দাঁড়িয়ে পড়েছে টিসে, হাঁপাতে হাঁপাতে তার কাছে পৌঁছল রোয়েন। ওরা দু জন কথা বলছে, আবার ঢালের উপর আকাশের দিকে তাকালো নিকোলাস, ভাবছে সময়ের আগেই না বর্ষা শুরু হয়ে যায়। তারপর আবার যখন ওদের দিকে তাকালো, দেখলো টিসের হাতে কী যেনো একটা গুঁজে দিল রোয়েন। শার্টের পকেটে সেটা খুঁজে মাথা ঝাঁকালো টিসে, তারপর আবার সন্ন্যাসীদের পিছু নিয়ে রওনা হয়ে গেল। রোয়েন ফিরে আসতে নিকোলাস জানতে চাইলো, কী ব্যাপার, রোয়েন?
মেয়েদের অনেক গোপন ব্যাপার থাকে, জবাব দিল রোয়েন। সব কথা জিজ্ঞেস করতে হয় না। তারপর হেসে উঠে বলল, জিওফ্রের মাধ্যমে মামিকে একটা মেসেজ পাঠাতে বললাম টিসেকে, জানাতে চাই আমি ভালো আছি।
উত্তরটা নিকোলাসকে সন্তুষ্ট করতে পারলো না। মায়ের ফোন নম্বর টিসেকে দেওয়ার জন্য আগেই একটা কাগজে লিখে রেখেছিল রোয়েন? তাহলে সবার সামনে কেন টিসেকে দিল না? ঠিক আছে, সিদ্ধান্ত নিল নিকোলাস, টিসে ফিরে এলে আসল ব্যাপার জেনে নিবে ও।
টানেলের ভেতর সিঁড়িটার গোড়ায় ওয়ার্কশপ তৈরি করেছে ওরা। হানশিত শেরিফ একটা টেবিল বানিয়ে দিয়েছে, তাতে রোয়েনের ড্রইং, বই, ফটোগ্রাফ ইত্যাদি ছড়ানো। ড্যানিয়েল একটা ফ্লাডলাইটেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পাশের দেয়ালে আটটা ক্রেটে রয়েছে দেব-দেবীদের মূর্তি। সিঙ্ক-হোলের উপর ভাসমান সেতুতে কমান্ডার মেকের সশস্ত্র গেরিলারা চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছে। টেবিলে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে রোয়েনকে-ফটোগ্রাফ পরীক্ষা, দেয়ালচিত্রের মাপজোক, শিলালিপির অনুবাদ, কাজের কোনো শেষ নেই। কোনো কোন দিন একটানা পনেরো ঘণ্টাও কাজ করে। এক পর্যায়ে রেগে যায় নিকোলাস, হুকুমের সুরে ঘুমাতে যেতে বলে।
আজও ঠিক তাই ঘটলো। ধমক খেয়ে টানেল থেকে বেরিয়ে চওড়া কার্নিসে চলে এলো রোয়েন, এখানেই ওদের ক্যাম্প ফেলা হয়েছে। মশারি আগেই টাঙানো হয়েছে, ভেতরে ঢুকে শ্লীপিং ব্যাগে আশ্রয় নিল। একটু দূরে নিকোলাসও শুলো।
মাত্র তিন ঘণ্টা পর সকাল হয়ে গেল। ঘুম ভাঙার পর রোয়েনকে ওর মশারির ভেতর দেখতে পেল না নিকোলাস। মাখন, ইনজেরা রুটি আর সেদ্ধ ডিম খেল। হাতে দুকাপ কফি নিয়ে টানেলে ঢুকলো, সেতু পেরিয়ে সিঁড়ির মাথায় উঠে এলো। গ্যালারিতে পৌঁছে দেখলো ওসিরিস-এর খালি শ্রাইনের সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে কী যেনো দেখছে রোয়েন। বাম হাতের গরম কাপটা ওর বাহুতে ঠেকাতে চমকে উঠলো ও। রেগে গিয়ে বলল, আমাকে আপনি ভয় পাইয়ে দিয়েছেন।
কী দেখছেন? জানতে চাইলো নিকোলাস, রোয়েনের বাড়ানো হাতে ধরিয়ে দিল কাপটা। কী আবিষ্কার করলেন?
বলতে হলে দেখাতে হবে, জবাব দিল রোয়েন। আসুন আমার সঙ্গে। নিকোলাসকে নিয়ে সিঁড়ির গোড়ায়, নিজের ওয়ার্কশপে নেমে এলো ও। কয়েকদিন ধরে আমি শুধু ট্যানাস-এর সমাধিতে পাওয়া ফলকের এক পাশের লিপি অনুবাদ করেছি। সবই মুল বই থেকে নিয়ে খোদাই করা, একটা লাইনও টাইটার নয়। সব আমি নোটবুকে লিখে রেখেছি। নোটবুকটা নিকোলাসকে দেখালো ও তারপর একপাশে সরিয়ে রাখলো। দ্বিতীয় নোটবুকটা হাতে নিল। এটায় আছে ফলকের চতুর্থ পাশের লিপির নকল। এগুলোর অর্থ আমি জানি না। শুধু সংখ্যার লম্বা তালিকা। সম্ভবত কোনো ধরনের কোড বা সঙ্কেত। তবে এ ব্যাপারে আমার একটা আইডিয়া আছে, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
এবার এটা দেখুন, বলে তৃতীয় একটা নোটবুক হাতে নিল রোয়েন। এখানে রয়েছে ফলকের তৃতীয় দিকটায় যে লিপি পাওয়া গেছে তার অনুবাদ। এগুলো উদ্ধৃতি হতে পারে না, কারণ প্রাচীন কোনো ক্লাসিক্যাল বইতে এ সব আমি পাই নি। এগুলোর বেশিরভাগই, আমার ধারণা টাইটার লেখা। সে যদি আরো কোনো সূত্র রেখে গিয়ে থাকে, এ লিপির মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস।
দুষ্ট ক্ষীণ হাসি ফুটলো নিকোলাসের ঠোঁটে। এটা সেই অংশ না, দেবীর লালচে আর ব্যক্তিগত অঙ্গের বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে?
নোটবুক থেকে মুখ তুলতে পারলো না রোয়েন। আপনি দেখছি ভোলার বান্দা নন। সামান্য একটু লালচে হলো ওর চেহারা। ফলকের তৃতীয় দিকের মাথায় কী লেখা ছিল দেখুন। টাইটা এ দিকটার নামকরণ করেছে, শরৎ। সবচেয়ে আগে এটাই আমার চোখে পড়েছিল।
সামনের দিকে ঝুঁকে হায়ারোগ্লিফিক্স পড়লো নিকোলাস, পড়ছি-ষড় চতুষ্টয়ের নিয়ম মেনে নিয়ে মহান দেবতা ওসিরিস প্রথম চাল দিলেন। হ্যাঁ, এ অংশটুকু আগেও পড়েছি আমি। টাইটা বাও খেলার কথা বলছে এখানে, খেলাটা সে সাংঘাতিক ভালোবাসত।
হ্যাঁ, বলল রোয়েন। এবার বলুন, আমি যে স্বপ্নটার কথা বলেছিলাম, তা কি আপনার মনে আছে? যে স্বপ্নে ডুরেঈদকে সমাধির একটা চেম্বারে দেখি আমি?
দুঃখিত, বলল নিকোলাস। মনে করিয়ে দিলে খুশি হই।
সেই স্বপ্নে ডুরেঈদ আমাকে বলেন, ষড় চারটের আচরণ বিধি মনে রাখবে-শুরু করবে প্রথম থেকে।
খেলাটা সম্পর্কে আমি বিশেষজ্ঞ নই। স্বপ্নে তিনি আপনাকে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?
খেলাটার নিয়ম বা কৌশল এতো হাজার বছর পর হারিয়ে গেছে। তবে আপনি জানেন, এগারো আর সতেরোতম সাম্রাজ্যের সমাধির ভেতর পাওয়া জিনিসপত্রের সঙ্গে বাও বোর্ডও ছিল, তা থেকে ধরে নেওয়া চলে যে দাবা খেলারই অনুন্নত সংস্করণ ছিল সেটা। নোটবুকের খালি একটা পৃষ্ঠায় স্কেচ আঁকলো রোয়েন। কাঠের বেৰ্ডি, মেলা হত দাবার বোর্ডের মতো করে, খুঁটি হিসেবে থাকত আট সারি চওড়া কাপ, আট সারি গভীর কাপ। ওগুলো ছিল রঙিন পাথর, প্রত্যেকের আচরণ নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা। বিশদ ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না, তবে প্রথমেই চারটে ষাঁড়ের চাল দেওয়া টাইটার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দেরই শোভা পায়। এ চালের অর্থ হলো, কিছু খুঁটি বিসর্জন দিয়ে গুরুত্বপুর্ণ প্রথম সারির কাপগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে বোর্ডের মাঝখানটায় প্রভাব বিস্তার করা যায়।
