খুব সাবধানে এগুচ্ছে নিকোলাস, এগুবার আগে বাঁশ দিয়ে টানেলের ছাদ খোঁচা মারছে। ল্যান্ডিঙে পৌঁছেই দেখতে পেল সমাধির প্রবেশপথটাকে সীল করে রেখেছিল যে প্লাস্টার করা দরজা, সেটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। অ্যামুনিশন ক্রেটগুলো, আটটাই, ছিটকে পড়েছে এদিক সেদিক, কোনো কোনোটা আবর্জনায় ডুবে আছে। মূর্তিগুলোর কথা ভেবে মাথাটা ঘুরে উঠলো নিকোলাসের। একেকটা অক্ষত মূর্তির জন্য বিলিওনিয়ার কালেক্টররা বস্তা বস্তা ডলার দিতেও দ্বিধা করবেন না, জানে ও। এতো কষ্টকর আর ঝুঁকিবহুল অভিযান থেকে এ আটটা মূর্তিই হয়তো সর্বমোট প্রাপ্তি ওদের, তা ও যদি ভেঙে গিয়ে থাকে, দুঃখের কোনো সীমা থাকবে না।
আবর্জনা থেকে বাক্সগুলো উদ্ধার করলো নিকোলাস। প্রত্যেকটা খুলে ভেতরে তাকালো, পরীক্ষা করলো মূর্তিগুলো। নেহাতই ওদের ভাগ্য বলতে হবে, সবগুলোই অক্ষত আছে। আর কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয় ও, প্রতিবার একটা করে বয়ে নিয়ে এলো সেতু পর্যন্ত।
সমাধির বাইরের ল্যান্ডিঙে ফিরে এসেছে নিকোলাস, ওর পেছনে এসে দাঁড়ালো। রোয়েন। কোনো যুক্তিই মানল না, নিকোলাসের সঙ্গে সে-ও টানেলে ঢুকলো।
গ্যালারিতে ঢোকার মুখে স্থির হয়ে গেল রোয়েন। শোকে কাতর, ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। এ আমি বিশ্বাস করি না! ধরা গলায় বলল ও। টাইটা নিশ্চয়ই চায় নি এতো সুন্দর শিল্পকর্ম এ ভাবে ধ্বংস হয়ে যাক।
মানে? কী বলতে চান?
পরে ব্যাখ্যা করব, কারণ নিজেই এখনো বুঝতে পারছি না, বলল রোয়েন। শুধু জানি, টাইটাকে আমি যতটুকু চিনেছি, তার মধ্যে ধ্বংস করার প্রবণতা একেবারেই ছিল না। আপনি লোকজন ডেকে গ্যালারিটা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন।
স্যাপারকে ডেকে নিয়ে এলো নিকোলাস। গ্যালারির অবস্থা দেখে হাঁ হয়ে গেল সে। কী করতে হবে শোনার পর বলল, সবচেয়ে বড় সমস্যা ধুলো। আবর্জনায় হাত দিলেই মেঘের মতো উড়তে শুরু করবে।
কাজেই পানি দরকার, বলল নিকোলাস। টানেল থেকে সিঙ্কহোল পর্যন্ত দুই লাইনে দাঁড় করিয়ে দাও লোকজনকে। একটা চেইন পানির বালতি আনবে, আরেকটা আবর্জনা সরাবে।
ঈশ্বরই জানে কয় দিন লাগবে? হতাশ দেখার ড্যানিয়েলকে, তবে হানশিতকে ডেকে এসে কাজটা বুঝিয়ে দিল সে।
সন্ন্যাসী বা গ্রামবাসী যুবকদের মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই, কারণ এখনো তারা বিশ্বাস করে এটা একটা ধর্মীয় কাজ, অংশগ্রহণ করতে পারায় নরকের আজাব থেকে নিস্কৃতি পাওয়া যাবে। হানশিত শেরিফের নেতৃত্বে বাঘেরা কাজ শুরু করে দিল।
ভাঙা পাথর আর আবর্জনা বলে নিয়ে ফেলা হচ্ছে সিঙ্কহোলে। ওটা এতো গভীর, পানির লেভেল উঁচু হলো না, সব গ্রাস করে নিচ্ছে। অল্প জায়গার ভেতর একশোর উপর লোক কাজ করছে, পরিবেশটা গুমোট হয়ে উঠলো। তাজা বাতাসের জন্য টাইটার পুলে বেরিয়ে এলো নিকোলাস। পুলটাকে ঘিরে থাকা পাঁচিলে এসে দাঁড়াতেই, দেখলো ওর জন্য ওখানে অপেক্ষা করছে মেক।
নিকোলাস, জিজ্ঞেস করলো সে, ডেবরা মারিয়াম থেকে এখনো ফেরেনি টিসে? কালই না ওর ফিরে আসার কথা ছিল?
ওকে তো দেখিনি আমি। ভাবছিলাম ও বোধহয় তোমার সঙ্গে আছে।
ওর খোঁজে লোক পাঠাবো, তাই ফিরেছে কিনা নিশ্চিত হতে এলাম, বলল মেক, চেহারায় শুধু উদ্বেগ নয়, অপরাধী অপরাধী ভাবও ফুটে আছে। ডেবরা মারিয়ামে টিসেকে পাঠানোর প্রস্তাবটা তারই ছিল।
নিকোলাসেরও খারাপ লাগছে। দুঃখিত, মেক। ওকে ঢালের উপর পাঠানোটা বিপজ্জনক হতে পারে বলে আমিও ভাবিনি।
গোজামের সবাই ওকে চেনে, বলল মেক।
বিপদ হওয়ার তো কথা নয়। তবু, খোঁজ নিচ্ছি আমি। চলে গেল সে।
পরবর্তী কয়েকটা দিল টিসেকে নিয়ে দুচিন্তায় থাকতে হলো ওদেরকে। এদিকে গ্যালারি পরিষ্কার করার কাজও খুব ঢিমে তালে এগুচ্ছে। গ্যালারির মুখে নিকোলাসের সঙ্গেই বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছে রোয়েন। দেয়ালচিত্রের প্রতিটি ভাঙা টুকরো দেখা মাত্র কান্না পাচ্ছে ওর, কাতর হয়ে পড়ছে শোকে। ছবির কোনো অক্ষত অংশ দেখতে পেলেই নিজের দখলে রেখে দিচ্ছে। এক টুকরো প্লাস্টারে আইসস-এর মাথাটা অক্ষত অবস্থায় পেল। আরেকটায় পেল তথ এর পুরো ছবি।
লম্বা গ্যালারির ভেতর সময়ের কোনো হিসাব পাওয়া সম্ভব নয়, এখানে রাত ও দিন সমান। একেবারে ক্লান্ত ও বিরক্ত না হওয়া পর্যন্ত টানেল ছেড়ে বেরোয় না ওরা। তারপর যখন বেরোয়, টাইটার হ্রদের উপর সরু আকাশে তারার মেলা দেখে সময় কাটায়, ক্লান্তি সত্ত্বেও চোখে ঘুম আসে না।
হ্রদের পাশে ক্যাম্পে কয়েক ঘণ্টা ঘুমাবার পর টানেলে ঢুকতে যাচ্ছে ওরা, ভাসমান সেতু পেরুচ্ছে, এ সময় গ্যালারির দিক থেকে তীক্ষ্ণ একটা চিৎকার ভেসে এলো। তারপর শোনা গেল বহু লোকের হৈ-চৈ। হানশিত শেরিফ কিছু একটা পেয়েছে, বলল রোয়েন।ধ্যেত, ওখানে আমাদের থাক, উচিত ছিল- দৌড় নিল ও, পিছু নিয়ে নিকোলাসও।
গ্যালারির সামনে ল্যান্ডিঙে পৌঁছল ওরা, দেখলো অর্ধনগ্ন শ্রমিকরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে সবাই একসঙ্গে কথা বলছে, ইঙ্গিতে ও হাত নেড়ে পরস্পরকে কী যেনো বোঝাবার চেষ্টা করছে। ভিড় ঠেলে সামনে এগুলো নিকোলাস ও রোয়েন, দেখতে পেল যেখানে ওসিরিস-এর শ্রাইন ছিল সেই পর্যন্ত গ্যালারিটা পরিষ্কার করা হয়ে গেছে। ওদের উপর ছাদ ভাঙাচোরা আর এবড়োখেবড়ো, নিচে টানলোসের বিধ্বস্ত মেঝেতে পড়ে রয়েছে বিশাল আকারের একটা পাথুরে ঢাকা। এটা টাইটার মেকানিজম বা তার অবশিষ্ট, প্রাচীন ক্রীতদাস ছাদে ফিট করেছিল। ওরা, নিকোলাস ও রোয়েন, ডিভাইসটা কাজ করায় ছাদটা ধসে পড়ে। বিশাল চাকাটাই মেকানিজমের মুল অংশ, দেখতে অনেকটা মিল হুইলের মতো, ওজন হবে কয়েক টন। জিনিসটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলো নিকোলাস।
