচ্ছে। তবে সিঁড়িটা সোজা আরো উপরে উঠে গেছে।
কোনদিকে? জানতে চাইলো নিকোলাস।
চলুন উপরে উঠি, বলল রোয়েন। পাশের প্রকোষ্ঠে দুটোয় পরে ঘুরে আসব।
সাবধানে আবার উপরে উঠতে শুরু করলো ওরা। আরো বিশ ধাপ পার হওয়ার পর হুবহু একই রকম আরেকটা ল্যান্ডিং দেখা গেল, দুদিকে দুটো দরজা। সিঁড়িটা এরপরও ওপরে উঠে গেছে।
নিকোলাসকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে রোয়েন বলল, উপরেই উঠব।
আরো বিশ ধাপের মাথায় আরেকটা ল্যান্ডিং, এটাও দুদিকে একটা করে দরজা। সিঁড়িটাও উঠে গেছে নাক বরাবর।
ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। অভিযোগের সুরে বলল নিকোলাস।
কনুই দিয়ে ওর পিঠে খোঁচা মারল রোয়েন। কোন বাধা না পাওয়া পর্যন্ত ওঠা উচিত, বলল ও। আবার উঠতে শুরু করে একই ধরনের আরো দুটো ল্যান্ডিং পেল ওরা।
অবশেষে! শেষ ল্যান্ডিঙে উঠে এসে বিস্ময় প্রকাশ করলো নিকোলাস। আশা করেছিল এটারও দুদিকে দরজা দেখতে পাবে, পেলও দেখতে, কিন্তু সামনে আর কোনো ধাপ নেই, তার বদলে নিরেট দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এবার কি করবেন?
সব মিলিয়ে কয়টা ল্যান্ডিং? জানতে চাইলো রোয়েন।
আটটা, বলল নিকোলাস।
আটটা, পুনরাবৃত্তি করলো রোয়েন। সংখ্যাটা খুব পরিচিত লাগছে না?
ল্যাম্প লাইটের আলোয় রোয়েনের মুখটা ভালো করে দেখলো নিকোলাস।
আপনি বলতে চাইছেন….।
বলতে চাইছি গ্যালারিতে আটটা শ্রাইন রয়েছে বা ছিল, এখানে রয়েছে আটটা ল্যান্ডিং, বাও বোর্ডেও আটটা খুঁটি থাকে।
টপ ল্যান্ডিঙে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলো ওরা, চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে।
অবশেষে নিস্তব্ধতা ভাঙল নিকোলাস, ঠিক আছে, এবার বুলুন কোনদিকে যাবেন।
একটায় গেলেই হয়, বলল রোয়েন। ডানদিকে চলুন।
ডান দিকের দরজা দিয়ে একটা গলিপথে ঢুকলো ওরা। খানিক দূর যাবার পর একটা টি-জাংশনে পৌঁছল-সামনে নিরেট দেয়াল, দুদিকে দুটো দরজা। আবার ডান দিকের গলিপথে ঢুকি আসুন, বলল রোয়েন। তাই ঢুকলো নিকোলাস। কিন্তু কানিক দূর যাবার পর আরেকটা টি-জাংশন পড়লো সামনে।
রোয়েনের দিকে তাকালো নিকোলাস। কি ঘটছে বুঝতে পারছেন তো? জিজ্ঞেস করলো। টাইটার আরেকটা চালাকি। সে আমদেরকে একটা গোলকধাঁধায় নিয়ে এসেছে। সঙ্গে লম্বা তার না থাকলে এতোক্ষণে হারিয়ে যেতাম।
ফেলে আসা পথের দিকে তাকালো রোয়েন, তারপর দৃষ্টি ফেললো ডান ও বাম দিকের গলিপথে। শিউরে উঠে নিকোলাসের বাহু খামচে ধরল ও। আমার ভয় করছে! চলুন ফিরে যাই। কেন যেনো মনে হচ্ছে বিপদের মধ্যে আছি আমরা। এভাবে প্রস্তুতি না নিয়ে চলে আসা উচিত হয় নি।
