ফাঁকা! ফিসফিস করলো রোয়েন। রাজার লাশ গায়েব হয়ে গেছে।
*
দেয়ালচিত্রের ফটো তুলতে কয়েকটা দিন ব্যয় হলো। দেবতা ও দেবীদের মূর্তিও বাক্স বন্দি করা হলো এ সময়। কাজের ফাঁকে খালি শবাধার নিয়ে আলোচনা করলো নিকোলাস ও রোয়েন। রোয়েন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, সমাধির গেটের সীল তো ভাঙা হয় নি।
ওটার একটা ব্যাখ্যা আছে, নিকোলাস তাকে বলল, সম্ভবত টাইটা নিজেই সমাধি থেকে রাজার শরীর আর ট্রেজার সরিয়ে রেখেছিল। সপ্তম স্ক্রোলের বহু জায়গায় এমন বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপচয়ে দারুণ হতাশ ছিল সে। বলেছিল, তার চেয়ে দেশ ও জাতীর কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারতো এ সম্পদ।
মানতে পারলাম না, রোয়েন জেদ ধরে। এতো কষ্ট করে, নদীর উপর বাঁধ দিয়ে পুলে নামার রাস্তা বন্ধ করলো, এমন জটিল ফাঁদের মধ্যে সমাধি মুখ বানালো, আর এরপর সে কিনা রাজার সমাধি নষ্ট করে ফেলবে? হতেই পারে না। টাইটা অন্তত বিচক্ষণ ব্যক্তি, নিজের মতো করে মিশরে দেব-দেবীদের আরাধনা করতে সে। ওমন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সে কিছুতেই সরিয়ে রাখবে না। এ সমাধির কিছু একটা ব্যাপার আমার এখনো বোধগম্য নয়, কেমন যেনো অদ্ভুত–ফারাও-এর দেহ নেই, দেয়ালচিত্রগুলোও কেমন যেনো।
ফারাও-এর বডির কথা না হয় মানলাম, কিন্তু ছবিগুলোকে কেনো অদ্ভুত বলছেন? নিকোলাস জানতে চায়।
ঠিক আছে, দেখাচ্ছি, এক হাত দিয়ে আইসিস-এর ছবিটা ইঙ্গিত করলো রোয়েন। সুন্দর আঁকা–সন্দেহ নেই, দারুণ কোনো শিল্পীর কাজ। কিন্তু ওগুলোর মধ্যে যত্নের ছাপ কম। কেমন যেনো কাঠখোট্টা আঁকা–জীবন্ত নয়, কখনোই মনে হয় না, একজন জিনিসের সৃষ্টি। রাণী লসট্রিসের সমাধির যেখানে আমরা অ্যালাবাস্টারের জারে স্ক্রোলগুলো খুঁজে পেয়েছিলাম সেগুলোর তুলনায় এরা কিছুই না।
চিন্তান্বিত ভঙ্গিতে দেয়ালচিত্রগুলো পর্যবেক্ষণ করছে নিকোলাস। মনে হয়, ঠিক বলেছেন। এমনকি, মঠে ট্যানাসের সমাধির আঁকাও এরচেয়ে অনেক অভিজাত।
ঠিক তাই! খুশি মনে বলে রোয়েন। ওগুলো টাইটার নিজের হাতের পেইন্টিং। কিন্তু এগুলো তার নয়–কোনো একজন নকলবাজের।
চিত্রের কোন বার্তা আপনার কাছে অপছন্দনীয় লাগছে?
এমন কোনো মিশরীয় সমাধির কথা শুনেছেন, যেখানে মৃতের পুস্তক থেকে কোনো উদ্ধৃতি নেই? যেখানে স্বর্গের সাতটি প্রবেশদ্বার মৃতব্যক্তি কেমন করে পার হবেন–তার কোনো বর্ণনা নেই?
এখান থেকে আপনি জেনি বাদেনহোর্সটের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন কীভাবে?
মাথা নিচু করে ভাবছে নিকোলাস। কিছু না বলে রোয়েনের কাছ থেকে সরে এলো ও। মেয়েটার কথা নিয়ে একান্তে ভাবা প্রয়োজন। সমস্ত ট্রেজার প্যাকিং করা তদারকি করার ফাঁকে ফাঁকে ওটা নিয়েই ভাবতে চাইছে সে।
ছয়টা পবিত্র মূর্তি বড়ো বড়ো বাক্সে এঁটে গেল, কিন্তু দেবী হ্যাঁথোর এবং দেবতা সেথ-এর মাথাটা বিশেষ বড়ো হয়ে গেছে বাক্সের জন্য। নিকোলাসের ধারণা, এ দুই অংশ আলাদা ভাবে তৈরি করা হয়েছিল। সেথ-এর মাথা আলাদা করা সম্ভব। ধীরে ধীরে কাঠের পেরেক খুলে অংশে অংশে আলাদা করা হলো বিশাল মূর্তিদ্বয়।
নিকোলাসের পর্যবেক্ষণের সমানে হানশিত সুসম্পন্ন করলো প্যাকিং। সব কিছু গোছানো শেষ হতে রোয়েনের কাছে ফিরে নিকি দেখলো, শূন্য শবাধারের কাছে বসে দেয়াল লিখন পড়ছে মিশরীয় সুন্দরী।
আপনি ঠিক বলেছেন, সায় দিয়ে বলল নিকোলাস। এখানে মৃতের পুস্তক থেকে কোনোই উদ্ধৃতি নেই। ব্যাপারটা অদ্ভুত। কিন্তু কী করার আছে আমাদের? এ রহস্য, রহস্যই থাকবে।
নিকি, ব্যাপারটা এতো সহজ নয়। আমার পুরো সত্তা বলছে–আমরা কিছু একটা মিস করছি।
আমি বেচারা মাথামোটা, একজন সুন্দরী-বিদূষী নারীর ইন্সটিঙ্কট নিয়ে কেনো প্রশ্ন তুলবো?
জ্বালাবেন না। এখন বলুন, এ সমাধির হায়ারোগ্লিফিকস্ নিয়ে কতোটা সময় কাজ করতে পারবো আমি?
খুব বেশি হলে দুই সপ্তাহ। জেনির সাথে রেডিও যোগাযোগ করতে হবে আমাকে। ও আমাদের রোসেইরেস এয়ারস্ট্রিপ থেকে তুলে নেওয়ার কথা। এর কোনো অন্যথা করা যাবে না।
আরে, আগে কেননা যোগাযোগ করেন নি? রোয়েন বলল অবাক হয়ে। এখন কি করে যোগাযোগ করবেন?
ডেবরা মারিয়ামে একটা পাবলিক টেলিফোন আছে, পোস্ট অফিসে, হেসে বলল নিকোলাস।
টিসে তো গোজামের যে কোনো জায়গায় অনায়েসে ঘোরাফেরা করতে পারে। একদল সন্ন্যাসী থাকবে এসকর্ট হিসেবে, এসকাপমেন্টে উঠে ব্রিটিস এমব্যাসির জিওফ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করবে টিসে, জিওফ্রে মেসেজটা পৌঁছে দিবে জেনির কাছে।
কবে যাবে টিসে?
মেক বলেছে, কাল। মাল্টা থেকে প্লেন নিয়ে রওনা হবার জন্য জেনিকে সময় দেওয়া দরকার, কিন্তু প্লেন পৌঁছতে দেরি হলো, কিংবা প্লেন পৌঁছল, আমরা পৌঁছতে দেরি করলাম-এরকম হলে বিপদ ঘটতে পারে। সঠিক টাইমিং হতেই হবে।
*
পয়লা এপ্রিল ভোরবেলা, টিসেকে মেসেজটা দিল নিকোলাস। জেনিকে তুমি বলবে, এপ্রিল ফুলস ডে-র ভোরবেলা ওঁকে পৌঁছতে হবে রদেভোয়। তারিখটা মনে রাখতে সুবিধে হবে।
সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তখুনি রওনা হয়ে গেল টিসে। বেশ খানিক দূর চলে গেছে সে, হঠাৎ রোয়েন বলল, ওকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে! ছুটলো ও। এই টিসে! টিসে, দাঁড়াও!।
আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘের ঘনঘটা দেখে গম্ভীর হয়ে উঠলো নিকোলাস।
