সিঙ্কহোল পর্যন্ত সরিয়ে আনা হয়েছে জেনারেটর, ফ্লাডলাইট জ্বেলে সিঁড়ির উপরের ল্যান্ডিং আর দরজাটা আলোচিত করার ব্যবস্থা হলো। টৌকো আকৃতির প্লাস্টার যে টুকু কাটা হবে তা চিহ্নিত করে নিয়েছে নিকোলাস, তা আগে টাইটার সতর্কবাণীর অনুবাদ শুনিয়ে দিয়েছে ড্যানিয়েল, মেক আর টিসেকে। কেউই ওরা ব্যাপারটাকে হালকা ভাবে নেয় নি।
দরজার গা থেকে দুটো সালই অক্ষত অবস্থায় তুলে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রথমে প্রোব হিসেবে বড় সূচ ব্যবহার করা হলো। প্লাস্টারের নিচে কী আছে সেটা জানাই উদ্দেশ্য। একটু পরই জানা গেল প্লাসাটারের নিচে রয়েছে নল খাগড়ার ছিলকা দিয়ে নিখুঁতভাবে বোনা কয়েকটা স্তর। রোয়েন বলল, ওই বুননই প্লাস্টারকে খসে পড়তে দেয় নি। লম্বা সূচটা গায়ের জোরে আরো ভেতরে ঢোকালো নিকোলাস, এক পর্যায়ে ওটা আর ঠেকল না কোথাও, অপর দিকে বেরিয়ে গেছে ডগা। দরজার কবাট ছয় ইঞ্চি চওড়া, জানালো নিকোলাস। চার কোণে চারটে খুদে ফুটো তৈরি করা হলো। সরে এসে হানশিতকে জায়গা ছেড়ে দিল ও, তুরপুন দিয়ে ফুটোগুলোকে বড় করার কাজে হাত দিল সে।
গর্তগুলো বড় হওয়ার পর হানশিতকে সরিয়ে দিয়ে ভেতরে তাকালো নিকোলাস। অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখার নেই। তবে প্রাচীন বদ্ধ বাতাস লাগলো মুখে। গন্ধটা শুকনো, উগ্র। আলোটা দাও! ড্যানিয়েলকে বলল ও। ড্যানি স্যাপার ওর হাতে ল্যাম্পটা ধরিয়ে দিল।
কী দেখছেন? রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। বলুন আমাকে! রঙ! ফিসফিস করলো নিকোলাস। চোখ ধাঁধানো বিচিত্র সব রঙের বাহার! সরে এসে কোমর ধরে রোয়েনকে উঁচু করলো ও। ফাঁকাটায় চোখ রাখলো রোয়েন।
কী সুন্দর! চেঁচিয়ে উঠলো সে। কী সুন্দর!
*
হেভী-ডিউটি ইলেকট্রিক ব্লোয়ার ফ্যান চালু করলো ড্যানি স্যাপার, শ্যাফটের বাতাস চারদিকে ছড়িয়ে দেবে। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার সময় রোয়েন ছাড়া আর কাউকে থাকতে দেবে না নিকোলাস, সবাইকে পাঠিয়ে দিল ভাসমান সেতুর কাছে। ওর হাতে একটা চেইন-স রয়েছে দু জনেই মাস্ক আর গগলস পরে নিল।
তুরপুন দিয়ে বড় করা ফুটো থেকে হেন-শ কাজ শুরু করলো, প্লাস্টার ও নিচের ছিলকার বুনন নরম কেকের মতো কেটে ফেলছে। চৌকো ফাঁকটা তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগলো না। জোড়া সীলসহ প্লাস্টারের চারকোনা টুকরোটা সাবধানে কবাট থেকে আলাদা করে নিল ওরা। এবার ফাঁকের ভেতর ফ্লাডলাইটের আলো ফেললো নিকোলাস। ভেতরে এখন ধুলোর মেঘ তৈরি হয়েছে, কিছুই দেখা গেল না। হ্যাঁচ গলে ভেতরে ঢুকলো নিকোলাস, তারপর রোয়েনকে ঢুকতে সাহায্য করলো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো দু জন, ব্লোয়ার ফ্যান ধুরোর মেঘ সরিয়ে দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে গেল ধুলো, তারপর প্রথমেই ওদের চোখ পড়লো পায়ের নিচে মেছের উপর। মেঝে এখানে পাথরের ফলক দিয়ে তৈরি নয়, হলুদ আকিক পাথরের টানলো দিয়ে মোড়া, পালিশ করা চকচকে, আর এমন কৌশলে জোড়া লাগানো যে জয়েন্টগুলো দেখা যায় না। স্বচ্ছ ও অবিচ্ছিন্ন কাঁচের একটা চাদর বলে মনে হয়, স্লান দেখাচ্ছে শুধু যেখানে মিহি ধুলো জমেছে। ওদের পা লেগে ধুলো খোনে সরে গেছে, ফ্লাডলাইটের আলো পড়ায় ঝলমল করছে আকীক। ওদেরকে ঘিরে থাকা ধুলো আরো পাতলা হয়ে এলো, সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে ফুটছে বিচিত্র বর্ণ আর আকৃতি। মাস্ক খুলে আকিক মেঝেতে ফেলে দিল রোয়েন। নিকোলাসও তাই করলো। প্রাচীন, অস্বাস্থ্যকর বাতাসে নিশ্বাস নিল ওরা। বাতাস এখানে কয়েক হাজার বছর আটকে আছে। ছাতা ধরা গন্ধ, লিনের ব্যান্ডেজ আর সুবাসিত লাশের ঘ্রাণ পেল ওরা।
ধুলো পুরোপুরি সরে যেতে লম্বা ও সোজা একটা প্যাসেজওয়ে দেখতে পেল ওরা, শেষ প্রান্তটা ছায়া আর অন্ধকারে লুকিয়ে আছে। হ্যাঁচ দিয়ে গলিয়ে স্ট্যাডসহ ফ্লাডলাইটটা ভেতরে নিয়ে এলো নিকোলাস। প্যাসেজটার পুরো দৈর্ঘ্য এবার আলোচিত হয়ে উলঠ।
পাশাপাশি এগুচ্ছে ওরা, প্রাচীন দেবতাদের ছায়া ও মূর্তি চারদিকে থেকে ঝুঁকে রয়েছে ওদের উপর। দেয়াল থেকে চোখ রাঙাচ্ছেন তারা, বিশাল চোখে আক্রোশ ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন সিলিং থেকে। রোয়েনকে নিয়ে ধীরে পায়ে এগুচ্ছে নিকোলাস। আকিক টাইলের উপর ধুলো জমে থাকায় পা ফেলায় কোনো শব্দ হচ্ছে না। বাতাসে ভেসে থাকা ধুলো আলোকিত জালের মতো লাগছে, পরিবেশে এনে দিয়েছে অলৌকিক স্বপ্নরাজ্যের ভাব। প্রতি ইঞ্চি দেয়ালে আর ছাদে লিপি বা নকশা দেখা যাচ্ছে সবই দীর্ঘ উদ্ধৃতি, বুক অব ব্রিদিংস, বুক অব দা পাইলনস ও বুক অব উইজডম থেকে নেয়া। অন্যান্য হায়ারোগ্লিফিক্স ফুটিয়ে তুলেছে মর্ত্যলোকে ফারাও মামোসের অস্তিত্বের ইতিহাস, সদগুণের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা, যে কারণে দেবতাদের ভালোবাসা পেয়েছিলেন তিনি।
আরো খানিক সামনে লম্বা ফিউনারাল গ্যালারি দেখতে পেল ওরা, আটটা শ্রাইন-এর পথমটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। শ্রাইন হলো লাশের দেহাবশেষ বা জীবিতকালে তার ব্যবহার করা জিনিসপত্র স্মৃতি হিসেবে রাখার বাক্স। প্রথমটা ওসিরিস-এর শ্রাইন। বৃত্তকার একটা চেম্বার, দেয়ালে ঈশ্বরের প্রশংসা লিপিবদ্ধ করা, কুলুঙ্গিতে ওসিরিস-এর খুদে মূর্তি, চোখগুলো আকীক মনি আর স্ফটিক পাথর দিয়ে তৈরি, এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন যে চোখাচোখি হতেই শিউরে উঠলো রোয়েন। হাত বাড়িয়ে দেবতার গোড়ালি ছুঁলো নিকোলাস, একটা মাত্র শব্দ উচ্চারণ করলো, সোনা।
