টাইটা প্রথমে টানেলটাকে নিচে নামিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছিল, পরে আবার ওপরে তুলেছে, মন্তব্য করলো রোয়েন, হাসছে। নিকোলাসের পাশে রয়েছে ও, দু জনেই শ্যাফট ধরে সাবধানে এগুচ্ছে। প্রতিটি পদক্ষেপ গুনছে নিকোলাস।
একশো দশ কদম হাঁটার পর দাঁড়িয়ে পড়লো ওরা। সামনের টানেল ভিজে নয়, মেঝে ও পাঁচিল শুকনো খটখটে। আরো পঞ্চাশ পা এগুলো ওরা, পাঁচিলের দাগ দেখে বোঝা গেল বন্যায় সময়ও এ লেভেলে পানি উঠত না। এদিকের মেঝে ও পাঁচিল চার হাজার বছর আগে মিশরীয় ক্রীতদাসরা যেভাবে তৈরি করে রেখে গেছে এখনো ঠিক তেমনি আছে। ব্রোঞ্জের তৈরি বাটালির দাগগুলো এতো তাজা, মনে হচ্ছে মাত্র কয় দিন আগে কাজ শেষ করে ফিরে গেছে তারা। আরো দশ গজ এগুবার পর একটা পাথুরে ল্যান্ডিঙে পৌঁছল ওরা। মেঝে এখানে সমতল। টানেল এখানে তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়েছে, একশো আশি ডিগ্রী কোণ ঘুরে।
পানির লেভেল এখান পর্যন্ত কোনদিনই উঠবে না, এ কথা টাইটা জানলে কীভাবে? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। তখনকার দিনে নিখুঁত মাপজোকের জন্যে কোনো যন্ত্রপাতি ছিল না, অথচ হিসেবে তার এতোটুকু ভুল হয় নি।
কেন স্ক্রোলে তো সে বারবার বলেছে, আমি একটা জিনিয়াস। তার দাবি স্বীকার করে নিতে হয়, বলল রোয়েন।
পাশাপাশি একশো আশি ডিগ্রী বাকটা ঘুরলো ওরা। হাতের ইলেকট্রিক ল্যাম্পটা উঁচু করে ধরে আছে নিকোলাস, পেছনে কেবল ঝুলছে। সামনের দিকটা আলোকিত হয়ে উঠতে বিস্ময়সূচক একটা আওয়াজ করলো রোয়েন, নিকোলাসের খালি হাতটা খামচে ধরল। দাঁড়িয়ে পড়লো দু জনেই, অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
টানেলের নিচের যে অংশটা ওরা পেরিয়ে এসেছে সেটা তৈরি করার সময় তেমন একটা যত্ন নেওয়া হয় নি, দেয়াল আর মেঝে এবড়োখেবড়ো ছিল, ছাদে ছিল ফাটল। তার মানে টাইটা জানত নিচের লেভেলটা পানিতে ডুবে থাকবে, তাই সৌন্দর্য বাড়ানোর কোনো চেষ্টা করে নি।
এখন ওদের সামনে থেকে ওপরে উঠে গেছে একটা চওড়া সিঁড়ি। একটু তির্যক ভঙ্গিতে উঠেছে, ফলে সিঁড়ির মাথাটা দেখা যাচ্ছে না। প্রতিটি ধাপ টানেলের পুরো প্রস্থের সমান লম্বা, পুরো এক হাত চওড়া। চকচকে, মসৃণ পাথরের টুকরো দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ধাপগুলো, এতো নিখুঁত কাজ যে জয়েন্টগুলো চোখে পড়ে না। নিচের অংশের টানেলের চেয়ে এ দিকের টানেলের ছাদ তিনগুণ বেশি উঁচু, সারি সারি গম্বুজের মতো দেখতে, প্রতিটি গম্বুজের মাপ সমান। দেয়াল আর ছাদের গম্বুজে আবরণ হিসেবে বসানো হয়েছে নীল এ্যানিট ব্লক। তবে কোথাও কোনো অলঙ্করণ চোখে পড়লো না।
নিকোলাসের হাতে মৃদু চাপ দিল রোয়েন। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলো ওরা। ধামগুলো মিহি ধুলোয় ঢাকা, নরম আর ট্যালকম পাউডারের মতো সাদা। কিছু দূর ওঠার পর সিঁড়ির মাথাটা দৃষ্টিপথে চলে এলো। নিকোলাসের হাতের তালুতে নখ ঢুকিয়ে দিল রোয়েন। সিঁড়িটা শেষ হয়েছে আরেকটা ল্যান্ডিঙে, ল্যান্ডিঙের ওপারে চারকোনা একট দরজা দেখা যাচ্ছে। ল্যান্ডিং পেরিয়ে দরজাটার সামনে দাঁড়ালো ওরা। বিরল এক শুভ মুহূর্ত উপস্থিত ওরা যেনো নিঃশব্দে অনন্ত কাল ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলো, পরস্পরের হাত শক্ত করে ধরে আছে। পৃথিবীর আর কোনো মানুষের সাথে এ মুহূর্ত ভাগাভাগি করতে কোনোদিনও চাইতো না নিকোলাস, চোখ তুলে রোয়েনের মুখে তাকিয়ে দেখলো একই অনুভূতি।
নদীর সাদা মাটি দিয়ে প্লাস্টার করা দরজা, দেখে মনে হলো আইভরি দিয়ে মোড়া। কোথাও কোনো দাগ নেই, যেনো ত্রুটি হীন কোনো কুমারীর ত্বক। সাদা প্লাস্টারের মাঝখানে এমবস করা একজোড়া সীল রয়েছে। ওপরের সীলটার আকৃতি চৌকো একটা গিট, মুড়ে রেখেছে শিং-ওয়ালা গুবরে পোকা। বৃত্তাকার শিং অনন্ত কাল বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। এটা রাজকীয় একটা প্রতীক চিহ্ন। লেখাগুলো, হায়ারোগ্লিফিকস, পড়লো রোয়েন, তবে নিঃশব্দে।
সর্বশক্তিমান। ঐশ্বরিক ও স্বর্গীয়। মিশরীয় নিম্ন ও উচ্চ রাজ্যের শাসনকর্ম। দেবতা হোরাস-এর ঘনিষ্ঠ। ওসিরিস আর আইসিসি-এর প্রিয়পাত্র। মামোস, তিনি যেনো চিরজীবী হন!
রাজকীয় বর্ণমালার নিচে ছোট আরেকটা ডিজাইন রয়েছে, বাজপাখির আকৃতি, ভাঙা ডানা সেঁটে আছে বুকে, আর লেখাগুলো-আমি, ক্রীতদাস টাইটা, আপনার নির্দেশ পালন করেছি, স্বর্গীয় ফারাও। পঙ্গু বাজপাখির নিচে আর মাত্র একটা লাইন দেখা গেল, তার অর্থ করলে দাঁড়ায়-আগন্তুক! দেবতারা দেখছেন! রাজার চিরকালীন বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটালে চড়া মাশুল দিতে হবে।
*
দরজার সীল ভাঙা বিশাল একটা কাজ এবং সময় সাপেক্ষ, অথচ বর্ষা শুরু হওয়ার আগে হাতে অল্প যে সময় আছে তা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। দরজা ভেঙে সমাধির ভেতর ঢোকার প্রস্তুতি নিতে মূল্যবান একটা দিন বেরিয়ে গেল। স্বভাবতই সমাধি এলাকার নিরাপত্তা বিধান নিকোলাসের প্রথম উদ্বেগ। সিঙ্ক-হোলের উপর ভাসমান সেতুর মুখে মেককে সশস্ত্র প্রহরার ব্যবস্থা করতে বলল ও, এ সীমা রেখার সামনে বাড়া নিষিদ্ধ করা হলো। সেতু পেরুতে পারবে সব মিলিয়ে মাত্র নয়জন-নিকোলাস, রোয়েন, ড্যানিয়েল, মেক, টিসে আর চারজন সন্ন্যাসী।
লোহার টানেল পরিষ্কার করার কাজে হানশিত শেরিফ বারবার নিজের বুদ্ধিমত্তা ও শারীরিক সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে, ফলে আগেই তাকে প্রধান সহকারি হিসেবে বেছে নিয়েছে নিকোলাস। সিদ্ধান্ত হলো, এখন থেকে যা কিছু আবিষ্কার করা হবে প্রতিটির রেকর্ড রাখা চাই। তেপায়া ও স্পেয়ার ক্যামেরা ইকুইপমেন্ট নিয়ে হাজির হলো হানশিত, অ্যাপ্রোচ টানেল আর সীল করা দরজার ফটো তুললাম নিকোলাস। ফটো তোলার কাজ শেষ হতে দরজা ভাঙার টুলস নিয়ে আসার জন্য হানশিতকে অনুমতি দিল ও।
