একটু পরই বোঝা গেল ফাটলটা প্রায় চৌকোই, তিন মিটারের মতো চওড়া, দুমিটারের মতো উঁচু। পাশ আর ছাদ পানির তোড়ে ক্ষয়ে গেছে, তবে পানির লেভেল আরো নিচে নামতে সুগঠিত পাথুরে ব্লক-এর অবশিষ্ট দেখতে পেল ওরা, ওগুলো সম্ভবত ফাটলটা বন্ধ করে রেখেছিল। চার প্রস্থ ব্লক এখনো অক্ষত রয়েছে, প্রাচীন রাজমিস্ত্রী ফাটলটার গোড়ায় যেখানে বসিয়েছিল, বাকিগুলো কয়েক হাজার বছরের বন্যায় ভেঙে গেছে, ঢুকে পড়েছে পেছনের টানেলে। ফলে আংশিক বন্ধ হয়ে আছে টানেলটা।
পুলে নামলো নিকোলাস। পানি এখনো হাঁটু সমান। ফাটলটার সামনে হেঁটে এসে খালি হাতে পাথুরে আবর্জনা সরাচ্ছে। রোয়েনও ধৈর্য ধরতে পারলো না, পুলে নেমে নিকোলাসের পাশে চলে এলো। টানেল বলেই তো মনে হচ্ছে! উত্তেজনায় ফিসফিস করলো ও। নাকি শ্যাফট? কিন্তু বাধাটা কেন? টাইটার ইচ্ছাকৃত নয় তো?
বলা কঠিন। নদীর মূল স্রোত থেকে প্রচুর আবর্জনা ঢুকেছে ভেতর। খানিকটা হতাশ দেখার নিকোলাসকে। আর্কিওলজির নিয়ম ধরে পথটা পরিষ্কার করতে হলে কয়েক সপ্তা লেগে যাবে। ও সব এখানে আমাদের পোষাবে না। আলো আর লোকবল যখন আছে রাতদিন হাত লাগিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করতে হবে কাজটা।
*
ওরা ডানডেরা নদীতে বাঁধ দিয়েছেন, হের ফন শিলারকে বললেন নাহুত গাদ্দাবি। হারপার নিকোলাসের ক্যাম্পে আমাদের স্পাই আছে, সেই রিপোর্ট পাঠিয়েছে। খাদের ভেতর তিনশো লোককে কাজে লাগিয়েছেন তিনি, ইকুইপমেন্ট আর সাপ্লাইয়ের পরিমাণও বিপুল। এমন কী একটা ট্র্যাক্টরও নিয়ে গেছেন।
ভুরু কুঁচকে জ্যাক হেলমের দিকে তাকালেন হের ফন শিলার, হেলম্ মাথা আঁকালো। গম্ভীর দেখালো জার্মান বিলিওনিয়ারকে। জরুরি স্যাটেলাইট মেসেজ পেয়ে আদ্দিস আবাবার চলে আসেন তিনি, ওখান থেকে জেট রেঞ্জার হেলিকপ্টারে চড়ে পৌঁছেছেন অ্যাবে গিরিখাদের উপর পেগাসাস বেস ক্যাম্পে, ঢালের চূড়ায়।
ডানডেরা নদীকে বাঁধ দিয়ে বাঁধা চাট্টিখানি কথা নয়, জানেন তিনি। অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা আবিষ্কার না করলে এতো বড় একা কাজে হাত দেবে না তার প্রতিপক্ষ হারপার নিকোলাস, এ ও তাঁর কাছে পরিষ্কার। ঠিক কোথায় বাঁধটা দেওয়া হয়েছে দেখতে চাইলেন তিনি। স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফের উপর একটা ক্রশ চিহ্ন আঁকলো হেলম। তাকে তিনি প্রশ্ন করলেন, কেন বাধ দিল ওরা? কারণটা ব্যাখ্যা করো, হেলম্।
প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে অনুমান পাল্টা অনুমান করার পর সবাই একমত হলো, পানির নিচে কিছু একটার নাগাল পেতে চেয়েছে নিকোলাস। তারপর প্রশ্ন উঠলো, বাঁধ এলাকার নিচে কী আছে? হেলম্ জানালো, বাঁধটার ঠিক নিচে নদী ঢুকে পড়েছে। সরু ও গভীর একটা নালার ভেতর। নালাটা আট মাইল লম্বা, শেষ মাথার ওপরে রয়েছে মঠটা। ওই নালার উপর দিয়ে হেলিকপ্টার নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব, তবু কয়েকবার গেছে হেলম। একবার তারা নিকোলাস আর ওঁর বান্ধবীকে নালার উপর উঁচু জমিনে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখেছে। কি করছিল ওরা? না, কিছু করছিল না, নালার উপর পাহাড়-প্রাচীরের মাথায় বসে ছিল শুধু। হেলিকপ্টারটা ওরা দেখতে পায়? হ্যাঁ, অবশ্যই, দেখতে পেয়ে নিকোলাস হাতও নাড়ে। হের ফন শিলার বললেন, তোমাদের আওয়াজ পেয়ে বসে পড়েছিল ওরা, তার আগে নিশ্চয়ই। ওখানে কিছু করছিল। তারপর সিদ্ধান্তে আসলেন, নিকোলাস বিশ্বাস করে ড্যামের নিচে খাদের ভেতর সমাধিটা আছে। হেলমকে জিজ্ঞেস করলেন, স্পাই লোকটা কখন আর কীভাবে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে?
হেলম্ ব্যাখ্যা করলো। ঢালের কয়েকটা গ্রাম থেকে কিছু কিছু সাপ্লাই গ্রহণ করছে নিকোলাস, খচ্চরের পিঠে মালপত্র চাপিয়ে ওদের ক্যাম্পে আসা-যাওয়া করছে কয়েকজন মহিলা। স্পাই লোকটা ওই মহিলাদের হাতে রিপোর্ট পাঠায়।
পরশুর মধ্যে রিপোর্ট করো আমাকে, বাঁধের নিচে কী করছে নিকোলাস, নির্দেশ দিলেন হের ফন শিলার। কনফারেন্স টেবিলের উল্টোদিকে বসা কর্নেল টুমা নগুর দিকে তাকালেন। এলাকায় কতজন লোককে আপনি ডিউটিতে রাখছেন?
তিনটে পুরো কোম্পানি, সব মিলিয়ে তিনশোর বেশি লোক, জবাব দিলেন কর্নেল নগু। সবাই অভিজ্ঞ যোদ্ধা।
কোথায় তারা? ম্যাপে আমাকে দেখান।
তাঁর পাশে চলে এলেন কর্নেল। একটা কোম্পানি এখানে। দ্বিতীয়টা ডেবরা মারিয়াম গ্রামে। তৃতীয়টা ঢালের নিচে, নিকোলাসের ক্যাম্পে হামলা চালাবার জন্য তৈরি হয়ে আছে।
আমার ধারণা হামলাটা এখুনি চালানো দরকার, নাহুত গাদ্দাবি বললেন।
শত্রুকে সময় দিতে নেই।
চুপ করুন! ধমক দিলেন হের ফন শিলার। আমি আপনার মতামত চেয়েছি? ম্যাপটা কিছুক্ষণ দেখার পর কর্নেলকে তিনি প্রশ্ন করলেন, গেরিলা কমান্ডারের সঙ্গে কতজন রয়েছে, জানেন? কী যেনো নাম তার, নিকোলাসকে সাহায্য করছে?
মেক নিমুর। এককোরো কম, সম্ভবত পঞ্চাশজন, বাধ আর ক্যাম্প পাহারা দিচ্ছে।
দু আঙুলের মাঝখানে ধরে কানের লতি মোচড়াচ্ছেন হের ফন শিলার। গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ পর তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটলো।
দ্বিতীয়বার যে পথে ইথিওপিয়ায় ঢুকেছে নিকোলাস, বেরিয়েও যাবে সেইপথে, গেরিলা কমান্ডারের সাহায্য নিয়ে, বললেন তিনি। ঢোকার সময় বৈধ পথ ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না, বেরিয়ে যাবার সময় আরো সম্ভব হবে না। কাজেই আমি চাই ওই পথে ডেবরা মারিয়াম কোম্পানিটাকে মোতায়েন করুন আপনি, কর্নেল নগু। নদীটার দুই দিকেই পাহারায় থাকুক তারা, মঠের নিচে। নিকোলাস যেনো উদ্ধার করা ট্রেজার নিয়ে সুদান সীমান্তে পৌঁছতে না পারে।
