এবার নিকোলাসও শকুনের মাথার একপাশে সূক্ষ্ম একটা ছায়া দেখতে পেল, যেখানে ফ্লাডলাইটের আলো ক্ষীন বাধা পেয়েছে। হাত তুলে স্পর্শ করার পর বুঝতে পারলো দেয়ালের যে অংশে মাথাটা আঁকা হয়েছে সেটা দেয়ালের অন্যান্য অংশের চেয়ে চুল পরিমাণ ফুলে আছে। উঠলো একটু ভাব থাকলেও, কোনো জয়েন্ট আছে বলে তো মনে হচ্ছে না, রোয়েনকে বলল ও। একদম মসৃণ, একটা দেয়ালেরই অংশ মনে হচ্ছে।
চাপ দিন। চাপ দিন! শকুনের মাথাটা সূর্যের দিকে ঠেলুন! তাগাদা দিল রোয়েন।
মাথায় তালু ঠেকিয়ে তাই করলো নিকোলাস। কই, কিছুই তো ঘটছে না।
চার হাজার বছর ধরে এঁটে বসে আছে, জোর খাটান!
জোর খাটালো নিকোলাস। হতাশ দেখালো ওকে। এ নিরেট দেয়াল, নড়বে না।
আমাকে তুলুন। আমাকে দেখতে দিন। রোয়েনের কথামতো ওর কোমরে দুহাত রেখে ওপরে তুললাম নিকোলাস। আঙুলের ডগা দিয়ে পরীক্ষা করছে। রোয়েন। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো, নিকোলাস! কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলেছেন আপনি। মাথার চারপাশের আউটলাইনের রঙে ফাটল ধরেছে। আঙুলে অনুভব করছি। আরো ওপরে তুলুন আমাকে।
রোয়েনকে আরো একটু ওপরে তুললাম নিকোলাস।
হ্যাঁ, কোনোই সন্দেহ নেই! উল্লাসে কেঁপে গেল রোয়েনের গলা। কিছু একটা নড়ে গেছে। মাথার উপর দেয়ালে সরু চুলের মতো খাড়া ফাটলও দেখতে পাচ্ছি। আপনি নিজেই দেখুন।
খালি অ্যামুনিশনের একটা ক্রেট এনে শকুনটার নিচে রাখলো নিকোলাস, সেটার উপর উঠে দাঁড়াতে শকুন আর ওর চোখ একই লেভেল থাকলো। চেহারা বদলে গেল ওর। পকেট নাইফ বের করে মাথাটার আউটলাইনের মেঝেতে। মনে হচ্ছে মাথাটা আলাদা একটা অংশ, স্বীকার করতে হলো ওকে। ওটার উপর খাড়া একটা চিড়-ও এখন দেখতে পাচ্ছে নিকোলাস, তাতে ছুরির ফলা ঢুকিয়ে এদিক ওদিক চাপ দিতে তিন ফুট প্লাষ্টার খসে পড়লো। টাইলের মেঝেতে পড়া মাত্র মিহি ধুলোয় পরিণত হলো সেটা। দেয়ালে একটা ফাটল তৈরি হয়েছে। একটা খাজ বলে মনে হচ্ছে। পুরোটা পরিষ্কার করলে বোঝা যাবে আসলে কী।
নিচে আরো প্লাস্টার খসে পড়লো। হাঁচি দিচ্ছে রোয়েন। কিন্তু জায়গা ছেড়ে নড়ছে না।
হ্যাঁ, খাড়া একটা খুঁজই বটে, উপর দিকে উঠে গেছে, বলল নিকোলাস। এরপর শকুনের মাথার আউটলাইন থেকে প্লাস্টার খসাতে শুরু করলো। মাথাটা এখন মুক্ত, কাজটা শেষ করে বলল। দেখে মনে হচ্ছে খাজ ধরে উপর দিকে ওঠানো যাবে এটাকে। চাপ দিয়ে দেখবো?
একশো বার! হাজার বার! রুদ্ধশ্বাসে বলল রোয়েন।
শকুনের মাথার নিচে দুই হাতের তালু ঠেকিয়ে চাপ দিল নিকোলাস। চোখ-মুখ কুঁচকে উঠলো ওর। সেই সঙ্গে রোয়েনেরও, যেনো নিকোলাসের সঙ্গে সে-ও চাপ দিচ্ছে।
নরম একটা ঘষা খাওয়ার আওয়াজ হলো, মৃদু ঝাঁকি খেতে খেতে উপর দিকে উঠে যাচ্ছে মাথাটা। খাঁজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল ওরা। লাফ দিয়ে বাক্স থেকে নেমে পড়লো নিকোলাস।
দু জনেই ওরা বিচ্ছিন্ন মাথাটার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে থাকলো। দীর্ঘ রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর ফিসফিস করলো রোয়েন, কই, কিছুই তো ঘটছে না!
ফলকের বাকি লেখা কী বলে? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।
তাই তো! দেয়ালের চারদিকে চোখ বুলাল রোয়েন, তারপর মুখস্থ বলে গেল, আরো লেখা আছে-শিয়াল ডেকে উঠে লেজের দিকে ঘুরে গেল। খুদে আনুবিস-এর ছবির দিকে কাঁপা একটা হাত তুললাম ও, কবরস্থানের দেবতা আনুবিস-এর মাথাটা শিয়ালের। শকুনের ঠিক উল্টোদিকে রয়েছে তাঁর ছবিটা, ওসিরিস-এর প্রকান্ড ছবির নিচে। সেদিকে ছুটলো রোয়েন, শিয়ালের মাথায় তালু রেখে চাপ দিল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না।
সরুন, আমি দেখছি, বলে ছুরির ফলা দিয়ে শিয়ালের মাথার চারপাশ থেকে প্লাস্টার খসাল নিকোলাস। তারপর নতুন করে চাপ দিল। শুধু মাথা নয়, গোটা ছবিটা ঘুরে যেতে শুরু করলো, যতক্ষণ না কালো হলুদ টানলোসের দিকে ফিরলো।
দু জনেই পিছিয়ে এসে তাকিয়ে থাকলো, প্রত্যাশায় চকচক করছে দু জোড়া চোখ। কিন্তু এবারও কিছু ঘটল না।
ফলকে আরো একটা কথা লেখা আছে, বিড়বিড় করলো রোয়েন। মনে পড়ে? নদী জমিনের দিকে গড়ায়। পবিত্র স্থানের অমর্যাদাকারীরা সাবধান, তোমাদের উপর সমস্ত দেবতার অভিশাপ নেমে আসবে।
নদী? আমি তো দেয়ালে কোনো নদী দেখছি না।
দেয়ালে তন্নতন্ন করে খুঁজছে রোয়েন। পেয়েছি! হাপি! উত্তেজনায় সরু ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো কণ্ঠস্বর। নীলনদের দেবতা! নদী।
মহান দেবতা ওসিরিস-এর মাথার সঙ্গে একই সমতলে রয়েছেন নদীর দেবী। হাপি উভলিঙ্গ, বুকে স্তন আছে, উঠলো পেটের নিচে পুরুষের জননেন্দ্রিয়। মাথাটা জলহস্তীর, হাঁ করা, চোয়ালের ভেতর বিশাল গহ্বর দেখা যাচ্ছে।
কয়েকটা অ্যামুনিশন ক্রেটের উপর দাঁড়িয়ে হাত লম্বা করলো নিকোলাস, ছুঁতে পারলো হাপিকে। পরীক্ষা করার পর বলল, এটাও আলাদা করা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
নদী জমিনের দিকে গড়ায়, নিকোলাস। তার মানে নিচের দিকে নামবে ওটা। টানুন।
আগে কিনারাগুলো পরিষ্কার করতে দিন। কাজটা শেষ করতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো। ছুরিটা পকেটে রেখে দিয়ে নিকোলাস বলল, এবার কিছু একটা ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। তৈরি থাকুন। আমার জন্য একটু দোয়াও করতে পারেন।
দেবতার ছবিতে দু হাতের তালু রেখে নিচের দিকে চাপ দিল নিকোলাস, ধীরে ধীরে শক্তি বাড়াচ্ছে। কিন্তু কিছুই নড়লো না। কাজ হচ্ছে না।
