তারপর মুখ তুলে তাকালো টাওয়ারের মতো উঁচু দেয়ালচিত্রের দিকে, শ্রাইনের চারদিকে ছড়িয়ে আছে, উঠে গেছে গম্বুজ-আকৃতির ছাদে। পাতাল রাজ্যের অধিপতি পিতা ওসিরিস-এর আরেকটা দৈত্যাকার ফিগার, মুখটা সবুজ, নকল দাড়ি, বাহু জোড়া বুকে ভাঁজ করা, হাতে বাঁকা লাঠি, মাথায় লম্বা হেড-ড্রেস বা মুকুট, মুকুটের কপালে ফণা তোলা গোক্ষুর। সচল ধুলোর মধ্যে দেবতাকে জ্যান্ত মনে হলো, ওদের চোখের সামনে যেনো নড়াচড়া করছেন।
প্রথম শ্ৰাইনের সামনে বেশিক্ষণ থামলো না ওরা। গ্যালারিটা তীরের মতো লম্বা হয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তী শ্রাইন দেবীর প্রতি উৎসর্গিত। কুলুঙ্গিতে বসে আছেন আইসিস, বসে আছেন সিংহাসনে, এ সিংহাসনই তার প্রতীক চিহ্ন। শিশু হোরাস স্তন পান করছেন। দেবীর চোখ আইভরি আর নীল ল্যাপিস ল্যাজুলি।
কুলুঙ্গির চারপাশ দখল করে আছে দেয়ালচিত্র, শিল্পীর আঁকা তাঁরই ছবি। এখানে জননী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে তাঁকে, সুর্মা টানা কালো রাতের মতো চোখ, মাথায় সান ডিস্ক আর পবিত্র গরুর শিং। তার চারপাশের দেয়াল হায়ারোগ্লিফিক্স সঙ্কেত, এতো উজ্জ্বল যে জোনাকি পোকার মতো জ্বলছে। একশো নাম তাঁর, কখনো অ্যাসট তিনি, কখনো নেট বা বাস্ট। পটাহ, সেকের, রেনাট নামেও ডাকা হয় তাঁকে। প্রতিটি নাম এককটা শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
পরবর্তী শ্রাইনে রয়েছে হোরাস-এর মূর্তি, এ-ও সোনার তৈরি, মাথাটা বাজপখির। ডান হাতে ধনুক, বাঁ হাতে ইংরেজি হরফটি আকৃতির ক্রস। জীবন মৃত্যুর দেবতা তিনি। তাঁর চোখ লাল রত্ন। মূর্তির চারপাশে তারই বিভিন্ন বয়েসের দেয়ালচিত্র। শিশু হোরাস আইসিস-এর স্তন পান করছেন। তরুণ হোরাস ঋজু ও গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর, বাজপাখির মুখ নিয়ে অন্য এক রূপে হোরাস, শরীরটা কখনো সিংহের, আবার কখনো বীরযোদ্ধার, মাথার মুকুট। তাঁর নিচে হায়ারোগ্লিফিক্স-মহান দেবতা এবং স্বর্গের প্রভু, বহু গুণের অধিকারী, সমস্ত দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শক্তিধর, যে শক্তি তার স্বর্গীয় পিতা ওসিরিস-এর শত্রুকে পরাভূত করেছিল।
চার নম্বর শ্রাইনে দাঁড়িয়ে আছেন সেথ, শয়তান, ধ্বংস আর যুদ্ধের দেবতা। তারও শরীর সোনার তৈরি, তবে মাথাটা কালো হায়েনার।
পঞ্চম শ্রাইনে রয়েছেন লাশ আর কবরের দেবতা, আনুবিস, মাথাটা শিয়ালের। লাশের দেখাশোনা করেন তিনি, বিশাল দাঁড়িপাল্লায় হৃৎপিণ্ড ওজন করার সময় নিক্তির কাটা পরীক্ষা করেন। পাল্লা দুটো যদি সমান সমান হয়, মৃত ব্যক্তির গুরুত্ব ও মূল্য আছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়, কিন্তু যদি একদিকের পাল্লা তার বিরুদ্ধে এক চুলও নিচে নেমে থাকে, আবিস তার হৃদয় দৈত্যাকার কুমীরকে খেতে দেন।
তারপর তথ-এর শ্রাইন। ইনি ভাষা বা লিখন-এর দেবতা, মাথাটা পবিত্র সারস জাতীয় পাখির, হাতে কলম। সপ্তম শ্রাইনে চার পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন পবিত্র গাভী হ্যাঁথোর, গায়ের রঙ সাদা ও কালো, মুখটা মানুষের মতো, তবে কান দুটো ট্রাম্পেট আকৃতির। অষ্টম শ্রাইন আকারে সবচেয়ে বড়, তিনি সমস্ত সৃষ্টির জনক আমন রা। তিনি সূর্য; প্রকাণ্ড সোনার বৃত্ত, সোনালি রশ্মি ছড়াচ্ছেন।
এখানে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে তাকালো নিকোলাস। আটটা পবিত্র শ্রাইন ট্রেজার হিসেবে এতো গুরুত্বপূর্ণ, এরকম মূল্যবান প্রত্ন নিদর্শন এর আগে আবিষ্কার হয়েছে কিনা সন্দেহ। টাকার অঙ্কে এগুলোর কি দাম হতে পারে ভাবতে গিয়ে চিন্তাশক্তি লোপ পাবার অবস্থা হলো ওর। ওজন দরে সোনা বিক্রি করলে কী দাম পাওয়া যাবে সেটা বের করা সহজ কাজ, কিন্তু প্রাচীন এ শিল্পকর্মের মূল্য তার চেয়ে শত বা সহস্র গুণ বেশি হবে। তাছাড়া, সবে মাত্র শুরু ট্রেজারের কয়েকটা মাত্র নমুনা দেখতে পেয়েছে ওরা। না জানি সামনে আর কত কি আছে।
চিন্তাটা মাথা থেকে বের করে দিয়ে গলিপথের শেষ মাথায় বিশাল চেম্বারের দিকে ঘুরলো নিকোলাস।
সমাধি, ফিসফিস করলো রোয়েন।
ওরা সামনে বাড়ছে, সেই সঙ্গে পিছিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার। এখন ওরা সমাধির ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে। ওটার দেয়ালও চিত্ৰশোভিত, প্রতিটি বিচিত্র বর্ণ থেকে যেনো আগুনের মতো আভা ফুটে বের হচ্ছে। দীর্ঘ এক মানুষের ছবি দেয়াল ধরে সিলিং পর্যন্ত পৌঁছেছে। ওটা দেবী নাট-এর নমণীয়, সর্পিল দেহ, সূর্যের জন্ম দিচ্ছেন। তার ভোলা জরায়ু থেকে সোনালি কিরণ বের হচ্ছে, ফারাও-এর অলকৃত পাথুরে শবাধারকে আলোকিত করছে, মৃত রাজাকে দান করছে নতুন জীবন।
চেম্বারের ঠিক মাঝখানে রাখা হয়েছে রাজকীয় শবাধার, বিশাল এক কফিন, প্রকাণ্ড এক নিরেট গ্র্যানিট থেকে কেটে বের করা। এতো বড় আর অসম্ভব ভারী কফিনটা জলমগ্ন টানেল দিয়ে বয়ে আনতে কতজন ক্রীতদাস লেগেছে, ভাবতে গিয়ে তাজ্জব বনে গেল নিকোলাস।
তারপর কফিনের ভেতর তাকালো ও আর তাকিয়েই হতভম্ব হয়ে গেল। শবাধারটা খালি। প্রকাণ্ড গ্র্যানিট ঢাকনি তুলে ফেলা হয়েছে, তুলে এমনভাবে এক পাশে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে যে পুরোটা প্রস্থ জুড়ে ফাটল ধরেছে ওটায়, এ মুহূর্তে দু ভাগ হয়ে পড়ে রয়েছে কফিনের পাশের মেঝেতে।
ধীর পায়ে সামনে বাড়লো ওরা, হতাশার তিক্ত স্বাদের সঙ্গে ধুলো মিশছে জিভে। একেবারে কাছে এসে কফিনের ভেতর চারটে জার-এর ভাঙা টুকরো দেখলো ওরা। পাত্রগুলো তৈলস্ফটিক দিয়ে তৈরি, রাজার নাড়িভূঁড়ি, লিভার ও শরীরের অন্যান্য ভেতরকার অঙ্গ রাখার জন্য। ভাঙা ঢাকনিতে দেবতা আর অবাস্তব প্রাণীদের মাথা অলঙ্করণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
