দাঁড়ান, আমি আসছি! বাক্সের উপর উঠে নিকোলাসের পেছনে দাঁড়ালো রোয়েন, ওর দুই কাঁধের উপর দিয়ে সামান্য বাড়ালো হাত দুটো, দেবতার ছবির উপর তালু।
দু জন মিলে চাপ দিচ্ছে। আরে, নড়ছে দেখছি! হঠাৎ করে হাপির ছবি আলগা হয়ে গেল, ছুটে গেল ওদের হাত থেকে, তীক্ষ্ণ ঘষা খাওয়ার শব্দের সঙ্গে খাজ ধরে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নেমে এলো।
ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় বাক্স সহ নিচে পড়ে গেল ওরা, নিকোলাসের পিঠে বসে আছে রোয়েন। এক মুহূর্ত পর দু জনেই লাভ দিয়ে সোজা হলো।
কী ঘটলো? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন, তারপরই ঝট করে ছাদের দিকে তাকালো। উপর থেকে গুরুগম্ভীর একটা আওয়াজ ভেসে আসছে। কী ঘটছে বলুন তো? ওর গলায় আতঙ্ক। দু জনেই মুখ তুলে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের ভুল, নাকি সত্যিসত্যি গোটা ছাদ নড়ছে?
শব্দটা ভৌতিক লাগছে না? ফিসফিস করলো নিকোলাস। যেনো ছাদের কোথাও বিশাল কোনো প্রাণী নড়াচড়া করছে?
আওয়াজটা ক্রমশ বাড়ছে। মেঘ ডাকার মতো গড়গড় করছে গোটা ছাদ। পাহাড় ধসের সাথে অনেকটা মেলে। তারপর কামান দাগার মতো বিকট শব্দ হতে লাগলো।
উঁচু সিলিঙে একটা ফাটল ধরল, গ্যালারির পুরো দৈর্ঘ্য জুড়ে। আঁকাবাঁকা ফাটলটা থেকে ধুলোর মেঘ নেমে আসছে। তারপর, ধীরগতি দুঃস্বপ্নের মতো, ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সরাসরি তার উপরের ছাদটা ধসে পড়তে শুরু করলো।
টাইটার সতর্কবাণী! চেঁচিয়ে উঠলো রোয়েন। দেবতাদের অভিশাপ! স্তম্ভিত বিস্ময়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ও, নড়ার শক্তি নেই।
খপ করে ওর একটা হাত ধরে টান দিল নিকোলাস। ছুটুন! বাঁচতে চাইলে ছুটুন! রোয়েনকে নিয়ে খিচে দৌড় দিল ও।
গ্যালারি ধরে ছুটছে ওরা সীল করা প্রবেশপথের ফাঁকটার দিকে। পাথর আর প্লাস্টারের টুকরো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে গলিপথে, ধুলোয় চারদিক অন্ধকার। ওদের পেছনে অবিরত বজ্রপাতের শব্দ হচ্ছে, ধসে পড়ছে গোটা ছাদ। ওরা ছুটছে, ওদেরকে অনুসরণ করছে নিয়ন্ত্রণহীন পাথর ধস। পেছন দিকে তাকানোর সময় বা সাহস কোনোটাই ওদের নেই, তবে পতনের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারছে ফাঁকটা গলে বাইরে বের হওয়ার সময় ওরা পাবে না।
প্লাস্টারের একটা টুকরো রোয়েনের কাঁধে ঘষা খেয়ে বেরিয়ে গেল। হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেল ওর, নিকোলাস ধরে না ফেললে পড়ে যেত। না পড়লেও, আতঙ্কে হাঁটতে পারছে না। নিকোলাস ওকে টেনে নিয়ে আসছে। ধুলোয় সামনেটা দেখা যাচ্ছে না, প্রবেশপথের ফাঁকটা কত দূরে বোঝা যাচ্ছে না। প্রায় পৌঁছে গেছি, মিথ্যে আশ্বাস দিল নিকোলাস। ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই প্লাস্টারের একটা টুকরো ফ্লাডলাইটে আঘাত করলো। পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেল গ্যালারি।
নিকোলাস এখন পুরোপুরি অন্ধ, বাঁচার আকুতি প্রথমেই ওকে দিশা খুঁজে পাবার তাগাদা দিল। কিন্তু চারদিকেই ধসে পড়ছে ছাদ, প্রতি মুহূর্তে পতনের মাত্রা আরো বাড়ছে। বুঝতে পারল, যে কোনো মুহূর্তে গোটা ছাদ নেমে আসবে ওদের উপর। কোথাও না থেমে ছুটছে ও, ভারী বোঝার মতো টেনে আনছে রোয়েনকে। কিছুই না দেখে দেয়ালের শেষ মাথায় পৌঁছল, ধাক্কা খেয়ে সব বাতাস বেরিয়ে গেল ফুসফুস থেকে। ধুলোর মেঘের ভেতর প্লাস্টার করা দরজার গায়ে চৌকো ফাঁকটা অস্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে, সিঁড়ির মাথা থেকে আসা ল্যাম্পের আলোয় শুধু আভাসটুকু পাওয়া যায়। হ্যাঁচকা টানে রোয়েনকে বুকে তুলে নিল নিকোলাস, তারপর ফাঁকের ভেতর ছুঁড়ে দিল। ওপারে পড়লো রোয়েন, কাতর শব্দ ভেসে এলো এপারে। আবর্জনার আরেকটা টুকরো লাগলো নিকোলাসের মাথার পেছনে, ব্যথায় জ্ঞান হারাবার অবস্থা হলো। হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেছে, দাঁড়াতে চেষ্টা করেও পারছে না। শুনতে পেল রোয়েন ওর নাম ধরে চেঁচাচ্ছে।
হামা দিয়ে এগুলো নিকোলাস। হাত তুলে ফাঁকটার নাগল পেতে চাইছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে একটা হাত ওর কব্জি চেপে ধরল। আর ঠিক এক সেকেন্ড পরই গ্যালারির সম্পূর্ণ ছাদ ধসে পড়লো নিচে।
ল্যাম্পলাইটের আলোয় নিকোলাসের হাত ধরে পথ দেখালো রোয়েন। কোথায় লেগেছে? হাঁপাচ্ছে ও। কপালের উপর চুলের ভেতর থেকে রক্তের একটা ধারা গালে নেমে আসছে। ধুলো মাথা মুখে লাল নদীর মতো লাগছে দেখতে।
তাড়াতাড়ি পা চালান, বলল নিকোলাস। খকখক করে কাশছে ও। গোটা টানে নল ধসে পড়তে পারে। পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে ছুটলো ওরা। তারপর ধুলোর ভেতর সামনে একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেল। ড্যানিয়েল।
আপনারা বেঁচে আছেন! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। কী ঘটছে ওদিকে?
নিকোলাস আর রোয়েন থামলো না। পালিয়ে এসো! কর্কশ সুরে বলল নিকোলাস। দ্রুত টানেল থেকে উঠে এলো নিকোলাস, রোয়েন আর ড্যানি স্যাপার।
ভাসমান সেতুর উপর উঠে বিশ্রাম নেয়ার জন্য থামলো ওরা।
*
সন্ন্যাসীদের বাইরে রেখে পোস্ট অফিসে ঢুকলো টিসে। বহুসময় বসে থাকার পর আদ্দিস আবাবার লাইন পাওয়া গেল, ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে ভেসে এলো জিওফ্রে টেনেন্টের কণ্ঠস্বর। হ্যালো?
নিজের পরিচয় দিল টিসে।
আমি আপনার কলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, বলল জিওফ্রে। আপনারা সবাই কেমন আছেন, টিসে?
নিকোলাসের মেসেজটা মুখস্ত বলে গেল টিসে।
আমার বন্ধুকে বলবেন ওর কথামতো সব করা হবে, বলে যোগাযোগ কেটে দিল জিওফ্রে।
