এবার আমি, পোস্ট মাস্টারকে বলল টিসে, আদ্দিস আবাবায় আরেকটা ফোন করতে চাই-মিশরীয় দূতাবাসে।
দ্বিতীয় কলের লাইন পেতে একটু দেরি হলো। বিকেল পাঁচটার সময় মিশরীয় দূতাবাসের কালচারাল অ্যাটাশের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো টিসের। ভদ্রলোককে আগে থেকেই চেনে সে, কূটনীতিকদের কয়েকটা পার্টিতে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি জানতে চাইলেন, মিটিংয়ে যেতে হবে। বলুন আপনার জন্য কি করতে পারি, ওইজিরো টিসে?।
এই ভদ্রলোকের মাধ্যমে কায়রোর যাঁকে মেসেজটা দিতে হবে তাঁর নাম ঠিকানা ও পদমর্যাদা একটা কাগজে লিখে দিয়েছে রোয়েন। নামটা শুনে কালচারাল অ্যাটাশে ভদ্রলোক টিসেকে খুশি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নাম ও পদমর্যাদা ভুল শুনেছেন কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য দু বার রিপিট করতে বললেন। সবশেষে লিখে নেওয়া মেসেজটা পড়ে শোনালেন টিসেকে। ঠিক আছে তো?
রাত হতে আর বেশি দেরি নেই, কাজেই আজ আর খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে নামা সম্ভব নয়। কোথায় রাত কাটানো যায় ভাবছে টিসে, এ সময় গ্রামের সর্দার তার কিশোরী মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন। রাতটা তাঁর বাড়িতে মেহমান হিসেবে কাটাবার অনুরোধ করেছেন তিনি। স্বস্তিবোধ করলো টিসে, কিশোরীর সঙ্গে সর্দারের বাড়িতে চলে এলো। অভিজাত পরিবারের মেয়ে সে, তার সম্মানে রাতে বড়সড় একটা ভোজ দিলেন সর্দার। গ্রামে তার বাড়িটাই সবচেয়ে বড়। সন্ন্যাসীদের থাকার ব্যবস্থা হলো বাড়ির উঠানে, তাঁবুর ভেতর। বাড়ির পেছনের একটা গেস্টরুম খুলে দেওয়া হলো টিসেকে। ভোজন পর্ব শেষ হতে রাত গম্ভীর হয়ে গেল। গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিদায় নিয়ে চলে যাবার পর নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়লো টিসে।
ওর ঘুম ভাঙল ভোরের দিকে, কেনো জানে না, টিসের মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সেই মেনজিস্টুর দিনগুলোর মতো, তড়িঘড়ি বাইরে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে চাইলো সে। অন্ধকারে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে ট্রাকের আওয়াজ। ক্রমশই কাছে চলে আসছে। মাথায় উলের কাপড় দিয়ে ঢেকে যতোক্ষণে পোশাক পরে ফেললো ও, বাইরের দরজায় তখন তুমুল কড়াঘাত।
দরজা খুলুন! বজ্রকণ্ঠে আদেশ এলো। আমরা সরকারের গোয়েন্দা।
পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে চাইলো টিসে। ও জানে, তাঁরই খোঁজে এসেছে এরা। কিন্তু কোথায় দৌড়াবে সে অন্ধকারে? কিছুই চেনে না টিসে, এ এলাকার। হঠাৎ করে মনে পড়লো, নদী রয়েছে কাছে ধারে। অন্তত নদীর পাড় পর্যন্ত তো পালিয়ে যেতে পারবে। ছুটলো টিসে। ঠিক এ সময়েই টর্চের উজ্জ্বল রশ্মি আবিষ্কার করে ফেললো ওকে।
ওই তো মেয়েটা! কে যেনো বলল কর্কশ কন্ঠে। টর্চের আলোয় রোয়েনের শাম্মা পতপত করে উড়ছে, প্রাণপণে ছুটছে সে।
গুলি কোরো না! নির্দেশ এলো। একে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে!
ক্ষীপ্র গ্যাজেলের গতি টিসের পায়ে, দৌড়ে ওকে ধরা কারো কম্ম নয়। কিন্তু হলো না। কিছু না বুঝেই অন্ধকারে সামনের কাঁটাতারের বেড়ায় আছড়ে পড়লো
সে। জামায় কাঁটা আটকে, পরে রইলো ওখানেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই টেনে হিঁচড়ে ওকে ছাড়িয়ে আনলো সৈনিকের দল।
এগিয়ে এসে টিসের চুলের গোছা ধরে টান দিল একজন, ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলো টিসে। লোকটা চড় মারতে যাবে, হাঁপাতে হাঁপাতে সৈনিকদের ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন একজন অফিসার। ভীষণ মোটা।
কী করছ! কাকে মারছ? লোকটাকে চোখ রাঙালেন তিনি। ওঁনাকে তোমরা ক্রিমিন্যাল ভেবেছ নাকি? রাজধানীর অত্যন্ত অভিজাত পরিবারের মেয়ে উনি।
টিসের দিকে ফিরে ক্ষমা প্রার্থনার সুরে বললেন, ডিস্ট্রিক্ট কমান্ডার কর্নেল নগুর নির্দেশে আপনাকে একবার আমাদের আর্মি হেডকোয়ার্টারে যেতে হবে, মিস টিসে।
কেন, কী করেছি আমি? ঢোক গিলে জানতে চাইলো টিসে।
গোজামে শুফতা–দুস্কৃতকারীদের তৎপরতা সম্পর্কে কর্নেল আপনাকে প্রশ্ন করতে চান।
তর্ক করে বা বাধা দিয়ে কোনো লাভ নেই, অফিসারের সঙ্গে বেরিয়ে এসে একটা সামরিক ট্রাকে চড়লো টিসে। ট্রাকের সামনে অফিসারের সঙ্গে বসেছে ও, ড্রাইভার একজন সৈনিক। কিছুক্ষণ কোনো কথা হলো না। তারপর অফিসার বললেন, ড্রাইভার ইংরেজি বোঝে না। আপনাকে বলতে চাই, আপনার বাবা, অল্টো জিম্যানকে আমি চিনতাম। তাঁর প্রতি আমি ঋণী ও কৃতজ্ঞ। আজ রাতে যা ঘটছে তার জন্য সত্যি আমি দুঃখিত, কিন্তু একজন লেফটেন্যান্ট হিসেবে কতোটুকুই বা আমার ক্ষমতা। উপর থেকে নির্দেশ এলে আমাকে তা মেনে চলতে হয়।
আমি কোনো অভিযোগ করছি না, বলল টিসে।
আমার নাম হাম্মেদ। যদি সম্ভব হয়, আপনাকে আমি সাহায্য করব–অল্টো জিম্যানের খাতিরে, কথা দিলেন লেফটেন্যান্ট হাম্মেদ।
ধন্যবাদ, এখন বন্ধুর বড়ো প্রয়োজন আমার।
*
ধুলো সরার জন্য সময় দিতে হলো। তারপরও বেশ কিছুক্ষণ গ্যালারি থেকে আলগা পাথর খসে পড়ার আওয়াজ ভেসে এলো ওদের কানে। সিঙ্কহোলের উপর ভাসমান সেতুর উপর রয়েছে ওরা, ইতোমধ্যে রোয়েনের মাথায় অ্যান্টিসেপটিক মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে নিকোলাস। দু জনের কারো আঘাতই তেমন গুরুতর নয়।
দু ঘণ্টা পর টানেলে ঢোকার জন্য তৈরি হলো নিকোলাস। ড্যানিয়েল আর রোয়েনকে সেতুর উপর থাকতে বলল ও, রওনা হলো একাই, সঙ্গে নিয়েছে লম্বা একটা বাঁশ আর জেনারেটরের সঙ্গে সংযুক্ত হ্যান্ড ল্যাম্প।
